প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
ফিল্টার আর এডিটিংয়ের জাদুতে চিরতরুণ অনলাইন প্রোফাইল : পর্দার আড়ালে একাকিত্ব
নতুন আলো ডেস্ক ||
২০২৬ সালে ডিজিটাল বাস্তবতার যুগে আমাদের প্রত্যেকের হাতেই একটি স্মার্টফোন রয়েছে। এই ফোনের সাহায্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে আমরা যুক্ত। সেগুলোয় আমরা যখন কোনো নিখুঁত ছবি বা নিজেদের সাফল্যের গল্প শেয়ার করি, তার পেছনে থাকা ক্লান্তি, বিষণ্নতা বা চোখের নিচের কালি খুব সুন্দর করে মুছে ফেলি। এই নিখুঁত হওয়ার ইঁদুরদৌড় আমাদের ঠেলে দিচ্ছে ডোরিয়ান গ্রে ইফেক্ট (Dorian Gray Effect) নামক এক ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক সংকটের দিকে।কী এই ডোরিয়ান গ্রে ইফেক্ট?১৮৯০ সালে প্রখ্যাত সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর দ্য পিকচার অব ডোরিয়ান গ্রে উপন্যাসে এক সুদর্শন যুবকের গল্প বলেছিলেন। সেখানে ডোরিয়ান গ্রে নামের সেই যুবক কামনা করেছিলেন, যেন বার্ধক্য ও জীবনের সকল গ্লানি তাঁর শরীরের ওপর কোনো প্রভাব না ফেলে, বরং সেগুলো যেন জমা হয় তাঁর একটি তেলচিত্রে। অদ্ভুতভাবে তাঁর সেই ইচ্ছে পূরণ হয়। ডোরিয়ান বাস্তবে চিরতরুণ রয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁর আড়ালে লুকিয়ে রাখা ছবিটি দিনে দিনে চরম বীভৎস ও কুৎসিত হতে লাগল।আধুনিক যুগে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলগুলো আসলে ডোরিয়ান গ্রের মতোই এক একটি তেলচিত্র। যেখানে বিভিন্ন ফিল্টার আর এডিটিংয়ের জাদুতে আমরা নিজেদের একটি নিখুঁত সংস্করণ প্রদর্শন করি। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। এই চির উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবির আড়ালে আমাদের আসল শরীর ও মনে বার্ধক্য, ক্লান্তি আর ব্যর্থতার দাগ বাড়ছে—যা ডোরিয়ানের সেই জরাজীর্ণ ছবির মতোই। শেষ পর্যন্ত নিজের বাস্তব সত্তাকে অস্বীকার করার এই নেশা আমাদের গভীর মানসিক অস্থিরতা আর আত্মপরিচয়ের সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।যে কারণে সোশ্যাল মিডিয়া তীব্র মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠছে :মেকি নিখুঁত জীবন দেখানোর প্রবণতা : আমরা অনলাইনে আমাদের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো এমনভাবে সাজাই, যা দেখে অন্যেরা হীনম্মন্যতায় ভোগে।ফোমো (FOMO) বা হারানোর ভয় : অন্যের সাজানো আনন্দদায়ক পোস্ট দেখে আমাদের মনে অনবরত ভয় কাজ করে—আমরা হয়তো জীবনের সেরা সুযোগগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।অনবরত তুলনা : ২৪ ঘণ্টা অন্যের সাজানো ডিজিটাল অস্তিত্বের সঙ্গে নিজের অগোছালো বাস্তব জীবনের তুলনা করতে গিয়ে আমরা তীব্র বিষণ্নতায় ভুগছি।বাস্তবতাকে মেনে না নেওয়া : মানুষ যখন দীর্ঘ সময় ধরে নিজের একটি পারফেক্ট ইমেজ বা ফিল্টার করা ছবি দেখে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সে আয়নায় নিজের চেহারার সাধারণ ছোটখাটো খুঁতগুলো আর সহ্য করতে পারে না।ডিজিটাল মুখোশ : আমাদের অনলাইন প্রোফাইলগুলো চিরকাল সফল আর সুখী দেখালেও, পর্দার আড়ালে আমাদের মন হয়ে যাচ্ছে ডোরিয়ান গ্রের সেই সরিয়ে রাখা কুৎসিত তেলচিত্রের মতো।লাইক ও কমেন্টের নেশা : একটি ছবির লাইক বা কমেন্ট এখন আমাদের আত্মমর্যাদার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ক্ষণস্থায়ী ডোপামিন রাশ (Dopamine Rush) আমাদের নিজস্ব সত্তাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।নিদ্রাহীনতা ও একাকিত্ব : স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের ঘুমের স্বাভাবিক ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এবং আমাদের সামাজিকভাবে আরও বেশি একাকী করে তুলছে।মুক্তির উপায়: বিশেষজ্ঞরা যা বলছেনঅস্কার ওয়াইল্ড আমাদের সতর্ক করেছিলেন, মানুষ তাঁর বাস্তব সত্তাকে অস্বীকার করে শুধু বাইরের প্রতিচ্ছবি নিয়ে মত্ত থাকলে তার ভেতরের আসল সত্তাটি ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায়। এই অভিশপ্ত চক্র থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন :বাস্তবতা মেনে নেওয়া : জীবনের স্বাভাবিক ক্লান্তি, বার্ধক্য অথবা ব্যর্থতাকে জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মেনে নিতে শিখুন।ডিজিটাল ডিটক্স (Digital Detox) : প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি সময় সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন এবং অফলাইনে বাস্তব মানুষের সঙ্গে সময় কাটান।সচেতন ব্যবহার : সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো পোস্ট বা প্রোফাইল দেখে নিজের মধ্যে নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি হলে তৎক্ষণাৎ সেই অ্যাকাউন্ট আনফলো করুন এবং ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।ডিজিটাল ফিল্টারের আড়ালে নিজের আসল অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলাটাই আধুনিক যুগের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি। কৃত্রিম উপায়ে নিখুঁত হওয়ার চেয়ে আসল হওয়া অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক। ডোরিয়ান গ্রের মতো অভিশপ্ত সৌন্দর্যের পেছনে না ছুটে বাস্তব জীবনের ছোটখাটো খুঁতগুলো নিয়েই নিজেকে ভালোবাসতে শেখা আজ সবচেয়ে বেশি জরুরি।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো