প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬
মেঘডাকা বিকেলের প্রেম
নাহিদ হোসেন ||
রাতটা আরিয়ানের কাছে যেন শেষই হচ্ছিল না।বারবার সে ভেজা খামটা খুলে পড়ছিল।যদি আমাকে সত্যিই খুঁজে পেতে চাও... তাহলে কাল সূর্য ওঠার আগেই পুরোনো রেলস্টেশনে এসো। একা এসো। কাউকে কিছু বলো না...চিঠির নিচে কোনো নাম ছিল না।তবুও সে জানত, এটা মেহরিনই লিখেছে।কারণ চিঠির ভাঁজে আটকে ছিল একটা শুকনো কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি—যেটা সে প্রথম দেখা হওয়ার দিন বইয়ের ভেতর থেকে তুলে দিয়েছিল।সেই পাপড়িটা এতদিন ধরে মেহরিন আগলে রেখেছিল!আরিয়ানের বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।ভোর পাঁচটা।চন্দ্রপুরের পুরোনো রেলস্টেশন।আজ আর সেখানে ট্রেন থামে না।প্ল্যাটফর্মের ইটগুলো ভেঙে গেছে, লোহার বেঞ্চে মরিচা পড়েছে।শুধু একটা পুরোনো ঘড়ি—যেটা বহু বছর আগে থেমে গেছে ৫টা ১৭ মিনিটে।কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল আরিয়ান।চারদিকে নীরবতা।হঠাৎ...দূরে একটা নীল ওড়না বাতাসে উড়ে উঠল।মেহরিন।চোখ দুটো লাল।মনে হচ্ছে, সারারাত কেঁদেছে।আরিয়ান দৌড়ে গেল।— কী হয়েছে? কোথায় ছিলে তুমি?মেহরিন উত্তর দিল না।শুধু হাতটা শক্ত করে ধরে বলল—— চলো... এখানে দাঁড়ানো যাবে না।দু'জনে স্টেশনের পেছনের পুরোনো গুদামঘরের দিকে হাঁটতে লাগল।হাঁটতে হাঁটতে মেহরিন বলল,— তুমি কি জানো, আমি এই গ্রামে কেন এসেছি?আরিয়ান মাথা নাড়ল।— আমি ভাবতাম, তুমি গ্রামের শান্তি ভালোবেসে এসেছ।মেহরিন তিক্ত হেসে বলল,— না... আমি কাউকে খুঁজতে এসেছিলাম।— কাকে?— আমার বাবাকে।আরিয়ান থেমে গেল।মেহরিন নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,— আমার বাবা পঁচিশ বছর আগে এই গ্রাম থেকেই হারিয়ে গিয়েছিলেন। সবাই বলেছিল তিনি পালিয়ে গেছেন। কিন্তু মা কখনো বিশ্বাস করেননি।কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা কেঁপে উঠছিল।— মা মারা যাওয়ার আগে শুধু একটা কথাই বলেছিলেন...— চন্দ্রপুরে একদিন যেও। সেখানে তোমার বাবার উত্তর লুকিয়ে আছে।আরিয়ান স্তব্ধ হয়ে শুনছিল।ঠিক তখনই...গুদামঘরের ভেতর থেকে একটা কাশির শব্দ ভেসে এল।দু'জনে চমকে উঠল।ভেতরে ঢুকতেই দেখল—একজন বৃদ্ধ মাটিতে বসে আছেন।লম্বা সাদা দাড়ি।ছেঁড়া পাঞ্জাবি।চোখে অদ্ভুত এক গভীরতা।মেহরিন কাঁপা গলায় বলল—— আপনি...?বৃদ্ধ শুধু বললেন,— অনেক দেরি করে ফেলেছ মা।বৃদ্ধের নাম ছিল আব্দুল কাদের।গ্রামের মানুষ তাকে পাগল বলে এড়িয়ে চলত।কিন্তু আজ তার চোখে কোনো পাগলামি নেই।তিনি ধীরে ধীরে বললেন,— তোমার বাবা পালায়নি।মেহরিন কেঁপে উঠল।— তাহলে?বৃদ্ধ চারদিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললেন,— কেউ তাকে পালাতে বাধ্য করেছিল।ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে মোটরসাইকেলের শব্দ।একটা নয়।দুইটা নয়।চারটা।বৃদ্ধ ভয় পেয়ে গেলেন।— তোমরা যাও। এখনই যাও।— কেন?— কারণ তারা জানে, তোমরা আমার কাছে এসেছ।আরিয়ান দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখল—চারজন লোক।তাদের একজনকে সে চিনতে পারল।রফিক মেম্বার।চন্দ্রপুর ইউনিয়নের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ।যাকে সবাই সম্মান করে।কিন্তু আজ তার চোখে অন্যরকম রাগ।আরিয়ান মেহরিনের হাত ধরে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।দু'জনে দৌড়াতে লাগল।কুয়াশার ভেতর।ধানক্ষেতের আল ধরে।পেছন থেকে শুধু একটা চিৎকার ভেসে আসছিল—— ধর! ওদের পালাতে দিস না!প্রায় আধঘণ্টা দৌড়ানোর পর তারা নদীর ধারে এসে থামল।দু'জনেরই নিঃশ্বাস দ্রুত চলছে।মেহরিন হঠাৎ বসে পড়ল।চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।আরিয়ান প্রথমবার তার কাঁধে হাত রাখল।বলল,— আমি আছি।মেহরিন অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,— জানো... এই কথাটা আমি ছোটবেলা থেকে শুনতে চেয়েছিলাম।সেই দিনই প্রথমবার তারা নিজেদের গল্প বলল।আরিয়ান জানাল—সে ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছে।নিজের বলতে তেমন কেউ নেই।গ্রামটাই তার পরিবার।মেহরিন জানাল—সে কখনো বাবাকে দেখেনি।শুধু একটা সাদা-কালো ছবি।আর অনেকগুলো প্রশ্ন।বিকেলের দিকে তারা নদীর পাড়ে বসে ছিল।হঠাৎ রহিম চাচা এসে হাজির।হাতে দুটো কাঁচা ডাব।হেসে বললেন—— তোমাদের সারাদিন খুঁজছি।দু'জন চমকে গেল।রহিম চাচা খুব আস্তে বললেন,— ভয় পেও না। সব মানুষ খারাপ না।তারপর পকেট থেকে একটা পুরোনো চাবি বের করলেন।— এই চাবিটা তোমার বাবা আমার কাছে রেখে গিয়েছিলেন।মেহরিনের হাত কাঁপছিল।— কিসের চাবি?রহিম চাচা আঙুল তুলে দেখালেন—নদীর ওপারে একটা ভাঙা বাড়ি।গ্রামের সবাই যেটাকে নীলকুঠি বলে।তিনি শুধু একটা কথাই বললেন—— ওই বাড়ির একটা ঘর পঁচিশ বছর ধরে কেউ খুলতে পারেনি।সন্ধ্যা নেমে এসেছে।আকাশে এক টুকরো চাঁদ।নদীর জলে তার আলো কাঁপছে।মেহরিন হঠাৎ বলল—— যদি কিছু হয়ে যায়?আরিয়ান হাসল।— তাহলে একসাথে হবে।মেহরিন প্রথমবার তার হাতটা শক্ত করে ধরল।কোনো প্রেমের স্বীকারোক্তি ছিল না।কোনো বড় বড় কথা ছিল না।শুধু...দুটি মানুষের নীরব বিশ্বাস।ঠিক তখনই...দূরে নীলকুঠির দিক থেকে একটা আলো জ্বলে উঠল।যে বাড়িতে গত বিশ বছর ধরে কেউ থাকে না...সেই বাড়ির দ্বিতীয় তলার জানালায় স্পষ্ট দেখা গেল—একজন মানুষের ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।আর তার হাতে...একটি পুরোনো লণ্ঠন।মেহরিন ফিসফিস করে বলল,— ওই বাড়িতে তো কেউ থাকে না...রহিম চাচার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।তিনি কাঁপা গলায় বললেন—— অসম্ভব... ওই জানালায় আলো জ্বলার কথা নয়। কারণ সেই ঘরটা আমি নিজেই পঁচিশ বছর আগে তালাবদ্ধ করেছিলাম...তিনজন একসঙ্গে তাকিয়ে রইল।হঠাৎ...জানালার ছায়াটা ধীরে ধীরে হাত তুলল।যেন...তাদেরই ডাকছে।
(চলবে...)
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো