প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ মে ২০২৬
প্রেমা — শেষ না হওয়া গল্প
নাহিদ হোসেন ||
অধ্যায় ১ : প্রথম দেখাসেদিন বিকেলের শহরটা অদ্ভুত রকমের ব্যস্ত ছিল।রিকশা পাচ্ছিলাম না বলে বিরক্ত মুখে ফুটপাত ধরে হাঁটছিলাম। চারদিকে হর্ন, মানুষের ভিড়, ধুলোমাখা বাতাস—সব মিলিয়ে ক্লান্ত একটা সন্ধ্যা।ঠিক তখনই চোখ পড়লো রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের দিকে।সাদা-নীল সালোয়ার কামিজ, খোলা চুল, আর একজোড়া অদ্ভুত শান্ত চোখ।মেয়েটা আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। পাশে দাঁড়ানো বান্ধবীরা ওকে কিছু একটা বলছে, হাসছে, ধাক্কা দিচ্ছে। অথচ ওর চোখ সরছে না।আমি ভান করলাম কিছুই দেখিনি।হাঁটতে থাকলাম ধীর পায়ে।কিন্তু মনের ভেতর কোথাও একটা অদ্ভুত ইচ্ছে জন্ম নিল—মেয়েটা যদি সত্যিই আমার পেছনে আসে?কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ কেমন যেন মনে হলো কেউ অনুসরণ করছে।ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই বুকটা ধক করে উঠলো।মেয়েটা সত্যিই আমার পেছনে দাঁড়িয়ে।চোখেমুখে লজ্জা, কিন্তু তবু সাহস করে এগিয়ে এলো।নরম গলায় বলল—— এক্সকিউজ মি… আমার নাম প্রেমা। আপনার সাথে একটু কথা ছিল।সেই মুহূর্তে কী হয়েছিল জানি না।হয়তো অহংকার, হয়তো অকারণ রাগ, কিংবা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা—আমি ঠান্ডা গলায় বলেছিলাম,— আশ্চর্য মেয়ে তো আপনি!রাস্তায় কোনো ছেলেকে দেখলেই কথা বলতে ইচ্ছে করে নাকি?কথাটা বলেই বুঝেছিলাম, ওর চোখটা কেমন নিভে গেল।প্রেমা কিছু বলতে চেয়েছিল।ঠোঁট কেঁপেছিল সামান্য।কিন্তু আমি শুনিনি।একটা রিকশা থামিয়ে উঠে পড়েছিলাম।রিকশা চলতে শুরু করলে একবার পিছনে তাকাই।মেয়েটা তখনও দাঁড়িয়ে।শহরের ভিড়ের মাঝেও তাকে ভীষণ একা লাগছিল।আর আমার বুকের ভেতর শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—এটা কি ঠিক হলো?অধ্যায় ২ : ভুল বোঝাবুঝির দেয়ালতারপর অনেকদিন কেটে যায়।অফিস, ব্যস্ততা, মানুষের ভিড়—সব আগের মতোই চলতে থাকে।শুধু মাঝে মাঝে হঠাৎ সেই মুখটা মনে পড়ে যায়।কেন এসেছিল মেয়েটা?কী বলতে চেয়েছিল?আর আমি কেন ওর কথা না শুনেই চলে এসেছিলাম?ঠিক তখনই একদিন একটা পুরোনো খামে ভাঁজ করা চিঠি এসে পৌঁছালো আমার হাতে।প্রেরক — রাজ।ছয় বছর আগে যার সাথে বন্ধুত্ব ভেঙে গিয়েছিল।চিঠির কাগজে পুরোনো দিনের গন্ধ লেগে ছিল।রাজ লিখেছিল—তুই হয়তো ভাবছিস এতদিন পর কেন লিখছি।কারণ তোর করা ভুলটা আমি আর সহ্য করতে পারছি না।প্রেমা আমার চাচাতো বোন।ও তোকে সত্যিই ভালোবাসত।আজও বাসে।তুই ওর কথা না শুনেই যেভাবে অপমান করলি, সেটা ও প্রাপ্য ছিল না।যদি পারিস, ওকে একবার সুযোগ দে।চিঠিটা পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম।বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।জানালার কাঁচ বেয়ে পানি নামছিল ধীরে ধীরে।হঠাৎ মনে পড়লো প্রেমার সেই শেষ কথাগুলো।সেদিন ও কাঁপা গলায় বলেছিল—— আমি কী দোষ করেছিলাম বলো?ভালোবেসেছিলাম… এইটাই কি আমার অপরাধ?ওর চোখে জল ছিল।অভিমান ছিল।আর ছিল এক সমুদ্র ভাঙা নীরবতা।তারপর ঝড়ের মতো চলে গিয়েছিল।আর কোনোদিন সামনে আসেনি।অধ্যায় ৩ : ছেঁড়া চিঠির টুকরোরাজের চিঠির পরও জীবন বদলায়নি।শুধু ভেতরে ভেতরে বুঝতে শিখলাম—কিছু ভুল সময়ের চেয়েও বড় হয়ে যায়।আমি প্রেমাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম অনেক আগেই।নিজেকেও ক্ষমা করতে চেয়েছিলাম।কিন্তু কিছু অনুভূতি ক্ষমা পেলেও আর আগের জায়গায় ফিরে আসে না।ভালোবাসা হয়তো প্রথম বৃষ্টির মতো—হঠাৎ আসে, সব ভিজিয়ে দেয়,তারপর একদিন নিঃশব্দে হারিয়ে যায়।আমি ধীরে ধীরে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেললাম।ছোট ছোট টুকরো হয়ে উড়ে গেল বাতাসে।মনে হলো,এগুলো শুধু কাগজের টুকরো নয়—অসমাপ্ত কিছু কথা,না বলা কিছু অনুভূতি,আর হারিয়ে যাওয়া একটা ভালোবাসার শেষ চিহ্ন।জানালার বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল।আর আমি প্রথমবার বুঝলাম—সব গল্পের শেষ হয় না।কিছু গল্প শুধু থেমে যায়।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো