প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
মরুভূমির পথে পদ্মা: অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই ও আমাদের দায়বদ্ধতা
নাহিদ হোসেন, সম্পাদক ||
আজ ১৬ মে, ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। ১৯৭৬ সালের এই দিনে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী উজানের পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে যে বজ্রকণ্ঠ তুলেছিলেন, আজ পাঁচ দশক পরও সেই দাবি কেবল প্রাসঙ্গিকই নয়, বরং তা আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সময়ের বিবর্তনে উত্তরবঙ্গের প্রাণরেখা পদ্মা আজ মৃতপ্রায় এক মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।রাজশাহী অঞ্চলের পদ্মার বর্তমান চিত্র যে কোনো সচেতন নাগরিককে আতঙ্কিত করে তোলার জন্য যথেষ্ট। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নদীর প্রবাহ এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে শীর্ণ নালায় পরিণত হয়েছে। মাইলের পর মাইল কেবল ধু-ধু বালুচর। যে নদীর গর্জন একসময় কয়েক মাইল দূর থেকে শোনা যেত, সেখানে এখন কেবল ধূসর হাহাকার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, গত এক বছরের ব্যবধানে পানির স্তর অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।পদ্মার এই শুকিয়ে যাওয়ার প্রভাব কেবল দৃশ্যত নয়, এর সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় শুরু হয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি কৃষকের সেচ কাজ আজ হুমকির মুখে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কয়েক হাজার হস্তচালিত পাম্প অকেজো হয়ে পড়েছে। হারিয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির মাছ, কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার জেলে ও মাঝি। নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রকৃতি ও মানুষের এই আর্তনাদ কি আমাদের নীতিনির্ধারকদের কানে পৌঁছাচ্ছে?পদ্মার এই করুণ দশার প্রধান কারণ যে উজানে নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মাধ্যমে আমরা যে পরিমাণ পানি পাওয়ার কথা, তা আমরা পাচ্ছি না বলেই অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য যে, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হতে যাচ্ছে। এটি আমাদের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ। নতুন করে চুক্তি নবায়নের সময় বাংলাদেশকে অবশ্যই ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো জোরালো ও সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি ক্লজ নিশ্চিত করতে হবে।দেশের উত্তরাঞ্চলকে মরুকরণ থেকে বাঁচাতে হলে পদ্মায় পানির ন্যায্য হিস্যার কোনো বিকল্প নেই। সরকার যদি এখনই কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু না করে এবং ভারতের সাথে পানির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল নদীই নয়, বিপন্ন হবে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও ইকো-সিস্টেম।আমরা মনে করি, কেবল দিবস পালন বা সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক নদীর পানির অধিকার আদায়ে রাষ্ট্রকে আরও সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। পদ্মা বাঁচলে উত্তরবঙ্গ বাঁচবে, আর উত্তরবঙ্গ বাঁচলে বাঁচবে বাংলাদেশ। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক—পদ্মার বুক থেকে মরুভূমি সরিয়ে সেখানে পুনরায় প্রাণের জোয়ার ফিরিয়ে আনা।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো