প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফেনীর পানাম সিটি: কালের সাক্ষী প্রতাপপুর জমিদারবাড়ি
সাদিয়া নূর পূর্ণ , বিশেষ প্রতিনিধি ||
ইট-সুরকির প্রাচীন দেয়াল, শ্যাওলা পড়া খিলান আর দোতলা দালানের সরু গলি—সব মিলিয়ে যেন নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘পানাম সিটি’র এক আবহ। বলছিলাম ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার পূর্ব চন্দ্রপুর মডেল ইউনিয়নের ঐতিহাসিক প্রতাপপুর জমিদারবাড়ির কথা। সাড়ে ১৩ একরের বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শতবর্ষী এই স্থাপনাটি দেখতে প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসু দর্শনার্থীরা।বাংলা ১২২৮ সালের ১৩ ফাল্গুন রামনাথ কৃষ্ণ সাহা এই রাজবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বড়বাড়ি’ নামে পরিচিত। তিনিসহ তাঁর পাঁচ ভাইয়ের সহাবস্থানের জন্য এখানে নির্মাণ করা হয়েছিল পাঁচটি আলাদা অভিজাত দোতলা ভবন। সুবিশাল এই চত্বরে রয়েছে চমৎকার নকশার কাচারি ঘর, ঠাকুর ঘর এবং ১২টি বিশালাকার পুকুর। পুকুরগুলোর ঘাটে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন পাঁচটি বৈঠকখানা, যেখানে বসে একসময় চলত জমিদারি আড্ডা ও তদারকি। তৎকালীন সময়ে রাজাপুর ও সিন্দুরপুর এলাকার ১০টি তালুকের খাজনা আদায় হতো এখান থেকেই।দীর্ঘদিন রাজত্ব চালনার পর ২০০২ সাল পর্যন্ত জমিদারের বংশধররা এখানে বসবাস করেছিলেন। তবে তাঁদের স্থানান্তরের পর গত দু’দশকে উপযুক্ত সংস্কারের অভাবে ভবনগুলো জীর্ণ রূপ ধারণ করেছে। অনেক জায়গায় ছাদ ও দেয়ালের ইট খসে পড়ছে, গজিয়ে উঠেছে পরজীবী উদ্ভিদ। নিরাপত্তার অভাব, শৌচাগার না থাকা এবং বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় সন্ধ্যার পূর্বেই বাধ্য হয়ে এলাকা ত্যাগ করতে হয় ঘুরতে আসা পর্যটকদের।এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও ভ্রমণপিপাসুরা দ্রুত বাড়িটি সংস্কার করে নিরাপদ পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন। ফেনী জেলার প্রবীণ সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, ভাষা শহীদ আবদুস সালামের স্মৃতিধন্য দাগনভূঞার এই প্রতাপপুর রাজবাড়িটি ফেনীর পর্যটন খাতে এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করতে পারে।অবশ্য ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জায়গা হওয়ায় আইনি সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তবে ফেনী জেলা প্রশাসক জানান, ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ও জমিদারবাড়ির বর্তমান উত্তরসূরিদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এলাকাটিকে পর্যটন কেন্দ্র বা ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।যেভাবে যাবেন:দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে ফেনী জেলা শহরে পৌঁছাতে হবে। ফেনী মহীপাল বাসস্ট্যান্ড বা ট্রাঙ্ক রোড থেকে দাগনভূঞাগামী লোকাল বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা নিজস্ব যানবাহনে দাগনভূঞা বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে পূর্ব চন্দ্রপুর ইউনিয়নের প্রতাপপুর গ্রামের রাজবাড়িতে যাওয়ার জন্য সরাসরি সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত রিকশা পাওয়া যায়।দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা ও পরামর্শ:ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে উঠবেন না: জমিদারবাড়ির ভবনগুলো শতাব্দীপ্রাচীন এবং বহু বছরের সংস্কারহীন। জরাজীর্ণ ভবনগুলোর ছাদ বা ঝুঁকিপূর্ণ বেলকনিতে ওঠা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন।সময়ের খেয়াল রাখুন: এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ও কৃত্রিম আলোর পর্যপ্ত ব্যবস্থা নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই বিকেলের আলো থাকতে থাকতেই প্রাঙ্গণ ত্যাগ করা বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে।পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন: ঐতিহাসিক এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে প্লাস্টিক, ওয়ান-টাইম বোতল, চিপসের প্যাকেট বা অপচনশীল বর্জ্য ফেলে পরিবেশ ও স্থাপত্যের সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না।সামাজিক পরিবেশ বজায় রাখুন: স্থানীয় অধিবাসীদের বিরক্তি বা অসুবিধা হয় এমন কোনো কাজ, উচ্চ শব্দে সাউন্ডবক্স বাজানো বা অসমীচীন আচরণ থেকে বিরত থাকুন।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো