প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
স্ক্রিন টাইম বনাম জীবন: সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তিতে বিপন্ন হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য
নাহিদ হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধি ||
বর্তমান যুগে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্মার্টফোন। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত আমাদের হাতের মুঠোয় থাকছে ইন্টারনেটের দুনিয়া। কিন্তু এই আশীর্বাদ কি অভিশাপে পরিণত হচ্ছে? সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উদ্বেগ (Anxiety), বিষণ্নতা (Depression) এবং একাকীত্ব আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিভিন্ন সামাজিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এই সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে।ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউব—এই প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারী একবার ঢুকলে সহজে বের হতে না পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিটি লাইক, কমেন্ট বা শেয়ার মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক এক ধরণের রাসায়নিক নিঃসরণ করে, যা আমাদের সাময়িক আনন্দ দেয়। এই আনন্দের সন্ধানেই তরুণরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকছেন।একজন গড়পড়তা তরুণ বা তরুণী দিনে অন্তত ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা স্মার্টফোনে ব্যয় করছেন। এর বড় একটি অংশ কাটছে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিং করে, যার কোনো গঠনমূলক আউটপুট নেই।সোশ্যাল মিডিয়ার ঝলমলে দুনিয়া অনেক সময় তরুণদের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করছে। অন্যের সুন্দর ছবি, ভ্রমণ বা সাফল্যের গল্প দেখে নিজের জীবনের সাথে তুলনা করতে গিয়ে অনেকেই হতাশায় ভুগছেন। একে বিশেষজ্ঞরা বলছেন FOMO বা Fear of Missing Out। অর্থাৎ, সবাই বোধহয় অনেক ভালো আছে, শুধু আমিই পিছিয়ে আছি—এই ধারণা তরুণদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে।এছাড়াও, সাইবার বুলিং বা অনলাইনে অন্যের নেতিবাচক মন্তব্য তরুণদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে। রাতের পর রাত জেগে মোবাইল ফোন ব্যবহার করার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে (Insomnia), যা সরাসরি তাদের মেজাজ এবং পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।শুধু মানসিক নয়, দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহারে দেখা দিচ্ছে শারীরিক জটিলতাও। যেমন:দৃষ্টিশক্তির ক্ষতি: স্ক্রিনের ব্লু-লাইট চোখের রেটিনার ক্ষতি করছে।ঘাড় ও পিঠে ব্যথা: দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে ফোন ব্যবহারের ফলে টেক্সট নেক সিনড্রোম দেখা দিচ্ছে।স্থূলতা: শারীরিক পরিশ্রম না করে এক জায়গায় বসে ফোন চালানোয় ওজন বেড়ে যাচ্ছে, যা পরবর্তীকালে ডায়াবেটিস বা হার্টের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।একই ঘরে বসে থেকেও পরিবারের সদস্যরা এখন একে অপরের সাথে কথা না বলে মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন। একে বলা হয় ফাবিং(Phubbing)। পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়ার অন্যতম কারণ এই অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতা। বাস্তব জগতের বন্ধুত্বের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের পরিচিতি এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা মানুষকে সামাজিকভাবে একা করে দিচ্ছে।স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া এই যুগে সম্ভব নয়, তবে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা কিছু সমাধান দিয়েছেন:স্ক্রিন টাইম লিমিট: স্মার্টফোনে অ্যাপ ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিন।নো-ফোন জোন: খাওয়ার টেবিল এবং শোবার ঘরে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করুন।বাস্তব শখ: বই পড়া, বাগান করা বা খেলাধুলার মতো সৃজনশীল কাজে সময় ব্যয় করুন।ডিজিটাল ডিটক্স: সপ্তাহে অন্তত একদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন।সচেতনতা: বাবা-মাকে সন্তানের স্ক্রিন টাইমের দিকে নজর রাখতে হবে এবং তাদের সাথে গুণগত সময় কাটাতে হবে।প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্য, জীবনকে গ্রাস করার জন্য নয়। সোশ্যাল মিডিয়া যেন আমাদের নিয়ন্ত্রক না হয়ে ওঠে, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। তরুণ প্রজন্মকে এই আসক্তি থেকে বের করে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে এক মানসিকভাবে বিধ্বস্ত জাতি গড়ে ওঠার ঝুঁকি থেকে যায়। বাস্তব পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আমাদের মাঝেমধ্যে স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে পাশের মানুষটির দিকে তাকাতে হবে।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো