প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
কর্পোরেট
নাহিদ হোসেন ||
আমাদের অফিসে নতুন একজন লোক নেওয়া হবে।
পদের নাম — এক্সিকিউটিভ, বিজনেস অপারেশন অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেশন।এই নাম শুনে আমি তিন মিনিট চুপ ছিলাম।
কারণ এত বড় নামের কাজটা কী, সেটা অফিসের কেউ জানতো না।
এমনকি যিনি পোস্ট দিয়েছেন, সেই রাশেদ স্যারও সম্ভবত নিশ্চিত ছিলেন না।জব সার্কুলারে লেখা ছিল —
ক্যান্ডিডেটকে হতে হবে স্মার্ট, অ্যাডাপ্টিভ, রেজাল্ট-ড্রিভেন, ফাস্ট-লার্নার এবং চাপের মধ্যে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।
আমি পড়ে বললাম,স্যার, লোক নিবেন নাকি অ্যাভেঞ্জার্স টিম বানাবেন?স্যার চশমা ঠিক করে বললেন,এগুলো কর্পোরেট স্ট্যান্ডার্ড।কর্পোরেটে স্ট্যান্ডার্ড মানে হলো —
যে কথার মানে কেউ বুঝে না, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।ইন্টারভিউ শুরুর দিন :প্রথম ক্যান্ডিডেট ঢুকলো।
নাম — ফাহিম।চুলে এত জেল দিয়েছে যে মাথায় ম্যাচ মারলে সম্ভবত আগুন ধরে যাবে।
বসে বললো,স্যার, আই বিলিভ ইন স্মার্ট এক্সিকিউশন অ্যান্ড সিনার্জি।বস সঙ্গে সঙ্গে মুগ্ধ।আমি পাশে বসে ভাবলাম —
এই ছেলেটা বাংলা জানে তো?বস জিজ্ঞেস করলেন,আপনার স্ট্রেংথ কী?ফাহিম আত্মবিশ্বাসী গলায় বললো,স্যার, আমি যেকোনো পরিস্থিতিতে লিডারশিপ নিতে পারি।আমি মনে মনে বললাম —
ভাই, আগে চেয়ারটা ঠিকমতো বসো, তারপর দেশ চালাইয়ো।দ্বিতীয় ক্যান্ডিডেট — সাবাসাবা ঢুকেই বললো,স্যার, এখানে ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স কেমন?বস একটু কেশে বললেন,মানে?সাবা বললো,আমি রাতে আটটার পরে কাজ করি না। মানসিক শান্তি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।এই কথা শুনে আমাদের অ্যাকাউন্টসের কামাল ভাই বাইরে থেকে হেসে ফেললো।
কারণ সে গত তিন বছর ধরে রাত দশটার আগে বাসায় যায়নি।সাবা আরও বললো,স্যার, অফিসে কি মেডিটেশন রুম আছে?বস এবার পুরোপুরি চুপ।
মনে হচ্ছিল তিনি জীবনে প্রথম বুঝলেন, চাকরিপ্রার্থীরাও প্রশ্ন করতে পারে।শেষ ক্যান্ডিডেট — সোহেলসোহেল খুব সাধারণ।
সাধারণ শার্ট, সাধারণ জুতা , হাতে পুরনো একটা ফাইল।বসে আস্তে করে বললো,স্যার, আমি আসলে কাজ শিখতে চাই।বস জিজ্ঞেস করলেন,নিজেকে পাঁচ বছর পরে কোথায় দেখতে চান?সোহেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,স্যার, সত্যি বলতে জানি না। তবে যেখানেই থাকি, মানুষ যেন বলে — ছেলেটা কাজের ছিল।ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।কর্পোরেটে এই ধরনের উত্তর বিপজ্জনক।
কারণ এখানে মানুষ সত্য কথা শুনতে অভ্যস্ত না।চাকরি পেলো ফাহিম।কারণ সে কথা বলতে পারে।
এবং কর্পোরেটে কথা বলতে পারা মানেই অনেক সময় কাজ জানা বলে ধরে নেওয়া হয়।প্রথম সপ্তাহেই সে মিটিংয়ে বললো —আমাদের একটা অ্যাজাইল মাইন্ডসেট তৈরি করতে হবে।অফিসের সবাই মাথা নাড়লো।
কেউ বুঝলো না।আমি একদিন সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম,ভাই, অ্যাজাইল মাইন্ডসেট জিনিসটা কী?ফাহিম কফিতে চুমুক দিয়ে বললো,এটা ফিল করতে হয়।সেদিন বুঝলাম —
কর্পোরেট জগতে সবচেয়ে নিরাপদ উত্তর হলো এমন কিছু বলা, যেটা শুনে কেউ প্রশ্ন করতে ভয় পায়।কয়েক মাস পরে ফাহিম অফিসে দেরি করে আসে।
ফাইল জমা দেয় না।
মেইলের রিপ্লাই ভুলে যায়।কিন্তু প্রতিদিন সকালে বসকে দেখে বলে,স্যার, আজকে আপনাকে খুব শার্প লাগছে!বস হাসেন।
সব ভুল মাফ হয়ে যায়।এই অফিসে কাজের চেয়ে প্রশংসার মূল্য বেশি।ছয় মাস পরফাহিম রিজাইন দিলো।কারণ — Better Opportunity.বিদায়ের সময় সবাই তাকে মিস করার অভিনয় করলো।
কেক কাটা হলো। ছবি তোলা হলো।আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম।হঠাৎ পিয়ন মতিন ভাই পাশে এসে বললো,ভাই, এই পোলাপান আসলে কাজ করে কখন?আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,মতিন ভাই, এরা কাজ কম করে…
কিন্তু কাজের কথা এমনভাবে বলে যে মনে হয় পৃথিবী এদের কাঁধেই চলছে।তারপর দু’জনে চুপচাপ চা খেলাম।কর্পোরেট দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো —
এখানে যে মানুষটা সত্যিই কাজ পারে, সে নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে।আর যে কিছুই পারে না,
সে মিটিংয়ে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে জোরে বলে —
Guys, we need to think bigger!
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো