প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
অনুভবে এইতো ভালোবাসা
নাহিদ হোসেন ||
রাতের ঘুম আজকাল আর আসে না।
না, কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
তবু বুকের ভেতর কোথাও একটা চাপা অস্থিরতা জমে থাকে।ঘুম না এলে মোবাইল হাতে নিই,
এফএম রেডিওতে গান শুনি।
আজ একটা গান বাজছে—
যাচ্ছ দূরে যাও তুমি, বাধা দেব না…
ফিরে আসবে, এটাও জানি—অদ্ভুতভাবে গানটা যেন আমার জন্যই বাজছিল।
মনটা হালকা বিষণ্ণ হয়ে উঠলো।হঠাৎ গান থেমে গেল।
রিংটোন বাজছে।ডিসপ্লেতে ভেসে উঠলো— অহনা।অহনা খুব শান্ত আর সরল একটা মেয়ে।
অনার্সে পড়ে।
কিন্তু তার কথাবার্তায় এমন এক ধরনের মায়া আছে,
যেন অনেক আগেই জীবনকে বুঝে ফেলেছে।আমি জানতাম, সে একটা অনুভবের ভেতর বাস করে—
যেটার নাম সে দিয়েছে ভালোবাসা।কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো তার চেনা কণ্ঠ—— ঘুমিয়ে পড়েছিলে? বিরক্ত করছি না তো?— না, এখনো জেগে আছি। তুমি কেমন আছো?— ভালো। তুমি?তার তুমি শব্দটা কেমন যেন বুকের ভেতর নরম একটা ধাক্কা দিল।আমি চুপ করে থাকতেই অহনা মৃদু হেসে বললো—— আজ তোমাকে তুমি করে বললাম—কিছু মনে করোনি তো?— না — আজকের তারিখটা মনে আছে?আমি ফোনের স্ক্রিনে তাকালাম।অহনা হালকা অভিমানী গলায় বলল—— তোমাকে নিয়ে কিছুই হলো না। গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোও মনে রাখতে পারো না।আমি কিছু বললাম না।
ও যেন আমার নীরবতাও বুঝে ফেললো।— জানো, চুপ করে থাকার মানে আমি এখন বুঝে গিয়েছি। তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।হঠাৎ অহনা ধীরে ধীরে বললো—— আমি ঠিক করেছি, আজকের পর আর ফোন করবো না।
তোমাকে জোর করে ভালোবাসতে চাই না।
তোমাকে বিরক্ত করাটা আমার সবচেয়ে সুন্দর অভ্যাস ছিল—
আজ সেটাও ছেড়ে দেব।তার গলা কাঁপছিল।
মনে হচ্ছিল কান্না লুকিয়ে কথা বলছে।আমার গলা শুকিয়ে এলো।— অহনা—বাস্তবতা অনেক কঠিন।
আজ একটু কষ্ট পেলে পরে হয়তো সহজ হবে।ও থামিয়ে দিল—— না, আমার কষ্ট নিয়ে তুমি কিছু বলো না।
তুমি জানো না, কিছু মানুষকে ভুলে যাওয়া যায় না।আমি চুপ করে শুনছিলাম।
ভেবেছিলাম ও কাঁদবে না।
ভেবেছিলাম আমি কাঁপবো না।
কিন্তু সম্পর্ক কখনো হিসেব মেনে চলে না।আমি বললাম—— একদিন তোমার পড়াশোনা শেষ হবে,
ভালো একজন মানুষ আসবে তোমার জীবনে।
তখন আজকের এই কথাগুলো মনে করে হাসবে।অহনা খুব আস্তে বললো—— না, হাসবো না।
এই একতরফা ভালোবাসাটাই হয়তো আমার সবচেয়ে প্রিয় অনুভব হয়ে থাকবে।তারপর কলটা কেটে গেল।আমি অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম।
শুধু মনে হচ্ছিল—
কিছু মানুষ দূরে চলে গেলেও,
তাদের অনুভব থেকে যায়।দু’দিন কেটে গেল।
অহনার কোনো ফোন নেই, মেসেজ নেই।তবু অদ্ভুতভাবে বারবার ফোনটা হাতে নিচ্ছিলাম।
অভ্যাসগুলো মানুষকে খুব সহজে ছেড়ে যায় না।সেদিন রাতে দরজার নিচ দিয়ে একটা খাম ভেতরে ঢুকে এলো।খুলে দেখি—
অহনার হাতের লেখা।চিঠিটা খুব ছোট ছিল।
তুমি বলেছিলে সময় সব বদলে দেয়।
হয়তো দেয়ও।
কিন্তু কিছু অনুভব বদলায় না।
তোমাকে ভালোবাসাটা হয়তো একদিন থেমে যাবে,
কিন্তু তোমাকে অনুভব করার অভ্যাসটা থেকে যাবে সারাজীবন।
চিঠিটা আমি বারবার পড়লাম।
চোখের কোণে জমে থাকা জলটা লুকাতে পারলাম না।তিন বছর পর।আমি তখন ঢাকার একটা কর্পোরেট অফিসে কাজ করি।
ব্যস্ততা, মিটিং, ডেডলাইন—
সব মিলিয়ে জীবনটা যন্ত্রের মতো হয়ে গেছে।ভাবতাম অহনাকে ভুলে গেছি।কিন্তু সেদিন বইমেলায় হঠাৎ একজোড়া পরিচিত চোখের সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম।অহনা।অনেক বদলে গেছে।
চুল ছোট হয়েছে, চোখে আর আগের সেই চশমা নেই।
তবুও তার ভেতরের শান্তিটা একই রকম রয়ে গেছে।আমার দিকে তাকিয়ে সে হালকা হাসলো।— কেমন আছো?— ভালো,তুমি?— আমিও।কথাগুলো খুব সাধারণ ছিল,
তবু বুকের ভেতর অদ্ভুত ভার লাগছিল।আমি ধীরে বললাম—— তোমার চিঠিটা এখনো রেখে দিয়েছি।অহনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো—— আমিও তোমাকে।মেলার সেই দেখা হওয়ার এক মাস পর অহনার একটা মেসেজ এলো।
কাল বিকেলে সময় হবে?
একবার দেখা করতে চাই। শেষবার।
পরদিন বিকেলে ও এল নীল শাড়ি পরে।
খোলা চুল, চোখে নরম ক্লান্তি।পাশে বসেই বললো—— আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আগামী মাসে।আমি কিছু বললাম না।অহনা মৃদু হেসে বললো—— জানো, এখন বুঝেছি।
ভালোবাসা সবসময় কাছে পাওয়ার নাম না।
কিছু ভালোবাসা শুধু অনুভব হয়ে বেঁচে থাকে।আমি ধীরে বললাম—— ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না অহনা।ও তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
তারপর খুব শান্ত গলায় বললো—— তুমি আজও বদলাওনি।
চোখে এখনও সেই নীরবতা।চলে যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকালো অহনা।আমি তাকাইনি।কারণ কিছু অনুভবকে
ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে
তারা আরও দূরে সরে যায়।
আর কিছু ভালোবাসা—
পাশে না থেকেও
আজীবন অনুভবে বেঁচে থাকে।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো