প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬
টাইপিং মিসটেক
নাহিদ হোসেন ||
সকাল সকাল তপ্ত কড়া রোদের মধ্যে সুমনের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। কারণটা অবশ্য গরম নয়, কারণটা হলো তার মোবাইল স্ক্রিনের একটা ছোট্ট টাইপিং মিসটেক।সুমন পেশায় একজন জুনিয়র টেলিকম ইঞ্জিনিয়ার। কাজের চাপে তার মাথা এমনিতেই চারভাগ হয়ে থাকে। তার ওপর আজ ছুটির দিন শুক্রবার। আজ তার প্রিয়তমার সাথে দেখা করার কথা। প্রেমিকা সুমি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, বিকেল চারটার মধ্যে যদি কুষ্টিয়া বক চত্বরের সামনে না আসো, তবে আমাদের সম্পর্কের এখানেই সমাপ্তি!চাকরি বাঁচানো আর প্রেম বাঁচানো—এই দুই যুদ্ধের মাঝে পড়ে সুমনের জীবন তখন তপ্ত কড়াইতে ভাজা মচমচে চানাচুর।ঠিক দুপুর ৩টায়, যখন সে সুমির সাথে দেখা করার জন্য পাঞ্জাবি পরে আয়নার সামনে চুল ঠিক করছে, তখনই তার অফিসের বস কামরুল সাহেবের মেসেজ এল। কামরুল সাহেব কড়া মেজাজের মানুষ। সামান্য ভুল হলেই জুনিয়রদের কান ধরে ওঠবস করাতে ছাড়েন না। বসের মেসেজ :সুমন, আমাদের ফরিদপুর জোনের ওই সাইটের আজকের রিপোর্টটা কি রেডি? আর বিকেল ৫টায় যে জরুরি মিটিং আছে, ওটার ফাইলটা গুছিয়েছ?সুমন দ্রুত টাইপ করতে গেল :জি স্যার, সব রেডি। কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু নির্দেশ দিন, আমি মিটিংয়ে হাজির হব। আপদ-বিপদ যাই আসুক, আপনার সব কাজ আমি একাই সামলাব।কিন্তু তাড়াহুড়ো আর উত্তেজনার চোটে অটো-কারেক্ট আর টাইপিং মিসটেকের এমন এক মহাজাগতিক মিলন ঘটল যে, মেসেজটি সেন্ড হওয়ার পর সুমনের চোখ চড়কগাছ হয়ে গেল! মেসেজ গেছে এইরকম:জি স্যার, সব রেডি। কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু বিয়ে দিন, আমি মিটিমিটি হাসব। আপদ-বিপদ (সুমি) যাই আসুক, আপনার বউকে আমি একাই সামলাব।হায় আল্লাহ! নির্দেশ দিন হয়ে গেছে বিয়ে দিন, আর সব কাজ হয়ে গেছে বউ! সুমনের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল। সে দ্রুত মেসেজটি ডিলিট ফর এভরিওয়ান করতে গেল, কিন্তু ভাগ্য খারাপ হলে যা হয়—আঙুলের ছোঁয়ায় চাপ লেগে গেল ডিলিট ফর মি!যার অর্থ, মেসেজ সুমনের ফোন থেকে গায়েব, কিন্তু বসের ফোনে জ্বলজ্বল করছে।ঠিক দুই মিনিটের মাথায় বসের ফোন। সুমন কাঁপতে কাঁপতে ফোন ধরল, হ্যালো , স্যার—আসলে ওটা টাইপিং মিস—ওপাশ থেকে বস গম্ভীর গলায় বললেন, সুমন! আমি জানি আমার প্রথম বউয়ের সাথে ডিভোর্সের পর আমি একাকীত্বে ভুগছি। কিন্তু তাই বলে তুমি আমার জন্য পাত্রী খুঁজবে? আর আমার আপদ-বিপদ বউকে তুমি একাই সামলাবে? এত বড় সাহস তোমার!না স্যার! ওটা সব কাজ ছিল, টাইপিং মিসটেকে বউ হয়ে গেছে! সুমনের কান্না তখন নাকের ডগায়।বস কিছুক্ষণ চুপ থেকে হুট করে হেসে উঠলেন। আচ্ছা রাখো। তোমার ভাবি মানে আমার নতুন হবু বউ পাশে বসে মেসেজটা দেখেছে। ও বলল—তোমার এই জুনিয়র ছেলেটা তো বেশ রসিক! তাকে আমাদের বিয়েতে দাওয়াত দিও। যাক, তোমার ওপর আর রাগ করলাম না। ফাইলটা মেইল করে দিয়ে জলদি যাও, তোমার আপদ-বিপদ সুমি নিশ্চয়ই বক চত্বরে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে!সুমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, চাকরিটা অন্তত বেঁচে গেল!এবার সে সুমিকে মেসেজ পাঠাল :জান, আমি রওনা দিচ্ছি। ঠিক চারটায় পৌঁছে যাব। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ গিফট আনছি।কিন্তু বিধি বাম! এবারও তাড়াহুড়ো। সুমির ফোনে মেসেজ গেল:জান, আমি রওনা দিচ্ছি। ঠিক চারটায় পৌঁছে যাব। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ শেয়াল আনছি।দশ সেকেন্ডের মধ্যে সুমির রিপ্লাই এল : বক চত্বরে তুমি শেয়াল নিয়ে আসবে মানে কী? তুমি নিজে একটা আস্ত খাঁটি শেয়াল! আজকে আসো তুমি চত্বরে, জুতো দিয়ে তোমার সারপ্রাইজ বের করছি!সুমন কপালে হাত দিয়ে সোফায় বসে পড়ল। স্মার্টফোনের এই যুগে এসে তার মনে হলো—ভবিষ্যতে আর যাই হোক, প্রেম আর চাকরি বাঁচাতে হলে মেসেজ পাঠানো বন্ধ করে সরাসরি কবুতরের পায়ে চিঠি বেঁধে পাঠানোই সবচেয়ে নিরাপদ!
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো