প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
অসহায় নাগরিক, দায়িত্বহীন রাষ্ট্র: আমরা কি তবে আশাহীনতার দিকেই যাচ্ছি?
নাহিদ হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধি ||
একটি সীমানার মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন সংঘবদ্ধ হয়, তখন তাদের মূল চাওয়া থাকে দুটি—জীবিকার নিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা। রাষ্ট্র ও তার সরকারের দায়িত্ব জনগণের এই মৌলিক চাহিদাগুলোর জোগান দেওয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে আজ রাষ্ট্র এবং নাগরিকের মধ্যকার সেই সামাজিক চুক্তি চরম সংকটের মুখে। একদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া সিন্ডিকেট, অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সীমাহীন দায়িত্বহীনতা সাধারণ মানুষকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম যেভাবে আকাশচুম্বী হচ্ছে, তাতে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। পুষ্টির অভাবে একটা বিরাট জনগোষ্ঠী ছিন্নমূলের কাতারে চলে যাচ্ছে। নদীভাঙন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানুষ আজ মহাজন ও এনজিওর চড়া সুদের ঋণের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বহু শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ায় যে বিপুল মানুষ বেকার হয়েছে, তাদের পুনর্বাসনে রাষ্ট্রীয় কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের অতি-অংশগ্রহণ। বিপুল অর্থের বিনিময়ে যখন ব্যবসায়ীরা নীতি-নির্ধারক হয়ে ওঠেন, তখন তারা দেশসেবার চেয়ে নিজেদের ব্যবসা সুসংহত করতেই ব্যস্ত থাকেন। ফলে জন্ম নেয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কালেভদ্রে দু-একজন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এই সিন্ডিকেট ভাঙা অসম্ভব। যেখানে নিয়মিত বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিতে হয়েছিল, সেখানে মোবাইল কোর্টকে কেন সব সময়ের জন্য আইনগতভাবে সর্বোচ্চ সক্রিয় ও কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, তা এক মস্ত বড় প্রশ্ন।একইভাবে আমাদের শহরের রাজপথগুলো আজ অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দখলে চলে গেছে। কোনো লাইসেন্স বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই বিপুল চালকশ্রেণি তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে উচ্চ সুদের ঋণের ফাঁদ। ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে মানুষ বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বেছে নিচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র এদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সঠিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত ভুল শিক্ষা ও দলীয়করণের ফলে সমাজ আজ বিভক্ত। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক বদলে যাওয়ার সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় ঐক্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।শিক্ষার পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যখাতের নৈরাজ্য আজ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি দেশে হামের কারণে শত শত শিশুর অকাল মৃত্যুর ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কঙ্কালসার রূপটিকেই উন্মোচিত করেছে। নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে চরম অজ্ঞতাই এই ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী। নিকট অতীতেও দেশের নাজুক স্বাস্থ্যখাতে সংকট এলে রাষ্ট্রকে যেভাবে তৎপর হতে দেখা যেত, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ক্লান্তিহীন উদ্যম অদৃশ্য। এই শিশু মৃত্যুর পেছনে যাদের গাফিলতি রয়েছে, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে বিচার করা রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব।যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাঁদের চোখে ঘুম থাকার কথা নয়। প্রতিনিয়ত অন্যায্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের সদা জাগ্রত থাকার কথা, যাতে তাঁদের দেখে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাও কর্মচঞ্চল থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা আজ উল্টো। এত সীমাহীন দুর্নীতি, প্রতিহিংসা আর অব্যবস্থাপনার মধ্যে সাধারণ মানুষ কীভাবে বাঁচবে? মানুষ কি বারবার দিশেহারা হয়ে কেবল আশাহীনতার বৃত্তেই ঘুরপাক খাবে, নাকি রাষ্ট্র অবশেষে তার নাগরিকদের বাঁচবার একটি সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত পথ নির্ধারণ করবে? আমরা একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও সংবেদনশীল রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করি।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো