প্রিন্ট এর তারিখ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকায় নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন: দিশেহারা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত, কাটছাঁট হচ্ছে খাবারের তালিকা
নতুন আলো ডেস্ক ||
ঢাকার বিভিন্ন বাজারে দাম বৃদ্ধির শিকায় সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবনের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাছ‑মাংসের দাম শোনার পরই অনেকেরই মুখে হতাশা, আর সন্তানদের পছন্দের খাবার কিনতে পারার স্বপ্নও ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। চাল, ডাল, আলু‑এর মতো মৌলিক পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও, দামের দ্রুত উত্থান গৃহস্থালীর বাজেটকে শূন্যের কাছাকাছি ঠেলে দিচ্ছে।ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রিফাতের একমাত্র উপার্জন উৎস তার নিজস্ব দোকান। আগে তিনি দৈনিক পাঁচ‑ছয় হাজার টাকা আয় করতেন, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে এখন মাত্র তিন হাজার টাকায় সীমিত। রিফাত জানান, দাম বাড়লে ব্যবসায় প্রভাব পড়ে, আর এখন প্রয়োজনীয় জিনিসও ত্যাগ করতে হচ্ছে।রাস্তার পাশে সবজি বিক্রেতা মিজানও একই কষ্টে আছেন। তিনি সপ্তাহে এক‑দুবার মাছ‑মাংস খেতেন, এখন সবজি কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার দৈনিক আয় ছয়‑সাতশ টাকা, তবে খরচ সাত‑আটশ টাকায় পৌঁছায়, ফলে খাবারের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। মিজান বলেন, নিম্নমধ্যবিত্ত হিসেবে আমরা বেশি কষ্টে আছি; অতি নিম্নবিত্তের তুলনায় সাহায্য পেতে পারি না, আর সন্তানদের চাহিদা পূরণ করা দূরের কথা।বাজারে গৃহস্থালীর ব্যয় অর্ধেকের বেশি ভাগে গৃহস্থালী আয়ের ওপর গড়ে উঠেছে এমন একটি মধ্যবিত্ত দম্পতি জানান, মাসিক বেতন ৪০‑৫০ হাজার টাকা হলেও বাজারের খরচে অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয়। গৃহস্থালী ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি যাতায়াত ও অন্যান্য খরচও বাড়ছে, ফলে সঞ্চয়ের কোনো সুযোগ বাকি নেই।একজন পোশাক কারখানার মার্চেন্ডাইজার সাইফের মতে, দামের বৃদ্ধি এমন এক সীমা অতিক্রম করেছে যেখানে পূর্বের জীবনযাত্রা বজায় রাখা কঠিন। আমরা এখন কম‑বেশি করে খেতে বাধ্য, যদিও চাহিদা বদলাতে পারি না।” তিনি যোগ করেন, “বাজারে দাম দেখে প্রায়ই প্রয়োজনীয় পণ্য না কিনেই ফিরে আসতে হয়, আর কখনো কখনো উচ্চ দামে কিনতে হয়।খুচরা বিক্রেতা আহাদ আলী জানান, ক্রেতারা এখন তালিকা ছোট করে কেনাকাটা করছেন। তিনি পূর্বে পাইকারি দরে পাম তেল ও পোলাওয়ের চাল কিনতেন, এখন ১২০‑১২৫ টাকার দরে না পেয়ে ১৮৫‑১৮৬ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য। একই পরিস্থিতি মাছ বিক্রেতা শাকিলেরও, যিনি তিন‑চার বছর আগে ১৮০‑৩০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করতে পারতেন, এখন সবজি কিনতে পাঁচশ টাকার বেশি খরচ হয়।দিনমজুর আমীন আলীর আয়ও নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। আগে তিনি পাঁচ‑আটশ টাকার কাজ করে চলতেন, এখন কাজের ঘাটতি ও কম বেতনের কারণে দৈনিক চার‑পাঁচশ টাকাই পান। এই সীমিত আয়ে গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা, চাল‑তেল কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আমাদের মতো গরিবের জন্য চাল, ডাল, তেল, আলু—এই চারটি জিনিসের দাম কমলেই আমরা খুশি।একজন মধ্যবয়সী বাবার কণ্ঠে গ্যাস সংকটের কষ্টও শোনা যায়। পাঁচ বছর আগে সীমিত আয়েও তিনি চালাতে পারতেন; এখন গ্যাস না থাকলে কাঠ বা কেরোসিন ব্যবহার করতে হয়, আর সন্তানদের দুধের টাকাও নেই। তার স্ত্রীকে সেলাইয়ের কাজের জন্য বাইরে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন।কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, সচ্ছল মানুষের কাছে এই দামের চাপ সামলানোর সামর্থ্য আছে, তবে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস সরবরাহের সমস্যার ওপর তিনি জোর দিয়ে বলেন, অনেক গ্রাহক গ্যাস না পেলেও বিল দিচ্ছেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়; সরকারের বিশেষ নজর দরকার।জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম যুগান্তর উল্লেখ করেন, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বহু ধাপের পরিবহন খরচ দামের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। চালের দাম জাত‑ভেদে ভিন্ন, ডিমের দামও এখন নাগালের মধ্যে। ভোজ্যতেল সরকার নির্ধারণ করে, তবে বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা দরকার।দ্রব্যমূল্যের অব্যাহত উত্থান গৃহস্থালীকে মৌলিক চাহিদা মেটাতে কঠিন করে তুলেছে, আর সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান বাড়ছে।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো