প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মার্চ ২০২৬
হামে এক মাসে ৪১ শিশুর মৃত্যু, মজুত শূন্যে ৬ টিকা
বিশেষ প্রতিনিধি , ঢাকা ||
দেশে আবারও গুরুতর টিকা সংকট দেখা দিয়েছে, যা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় গুদামে অন্তত ১০টি রোগ প্রতিরোধী টিকার মজুত শূন্যে নেমে এসেছে। একই সময়ে চলতি মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৪১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও সরকারি হাসপাতাল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টিকা কেনার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হওয়ায় এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে টিকার স্বল্পতা ও জনবল সংকটের কারণে অনেক শিশু ও মা নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর ফলে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যু বাড়ছে এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সফল টিকাদান কর্মসূচির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। নিয়মিত টিকা প্রদান কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশটি পোলিও ও ধনুষ্টংকার নির্মূলে সফল হয়েছে এবং হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে। হামও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০২৫ সালের মধ্যে হাম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অর্জন হুমকির মুখে পড়েছে।স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “আট বছর আগে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল, এরপর আর দেওয়া হয়নি।” তিনি জানান, সরকার ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং দ্রুত টিকা সংগ্রহ করে বিতরণ শুরু করা হবে। এছাড়া সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং ঢাকা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও চিকিৎসা প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।সংকটের পেছনের কারণটিকা সংগ্রহ ও বিতরণে আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ জানান, এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—টিকার সরবরাহ ও লজিস্টিক সমস্যামাঠপর্যায়ে জনবল ঘাটতিটিকাদান কার্যক্রমে নজরদারির দুর্বলতাকোভিড-পরবর্তী সময়ে ড্রপআউট বৃদ্ধি, ফলে অনেক শিশু প্রথম ডোজ নিলেও দ্বিতীয় ডোজ পায়নিএছাড়া শহরাঞ্চলেও টিকার সমান বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।টিকা মজুতের বর্তমান অবস্থাইপিআই কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় গুদামে বর্তমানে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুত সম্পূর্ণ শেষ। আইপিভি ও টিসিভি টিকার মজুত জুন পর্যন্ত চলবে এবং এইচপিভি টিকা রয়েছে ডিসেম্বর পর্যন্ত।দেশে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ১২টি রোগ প্রতিরোধে ৯ ধরনের টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে শিশুদের জন্য রয়েছে সাতটি টিকা এবং নারীদের জন্য দুটি—এইচপিভি ও টিডি।কাঠামোগত সমস্যাও দায়ীবিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা সংকটের অন্যতম কারণ প্রশাসনিক পরিবর্তন। আগে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে দ্রুত টিকা সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্টে এই ব্যবস্থা বাতিল হওয়ায় নতুন প্রকল্প অনুমোদন, অর্থছাড় ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিলম্ব সৃষ্টি হয়েছে।এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে পরিবর্তন এবং কিছু সময় গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকাও সংকটকে তীব্র করেছে।জনবল সংকটে ভেঙে পড়ছে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৭ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট রয়েছে। এসব জেলায় প্রায় ৪৫ শতাংশ পদ খালি। ফলে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।অন্যদিকে টিকা পরিবহনে নিয়োজিত ‘পোর্টার’দের ৯ মাস ধরে বেতন বকেয়া থাকায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য সহকারীদের একাধিক কর্মবিরতির কারণেও টিকাদান কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে।হামে মৃত্যুর বাড়তি চাপদেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়—রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এ মাসে ১৯ শিশুর মৃত্যুরাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জনময়মনসিংহ মেডিকেলে ৫ জনচাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩ জনঅন্যান্য স্থানে আরও কয়েকজনসব মিলিয়ে চলতি মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে ৪১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ।জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল এই পরিস্থিতিকে “অত্যন্ত দুঃখজনক” উল্লেখ করে বলেন, টিকা ফুরিয়ে যাওয়া এবং শিশুমৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করতে দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন। দায়িত্বশীলদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি জানান তিনি।বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, টিকা সংকট শুধু সাময়িক সমস্যা নয়—এটি প্রশাসনিক দুর্বলতা, সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং মাঠপর্যায়ের সংকটের সম্মিলিত ফল। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বহু বছরের অর্জন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং শিশুস্বাস্থ্যে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো