প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
পাহাড়ের বুকে পানির জন্য হাহাকার, খাগড়াছড়ির দুর্গম গ্রামে অবর্ণনীয় কষ্ট
বিশেষ প্রতিনিধি , চট্টগ্রাম ||
পাহাড়ের জীবন যেমন সবুজে মোড়া, তেমনি এখানকার কঠিন বাস্তবতায় ঘেরা মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি আজও এক অনিশ্চিত প্রাপ্তি। তীব্র গরমে পার্বত্য খাগড়াছড়ির দুর্গম জনপদগুলোতে সুপেয় পানির সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। জেলার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এই মুহূর্তে পানির তীব্র অভাবে ভুগছেন, যার মধ্যে পাহাড়ের উঁচুতে বসবাসকারীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি।রাত পোহালেই এখানকার বাসিন্দাদের পানির খোঁজে ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। ঝিরি, ছড়া কিংবা কুয়ার পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে পাহাড়ি নারীদের প্রতিদিন করতে হচ্ছে এক নীরব যুদ্ধ।মাটিরাঙ্গা উপজেলার সাপমারা এলাকার কুয়া থেকে কলসিতে পানি ভরতে ভরতে ৬২ বছরের বৃদ্ধা কুসুমবালা ত্রিপুরা নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, পাড়া থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার নিচে ছড়ার পাশে কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। এখন কুয়াতেও পানি মিলছে না। উঁচু-নিচু পাহাড় বেয়ে নেমে এক কলস পানি মাথায় করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শরীরের সব শক্তি শেষ হয়ে যায়।একই এলাকার বাসিন্দা সতোষ ত্রিপুরা জানান, তাঁদের এলাকার ৯২টি পরিবারকে বছরের এই সময়ে চরম সংকটে ভুগতে হয়। এক কলস পানি সংগ্রহ করতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লেগে যায়। দিনে তিনবার এই কষ্ট করতে হয়। সুপেয় পানির কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে কুয়ার দূষিত পানি পান করতে হচ্ছে, যার ফলে ঘরে ঘরে মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।খাগড়াছড়ি সদরের ঠাকুরছড়া, কলাপাড়া, ধৈলাতলী, দীঘিনালার নয়মাইল, এবং পানছড়ির ওয়াক্রাপাড়াসহ শত শত পাহাড়ি গ্রামে এখন একই চিত্র। মাটিরাঙ্গার ধৈইল্যাহাজাপাড়ার কারবারি নিরু কুমার ত্রিপুরা জানান, তাঁর পাড়ার ৪২টি পরিবারের জন্য কুয়া খুঁড়েও এখন পানি পাওয়া যাচ্ছে না।সরেজমিনে মাটিরাঙ্গার সাপমারা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ি ছড়াগুলো একেবারে শুকিয়ে গেছে। মৃত ছড়ার বালুর ওপর সারি সারি পাথর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রিপন চাকমা এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে শহর এলাকাতেই প্রায় ৫০০ ফুট গভীরে পানি মিলছে, যা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়জুড়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলায় প্রাকৃতিক পানির উৎসগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পানিসংকট মোকাবিলায় এই মুহূর্তে প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।দূষিত পানি পানের কারণে উদ্ভূত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, দুর্গম এলাকায় গরমের সময় পানির স্তর নেমে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে অনিরাপদ পানি পান করে। এর ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস, পেটের পীড়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত অসুখ বাড়ছে। নিরাপদ পানি পাওয়া না গেলে অন্তত ফুটিয়ে পান করতে হবে। এছাড়া বিকল্প হিসেবে প্রতি ৫ লিটার পানিতে একটি করে হ্যালোজেন ট্যাবলেট দিয়ে আধা ঘণ্টা রেখে দিলে সেই পানি পানের উপযোগী হয়।পাহাড়ের এই দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘবে খাগড়াছড়ি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী কে এম সাঈদ মাহমুদ বলেন, দুর্গম এলাকাগুলোর পানিসংকট দূর করতে আমরা নতুন পরিকল্পনা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে প্রজেক্ট সাবমিট করেছি। অনুমোদন পেয়ে এলেই দ্রুত কাজ শুরু হবে।অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত আশার বাণী শুনিয়ে বলেন, এই শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির অভাব প্রকট। আমরা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি। যেসব অঞ্চলে পানির তীব্র সংকট রয়েছে, সেখানে সৌরবিদ্যুতের (Solar Power) মাধ্যমে বিশেষ পাম্প স্থাপন করে পানি উত্তোলনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি নিয়ে আমরা দ্রুত কাজ করছি।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো