প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জীবনের সব সঞ্চয়ে মেয়েদের স্কুল, বুরুয়া গ্রামের ‘আলোর দিশারি’ রেখা রানী ওঝা
সাদিয়া নূর পূর্ণ , বিশেষ প্রতিনিধি ||
নিজের জীবন, সংসার কিংবা ব্যক্তিগত সুখের কথা চিন্তা না করে সারাজীবনের উপার্জিত অর্থমূল্য বিলিয়ে দিয়েছেন গ্রামের দরিদ্র ঘরের মেয়েদের মুখে শিক্ষার আলো ফোটানোর কাজে। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের বুরুয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া সাবেক প্রবীণ নার্স রেখা রানী ওঝার এমন আত্মত্যাগের উদাহরণ আজ পুরো অঞ্চলের নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তবে জীবনের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে গড়ে তোলা এই ‘কুমারী রেখা রাণী গার্লস হাই স্কুল’টি দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত (MPO) না হওয়ায় শিক্ষক সংকট ও চরম আর্থিক অনটনে এখন একে টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে।১৯৪৮ সালে এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রেখা রানীকে শৈশবেই পড়ালেখা থামিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর চেষ্টা করেছিলেন তাঁর বাবা। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে জেদ ধরে কখনো আত্মীয়ের বাসায় পালিয়ে থেকে, আবার কখনো পরিজনদের সহায়তায় ঢাকা থেকে নার্সিং শিক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি। ১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা রেখা রানী ২০১১ সালে রাজধানীর মিরপুরের ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অবসর নেন।সংসার না বাঁধলেও রেখা রানী একক জীবনে নিঃসঙ্গ নন। চন্দনা রানী বৈদ্য নামের এক মেয়েকে দত্তক নিয়ে স্নেহে-ভালোবাসায় বড় করেছেন। মা মারা যাওয়ার পর পরিবারের অবহেলায় পড়া চন্দনা আশ্রয় পেয়েছিলেন এই প্রবীণ নার্সের কাছেই। ঢাকায় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করা চন্দনা স্মৃতিচারণ করে বলেন, শ্রীকৃষ্ণ যেমন যশোদার সন্তান, আমিও তেমনি আমার মামণির সন্তান। আমি তাঁর এই স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রতিটি সংগ্রামের সাক্ষী। ঘরে খাবার না থাকলে আলুভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে দিন কাটিয়েছি, অভিমানও হয়েছে। তবে পরক্ষণেই ভেবেছি, মামণি তো পিছিয়ে পড়া মেয়েদের স্বাবলম্বী করার লড়াই করছেন।অবসরে যাওয়ার পর প্রাপ্ত পেনশনের পুরো টাকা জমিয়ে ২০১৪ সালে নিজ গ্রামে রেখা রানী গড়ে তোলেন ‘কুমারী রেখা রাণী গার্লস হাই স্কুল’। দূর থেকে আসা ছাত্রীদের সুবিধার্থে সেখানে একটি হোস্টেলের ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। কিন্তু সরকারি অনুদান বা এমপিওভুক্তি না মেলায় এখন চরম শিক্ষক সংকটে ভুগছে প্রতিষ্ঠানটি।আবেগঘন কণ্ঠে রেখা রানী জানান, শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছি না বলে তাঁরা চলে যাচ্ছেন। দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের থেকে নামমাত্র খরচে পড়ালেখা করানো হয়। এরা একটু সুযোগ পেলেই ঝরে পড়ে বা বাল্যবিয়ে হয়ে যায়। তাই যেভাবেই হোক এদের ধরে রাখার চেষ্টা করছি।সীমাহীন অভাবের মাঝেও প্রতিষ্ঠানটির ফল নজরকাড়া। ২০১৯ সালে জেএসসি পরীক্ষায় পাস করে ৯৪ শতাংশ এবং ২০২১ ও ২২ সালের মাধ্যমিকে পাসের হার যথাক্রমে ৮৯ ও শতভাগ। শিক্ষা ও সামাজিক অবদানের জন্য রেখা রানী লাভ করেছেন সম্মানজনক বঙ্গমাতা নারী জাগরণী প্রেরণা সম্মাননা।দত্তক কন্যা চন্দনা বৈদ্য আকুতি জানিয়ে বলেন, মামণি যদি দেখে যেতে পারেন যে স্কুলের শিক্ষকেরা ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন, তবে তিনি সবচেয়ে খুশি হবেন। প্রবীণ এই মহীয়সী নারীর অদম্য স্বপ্ন এবং শত শত ছাত্রীর ভবিষ্যৎ বাঁচাতে স্কুলটি দ্রুততম সময়ে এমপিওভুক্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহল।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো