প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
সৎ ভাই-বোন ও ভাতিজা কার অধিকার কতটুকু? ফারায়েজ শাস্ত্রের সূক্ষ্ম হিসাব ও বিভ্রান্তি
ইসলামিক ডেস্ক ||
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েজ শাস্ত্রে আত্মীয়দের অধিকার ও মর্যাদার সূক্ষ্ম পার্থক্য নির্ধারিত রয়েছে। তবে সামাজিক জীবনে এই কাঠামোর সঠিক ধারণা না থাকা কিংবা ভুল ব্যাখ্যার কারণে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধ ও দীর্ঘস্থায়ী আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়।ইসলামী স্কলারদের মতে, পবিত্র কোরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ফারায়েজ শাস্ত্রে যেকোনো মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের মূলত প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:
১. নির্দিষ্ট অংশীদার (জাবিল ফুরুজ): যাঁদের অংশ কোরআনে সরাসরি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। যেমন—স্বামী, স্ত্রী, পিতা, মাতা কিংবা কন্যা।২. অবশিষ্ট ভোগী (আসাবা): নির্দিষ্ট অংশদারদের মাঝে সম্পত্তি বণ্টনের পর অবশিষ্ট সম্পত্তি যাঁরা পান। মূলত পুরুষ রক্তীয় আত্মীয়রা এই শ্রেণিতে পড়েন। যেমন—পুত্র, সহোদর ভাই, বৈমাত্রেয় ভাই, ভাতিজা বা চাচা।৩. দূরবর্তী আত্মীয় (জাবিল আরহাম): যাঁরা কেবল ওপরের দুই শ্রেণির কেউ জীবিত না থাকলে তবেই সম্পত্তির ভাগ পান।ফারায়েজ শাস্ত্রে ‘ভাতিজা’ একজন স্বীকৃত ‘আসাবা’ বা অবশিষ্ট ভোগী হকদার। তবে তার সম্পত্তির অধিকার কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করে তার চেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কোনো আত্মীয় জীবিত আছেন কি না, তার ওপর।‘সৎ ভাই-বোন’ নিয়ে রক্তসম্পর্কের বিভ্রান্তি :উত্তরাধিকার প্রশ্নে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় ‘সৎ ভাই-বোন’ শব্দটির সঠিক ব্যাখ্যা না জানার কারণে। ফিকহবিদদের মতে, শব্দটি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়:বৈমাত্রেয় ভাই-বোন (একই বাবা, কিন্তু ভিন্ন মা): তাঁরা মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি রক্তের সম্পর্কে যুক্ত। চার মাযহাবের (হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি) ঐকমত্য অনুযায়ী, বৈমাত্রেয় ভাই ‘আসাবা’ শ্রেণিতে সহোদর বা আপন ভাইয়ের ঠিক পরেই স্থান পান। অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির কোনো আপন ভাই জীবিত না থাকলে অবশিষ্ট সম্পত্তির অধিকারে বৈমাত্রেয় ভাই প্রথম অগ্রাধিকার পাবেন।রক্তসম্পর্কহীন সৎ ভাই-বোন: বাবা বা মায়ের অন্য কোনো বিবাহের পূর্বের সন্তান, যাঁর সঙ্গে মৃত ব্যক্তির কোনো সরাসরি রক্তসম্পর্ক নেই। শরিয়তের দৃষ্টিতে তাঁরা কোনোভাবেই ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হবেন না। আলেমরা স্পষ্ট জানান, নিছক একই ছাদের নিচে বেড়ে ওঠা বা পারিবারিক সাহচর্যের কারণে কেউ শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়ারিশ হন না; ফারায়েজ কেবল রক্তসম্পর্ক ও বৈধ বৈবাহিক সূত্রের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।চার মাযহাব ও হানাফি ফিকহে ভাতিজার অবস্থান :বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হানাফি ফিকহের অনুসরণ বেশি হওয়ায় এখানে ‘আসাবা’ শ্রেণির অগ্রাধিকারের ধারাবাহিক ক্রম নির্ধারিত হয় এভাবে—প্রথমে পুত্র ও পৌত্রের মতো নিম্নগামী বংশধর; এরপর পিতা ও দাদার মতো ঊর্ধ্বগামী আত্মীয়; তারপর সহোদর (আপন) ভাই; তার পর বৈমাত্রেয় ভাই; এবং এরপরই আসেন ভাইয়ের ছেলে বা ভাতিজা। সবশেষে চাচা ও তাঁর বংশধরদের অবস্থান।এই নীতি অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির যদি কোনো জীবিত সহোদর ভাই বা রক্তসম্পর্কযুক্ত বৈমাত্রেয় ভাই থেকে থাকেন, তবে অবশিষ্ট সম্পত্তিতে তিনিই ভাতিজার আগে অধিকার পাবেন। সে ক্ষেত্রে ভাতিজা বঞ্চিত থাকবেন। কিন্তু যদি কোনো আপন বা বৈমাত্রেয় ভাই জীবিত না থাকেন, তবে ভাতিজাই ‘আসাবা’ হিসেবে অবশিষ্ট সম্পত্তির প্রকৃত হকদার হিসেবে বিবেচিত হবেন।বৈপিত্রেয় (একই মা, ভিন্ন বাবা) ভাই-বোনের ভিন্ন বিধান :আলেমরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্মরণে রাখার পরামর্শ দেন, তা হলো ‘বৈপিত্রেয়’ ভাই-বোনের অবস্থান। এরা কিন্তু ‘আসাবা’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নন; বরং কোরআনে সরাসরি নির্দিষ্ট অংশপ্রাপ্ত (জাবিল ফুরুজ) তালিকায় পড়েন।নির্দিষ্ট শর্তে (মৃত ব্যক্তির পিতা, দাদা বা সন্তান জীবিত না থাকলে) তাঁরা ৬ ভাগের ১ ভাগ কিংবা যৌথভাবে ৩ ভাগের ১ ভাগ অংশ পান। তবে অবশিষ্ট সম্পত্তিতে তাঁদের কোনো দাবি থাকে না। ফলে কোনো ব্যক্তির সৎ ভাই-বোনের পরিচয় বিচারে তাঁরা বাবার দিক থেকে সম্পর্কিত নাকি মায়ের দিক থেকে—তা শুরুতেই স্পষ্ট করে নেওয়া অত্যাবশ্যক।বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও সমাধান :ইসলামী শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারায়েজের প্রকৃত হিসাব কখনোই বিচ্ছিন্নভাবে কেবল দুজন মানুষের সম্পর্ক দেখে চূড়ান্ত করা যায় না। কারণ মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, পিতা-মাতা, সন্তান কিংবা নাতি-নাতনি জীবিত আছেন কি না—তাঁর ওপর ভিত্তি করে পুরো হিসাবের সমীকরণ আমূল বদলে যেতে পারে।এ কারণে বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘায়িত মামলা ও আত্মীয়দের মাঝে বিরোধ এড়াতে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফতোয়া বিভাগ কিংবা স্বীকৃত ফারায়েজ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে জীবিত সকল ওয়ারিশের তালিকা নিয়ে সঠিক হিসাব বের করার পরামর্শ দেন বিজ্ঞ আলেমরা। রক্তসম্পর্ক ও পারিবারিক সম্পর্কের সীমানা বুঝে সঠিক শরিয়তি উপায়ে সম্পত্তি বণ্টন করা হলে অন্যায়ভাবে কেউ বঞ্চিত হবেন না এবং পারিবারিক শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো