প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুলাই ২০২৬
মেঘডাকা বিকেলের প্রেম
নাহিদ হোসেন ||
নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা নীলকুঠিটাকে দূর থেকে দেখলে মনে হতো, যেন সময়ের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্লান্ত স্মৃতি।ভাঙা বারান্দা, শেওলা ধরা দেয়াল, জানালার কাঁচগুলো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। অথচ আজ সেই বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি জানালায় আলো জ্বলছে।আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তিটা যেন তাদেরই অপেক্ষা করছে।মেহরিনের আঙুলগুলো অজান্তেই আরিয়ানের হাত শক্ত করে চেপে ধরল।— আমরা... যাব?আরিয়ান তার দিকে তাকাল। চোখে ভয় আছে, কিন্তু তার থেকেও বেশি আছে বিশ্বাস।— যদি তুমি যাও, আমি যাব।এই প্রথম মেহরিন অনুভব করল—পৃথিবীতে এমন একজন মানুষ এসেছে, যার পাশে দাঁড়ালে ভয়ও ছোট হয়ে যায়।সেই রাতেই তারা নীলকুঠিতে গেল না।রহিম চাচা বাধা দিলেন।— কিছু দরজা দিনের আলোয় খোলা ভালো। রাতের অন্ধকারে সত্যও ভয়ংকর লাগে।আরিয়ান মাথা নাড়ল।সেদিন রাতে তারা নদীর ধারে অনেকক্ষণ বসে রইল।কথা খুব বেশি হয়নি।মাঝে মাঝে নীরবতাও মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে।মেহরিন হঠাৎ বলল,— জানো, ছোটবেলায় ভাবতাম, বাবা যদি কখনো ফিরে আসে, তাহলে প্রথমে তাকে জড়িয়ে ধরব। তারপর অনেক অভিমান করব।একটু থেমে আবার বলল,— আজ মনে হচ্ছে, মানুষকে হারানোর ভয়টা অভিমানের থেকেও বড়।আরিয়ান ধীরে বলল,— যাদের হারানোর ভয় থাকে, তারাই আসলে সবচেয়ে আপন।দুজনেই চুপ করে গেল।নদীর ওপরে চাঁদের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছিল।পরদিন সকাল।চন্দ্রপুর বাজার।আজ যেন পুরো গ্রামের আলোচনার বিষয় একটাই—আরিয়ান আর শহরের মেয়েটা।চায়ের দোকানে করিম গরম চা ঢালতে ঢালতে বলল,— প্রেমটা মনে হয় সত্যিই হয়ে গেছে।একজন হেসে বলল,— ওই ছেলেটা তো কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে তাকায়নি।আরেকজন উত্তর দিল,— কিছু মানুষ দেরিতে প্রেমে পড়ে, কিন্তু সত্যি করে পড়ে।রহিম চাচা পাশে বসে শুধু হাসছিলেন।সেদিন বিকেলে মেহরিন প্রথমবার আরিয়ানের বাড়িতে এল।ছোট্ট টিনের ঘর।সামনে শিউলি গাছ।বারান্দায় পুরোনো কাঠের দোলনা।ঘরের ভেতরে বইয়ের তাক।আর একটা গিটার।মেহরিন অবাক হয়ে বলল,— তুমি গানও গাও?আরিয়ান একটু লজ্জা পেয়ে বলল,— নিজের জন্য গাই।— আমাকে শোনাবে?আরিয়ান গিটারটা হাতে তুলে নিল।খুব আস্তে একটা সুর তুলল।কোনো বিখ্যাত গান নয়।নিজের বানানো সুর।মেহরিন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিল।তার মনে হচ্ছিল—এই মানুষটার ভেতরে কত কথা লুকিয়ে আছে, অথচ সে কাউকে বলে না।গান শেষ হলে অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না।মেহরিন শুধু বলল,— তোমার কণ্ঠে একটা অদ্ভুত শান্তি আছে।আরিয়ান হেসে উত্তর দিল,— হয়তো তুমি শুনছ বলে।মেহরিন চোখ নামিয়ে ফেলল।তার গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে।এরপর দিনগুলো বদলে যেতে লাগল।বিকেলে নদীর পাড়।সকালে বাজার।কখনো কাশবনের পথ।কখনো বৃষ্টিভেজা মাটির রাস্তা।গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চারাও এখন মেহরিনকে আপা বলে ডাকতে শুরু করেছে।মেহরিনও যেন ধীরে ধীরে শহরকে ভুলে যাচ্ছিল।একদিন সন্ধ্যায়...আকাশজুড়ে কালো মেঘ।হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি।দুজনেই আটকে পড়ল একটা পুরোনো বটগাছের নিচে।মেহরিন হাসতে হাসতে বলল,— দেখো, পুরো ভিজে গেছি।আরিয়ান নিজের গামছাটা এগিয়ে দিল।— এই নাও।মেহরিন গামছাটা নিল না।বরং বলল,— তুমি ভিজছ।তারপর...অজান্তেই নিজের ওড়নার এক কোণা দিয়ে আরিয়ানের কপালের পানি মুছে দিল।দুজনেই হঠাৎ থেমে গেল।সময় যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়িয়ে রইল।বৃষ্টির শব্দ ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছু নেই।আরিয়ান খুব আস্তে বলল,— মেহরিন...— হুম?— যদি কোনোদিন তুমি চলে যাও...মেহরিন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,— তাহলে?— এই গ্রামটা আর আগের মতো থাকবে না।মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।সে প্রথমবার বলল,— শুধু গ্রাম কেন?— আমিও থাকব না আগের মতো।সেদিন রাতে মেহরিন ঘুমাতে পারল না।জানালার পাশে বসে ডায়েরি লিখছিল।আমি জানি না এটা ভালোবাসা কি না। তবে এটুকু জানি, এই মানুষটার সঙ্গে কথা না বললে দিন অসম্পূর্ণ লাগে। ওর হাসি দেখলে আমার ভেতরের সব ভয় হারিয়ে যায়। হয়তো মানুষ এমনই কাউকে খুঁজে বেড়ায়—যার পাশে দাঁড়ালে নিজেকে বাড়ি ফিরে আসা মনে হয়।পরদিন...গ্রামের ডাকপিয়ন একটা খাম নিয়ে এল।মেহরিনের নামে।ঢাকা থেকে।খাম খুলতেই তার মুখের রং বদলে গেল।আরিয়ান দূর থেকে দেখছিল।সে কাছে এসে বলল,— কী হয়েছে?মেহরিন জোর করে হাসল।— কিছু না।কিন্তু সে মিথ্যা বলছিল।চিঠিটা সে ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে ফেলল।সেই সন্ধ্যায়...মেহরিন নদীর পাড়ে এল না।পরদিনও না।তৃতীয় দিনেও না।আরিয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্থিরতা জমতে লাগল।সে জমিদারবাড়িতে গেল।দরজায় তালা।বারান্দায় শুধু বাতাসে উড়ছে একটা সাদা ওড়না।ঠিক তখনই রহিম চাচা পিছন থেকে এসে খুব আস্তে বললেন,— বাবা... শহর থেকে কেউ এসেছিল।— কে?— একজন ভদ্রলোক।— কেন?রহিম চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।— শুনলাম... মেয়েটার বিয়ের কথা অনেক আগেই ঠিক করা ছিল।আরিয়ান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।— অসম্ভব...— আমি চাই খবরটা মিথ্যে হোক।সেদিন গভীর রাতে...আরিয়ানের দরজায় খুব আস্তে টোকা পড়ল।দরজা খুলতেই সে অবাক হয়ে গেল।দাঁড়িয়ে আছে...মেহরিন।চোখ ভেজা।হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ।সে কাঁপা গলায় বলল,— আমার কাছে খুব বেশি সময় নেই।আরিয়ান কিছু বলার আগেই...মেহরিন তার হাতে একটা ভাঁজ করা চিঠি ধরিয়ে দিল।— আমি যদি কাল সকালে আর এই গ্রামে না থাকি...তার গলা আটকে গেল।...তাহলে এই চিঠিটা পড়বে।আরিয়ান বলল,— তুমি কোথাও যাবে না।মেহরিন চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল।— সব ইচ্ছা মানুষের নিজের হাতে থাকে না, আরিয়ান।দূরে তখন একটা কালো গাড়ির হেডলাইট গ্রামের কাঁচা রাস্তা আলোকিত করে এগিয়ে আসছে।মেহরিন একবার শেষবারের মতো আরিয়ানের দিকে তাকাল।তার ঠোঁট কাঁপছিল।মনে হচ্ছিল, সে একটা কথা বলতে চায়...খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা...কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই গাড়িটা তাদের বাড়ির সামনে এসে থামল।আরিয়ানের হাতে তখনও সেই ভাঁজ করা চিঠি।চিঠির ওপর মাত্র চারটি শব্দ লেখা—যদি ভালোবাসো... অপেক্ষা করো।আর গাড়ির দরজা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল...
(চলবে...)
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো