প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
নাহিদ হোসেন ||
শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, কক্সবাজারের শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে থাকা ছোট্ট এক সমুদ্রতীরের গ্রাম—মেঘডুবি। দিনের শেষে সেখানে সূর্য যখন সমুদ্রের বুকে ডুবে যেত, পুরো আকাশটা কমলা আলোয় ভেসে উঠত। আর সন্ধ্যা নামলেই ঢেউগুলো এসে বালুর ওপর লিখে যেত অদৃশ্য সব গল্প—যে গল্প কেউ পড়তে পারত না, শুধু অনুভব করতে পারত।সেই গ্রামেই থাকত মেঘলা।মেঘলার একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। প্রতিদিন বিকেলে সে সমুদ্রের ধারে এসে বসত। কখনো পা ডুবিয়ে রাখত পানিতে, কখনো দূরের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকত। গ্রামের সবাই বলত, মেয়েটা সমুদ্রের সঙ্গে কথা বলে।মেঘলা হেসে বলত,—সমুদ্র কথা বলে না, শুধু মন দিয়ে শোনে।এক বিকেলে হঠাৎ তার দেখা হলো আরিশের সঙ্গে।আরিশ শহর থেকে এসেছিল। হাতে একটা পুরোনো ক্যামেরা, কাঁধে ব্যাগ। সমুদ্রের ছবি তুলছিল সে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার ক্যামেরায় শুধু সমুদ্রের ছবি উঠছিল না—উঠছিল অপেক্ষা, একাকীত্ব আর হারিয়ে যাওয়া কোনো মানুষের ছায়া।মেঘলা কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকে দেখল। তারপর কাছে গিয়ে বলল,—আপনি সমুদ্রের ছবি তুলছেন, অথচ আপনার ছবিগুলো এত বিষণ্ণ কেন?আরিশ ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে মৃদু হেসে বলল,—কারণ সমুদ্র যত সুন্দরই হোক, তার ভেতরেও একটা অপেক্ষা থাকে।মেঘলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,—কিসের অপেক্ষা?আরিশ কিছুক্ষণ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,—যে ঢেউটা চলে গেছে, তার ফিরে আসার।মেঘলা হেসে বলল,—সব ঢেউ কি ফিরে আসে?আরিশ তার দিকে তাকাল।—সব ঢেউ হয়তো আসে না। কিন্তু যার সত্যিই কোনো তীর থাকে, সে একদিন না একদিন ফিরে আসে।সেদিনের কথাটা মেঘলার মনে অদ্ভুতভাবে থেকে গেল।তারপর থেকে আরিশের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হতে লাগল।কখনো তারা পাশাপাশি বসে সূর্যাস্ত দেখত। কখনো মেঘলা গ্রামের গল্প বলত, আর আরিশ শহরের গল্প। কখনো দুজনের মধ্যে কোনো কথাই হতো না। তবু সেই নীরবতাটুকুও যেন কথার চেয়ে বেশি কিছু বলে যেত।একদিন মেঘলা জিজ্ঞেস করল,—আপনি এত ছবি তোলেন কেন?আরিশ বলল,—যে মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখতে পারি না, সেগুলো ছবির মধ্যে রেখে দিই।মেঘলা একটু হেসে বলল,—মানুষকেও কি ছবির মতো ধরে রাখা যায়?আরিশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,—না। মানুষকে ধরে রাখা যায় না। শুধু ভালোবেসে পাশে রাখা যায়।সেদিন প্রথমবার মেঘলার চোখ নেমে গেল।ভালোবাসা কখন যে তাদের দুজনের মধ্যে এসে বসেছিল, তারা কেউ বুঝতে পারেনি। শুধু বুঝেছিল, আরিশ না এলে বিকেলটা অসম্পূর্ণ লাগে। আর মেঘলাকে না দেখলে সমুদ্রটাও আর আগের মতো সুন্দর মনে হয় না।কিন্তু সুখের দিনগুলো খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না।এক সন্ধ্যায় আরিশ চুপচাপ বসে ছিল। মেঘলা বুঝতে পারছিল, কিছু একটা হয়েছে।শেষ পর্যন্ত আরিশ বলল,—আমাকে শহরে ফিরে যেতে হবে।মেঘলা কিছু বলল না।সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে শুধু জিজ্ঞেস করল,—কত দিনের জন্য?আরিশ উত্তর দিল,—জানি না।কথাটা শুনে মেঘলার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল।তবু সে হাসার চেষ্টা করে বলল,—সমুদ্র তো প্রতিদিন ঢেউ পাঠায়। আপনি চাইলে আমাকেও একটা চিঠি পাঠাতে পারেন।আরিশ মৃদু হেসে বলল,—চিঠি পাঠাব।—আর যদি ফিরতে দেরি হয়?আরিশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,—তাহলে অপেক্ষা করবে?মেঘলা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে বলল,—যাকে ভালোবাসা যায়, তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। অপেক্ষা নিজে থেকেই হয়ে যায়।পরদিন আরিশ চলে গেল।তারপর দিন গড়াল। সপ্তাহ পেরিয়ে মাস এল।মেঘলা প্রতিদিন বিকেলে সেই একই জায়গায় এসে বসত। কখনো হাতে চিঠি থাকত, কখনো থাকত না। গ্রামের মানুষ তাকে নানা কথা বলত।কেউ বলত—সে আর আসবে না।কেউ বলত—এভাবে অপেক্ষা করে কী লাভ?মেঘলা শুধু হাসত।কারণ সে জানত, ভালোবাসার হিসাব লাভ-ক্ষতির খাতায় লেখা যায় না।এক বর্ষার বিকেলে হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এলো। সমুদ্র উত্তাল হয়ে উঠল। প্রচণ্ড বাতাসে চারপাশের গাছগুলো দুলছিল।মেঘলা তবু সেদিনও সমুদ্রের ধারে বসে ছিল।হঠাৎ দূরে একজনকে দেখা গেল।বৃষ্টির পর্দার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে প্রথমে চিনতে পারেনি সে।তারপর মানুষটি ধীরে ধীরে কাছে আসতেই মেঘলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।আরিশ।তার হাতে সেই পুরোনো ক্যামেরা।আর অন্য হাতে একটি ফ্রেম করা ছবি।মেঘলা উঠে দাঁড়াল।আরিশ কাছে এসে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ছবিটা এগিয়ে দিয়ে বলল,—এই ছবিটা তোমার জন্য।ছবিতে দেখা যাচ্ছিল একটি সমুদ্রতীর। দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আর বালুর ওপর এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে—তার সামনে অসংখ্য ঢেউ।মেঘলার চোখ ভিজে গেল।সে ধীরে ধীরে বলল,—এতদিন পর?আরিশ মৃদু হেসে বলল,—দেরি হয়েছে, কিন্তু ভুলিনি।—কোথায় ছিলে?—শহরের হাজার মানুষের ভিড়ে।—তাহলে ফিরে এলে কেন?আরিশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,—কারণ শহরে গিয়ে বুঝেছি, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা কোনো শহর নয়, কোনো সমুদ্রও নয়। সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা হলো—যেখানে তুমি অপেক্ষা করছ।মেঘলার চোখ দিয়ে এবার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।আরিশ বলল,—জানো, আমি অনেক সমুদ্র দেখেছি। অনেক ছবি তুলেছি। কিন্তু কোথাও তোমার মতো একটা মানুষকে খুঁজে পাইনি।মেঘলা চোখ মুছে হেসে বলল,—আমি তো বলেছিলাম, ঢেউ ফিরে আসে।আরিশ তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,—আর আমি বলেছিলাম, যার সত্যিকারের তীর থাকে, সে ফিরে আসবেই।সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল।আকাশে ধীরে ধীরে জোছনা উঠছিল। সমুদ্রের ঢেউ এসে তাদের পায়ের কাছে ভেঙে পড়ছিল, আবার ফিরে যাচ্ছিল।মেঘলা আর আরিশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল।কোনো প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন ছিল না।কারণ কিছু ভালোবাসা শব্দে প্রকাশ করতে হয় না। দীর্ঘ অপেক্ষা, অটুট বিশ্বাস আর ফিরে আসার সাহসই তার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ।সেদিন মেঘলা বুঝেছিল—ভালোবাসা কখনো কখনো সমুদ্রের মতো।কত দূরেই সরে যাক,যদি সত্যিই তীরটাকে নিজের করে নেয়—তাহলে একদিন না একদিনফিরে আসবেই।আর সেই রাত থেকে মেঘডুবি গ্রামের মানুষ প্রায়ই দেখত—প্রতিদিন সন্ধ্যায় সমুদ্রের ধারে পাশাপাশি বসে থাকে দুজন মানুষ।একজন সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে।আর অন্যজন তাকিয়ে থাকে তার দিকে।সমুদ্র তখনও ঢেউ পাঠায়।বারবার।যেন তাদের ভালোবাসার গল্পটা প্রতিদিন নতুন করে লিখে যায়।