প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মে ২০২৬
বদলে যাওয়া বৃষ্টিপাত ও বিপন্ন প্রকৃতি: আমাদের করণীয়
নাহিদ হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধি ||
আজকাল গ্রীষ্মকালেই কদম ফুল ফুটতে দেখা যাচ্ছে, যা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে প্রকৃতির চিরচেনা রূপ কতটা বদলে গেছে। আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষা এখন আর পঞ্জিকার পাতা মেনে আসছে না। মে মাসেই সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে, যার স্পষ্ট আভাস মিলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যে। একদিকে তীব্র বজ্রঝড় ও নিম্নচাপের পূর্বাভাস, অন্যদিকে মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া তীব্র দাবদাহ—প্রকৃতির এই দুই চরম রূপ একই সাথে আমাদের হজম করতে হচ্ছে। অথচ এপ্রিল মাসেই স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছিল এবং মে মাসের প্রথম ১০ দিনও দেশজুড়ে চলেছে অকাল বৃষ্টি। এই খামখেয়ালি আবহাওয়া আমাদের মনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়—বাংলাদেশের বৃষ্টির ধরন কি চিরতরে বদলে যাচ্ছে?বৃষ্টির এই অনিয়মিত আচরণের সবচেয়ে বড় মাশুল গুনছেন আমাদের কৃষকেরা। সাধারণত এ সময়ে ভারতের উজানে বৃষ্টি বেশি হলেও, এবার বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে প্রায় দ্বিগুণ বৃষ্টি হয়েছে। ফলে অসময়ে ফসলের খেত তলিয়ে গেছে, বাজারে সবজির সরবরাহ কমে গিয়ে দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে হাওরাঞ্চলে। অকাল বৃষ্টিতে প্রায় পেকে আসা বোরো ধান যেন মাটির সাথে মিশে গেছে। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশে গ্রিনহাউস বা পলিনেটহাউসে চাষাবাদ হয় না; আমাদের কৃষক খোলা মাঠের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে জুয়া খেলেন। আজ যে বীজ বোনা হচ্ছে, কাল তা অতিবৃষ্টিতে নষ্ট হবে কি না, তা কেউ জানে না। এই অনিশ্চয়তা শুধু কৃষকের ক্ষতি করছে না, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলছে।শুধু ফসলের ক্ষতিই নয়, কালবৈশাখী আর তীব্র বজ্রপাত এখন এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছরের প্রথম চার মাসেই বজ্রপাতে দেশজুড়ে ৭২ জন মানুষ মারা গেছেন, যার মধ্যে ২৬ এপ্রিল এক দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। গ্রাম থেকে শহর—কোথাও এই বিপর্যয় থেকে মুক্তি নেই। এছাড়া ফেনীতে ঘটে যাওয়া ক্লাউড বার্স্টিং বা মেঘ বিস্ফোরণের মতো নতুন নতুন চরম প্রাকৃতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে আমাদের।বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, এল নিনো ও লা নিনার প্রভাব, এবং বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণ ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। তবে এর পেছনে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মনুষ্যসৃষ্ট কারণই বেশি দায়ী। অতিরিক্ত নগরায়ণ, শিল্প-কারখানার দূষণ এবং নির্বিচারে বন উজাড় করার ফলে পানিচক্রের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। গাছ কাটার ফলে বাতাসের আর্দ্রতা কমছে, যা স্থানীয় আবহাওয়াকে শুষ্ক বা চরম ভাবাপন্ন করে তুলছে।বৃষ্টির ধরন বদলে যাওয়ার পেছনে সাম্প্রতিক সবচেয়ে উদ্বেগজনক কারণটি উন্মোচন করেছেন আমেরিকার পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। চীন ও জাপানের মেঘ পরীক্ষা করে তাঁরা মেঘের ভেতরেও প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন। জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি: এয়ার-এ প্রকাশিত এই গবেষণা অনুযায়ী, প্লাস্টিক কণা মেঘের গঠন এবং তা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে উড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে।সাধারণত বিশুদ্ধ পানিকণা মাইনাস ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে জমাট বাঁধে, কিন্তু প্লাস্টিক কণার উপস্থিতির কারণে তা মাইনাস ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (অর্থাৎ ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি তাপমাত্রা) আবহাওয়াতেই জমাট বেঁধে বরফে পরিণত হচ্ছে। এই অদৃশ্য ও জটিল দূষণই মেঘের স্বাভাবিক রূপ বদলে দিচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে আমরা অসময়ে অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির মুখোমুখি হচ্ছি।বৃষ্টিপাতের এই অনিয়মিত ধরন আমাদের ঋতুবৈচিত্র্যকে গিলে খাচ্ছে, যার শেষ পরিণতি খাদ্যসংকট এবং মানবজাতির অবলুপ্তি। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সাথে যুদ্ধ করে জেতা সম্ভব নয়, তবে দুটি মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা এই বিপর্যয় কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পারি :ব্যাপক বন সৃজন : নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করে প্রতিটি অঞ্চলে বনায়ন বৃদ্ধি করতে হবে, যা প্রকৃতির জৈবিক পাম্প হিসেবে কাজ করে পানিচক্র সচল রাখবে।প্লাস্টিক পণ্য বর্জন : দৈনিক জীবন থেকে শুরু করে শিল্পক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা বর্জন করতে হবে, যাতে মেঘ ও বায়ুমণ্ডল এই বিষাক্ত কণার হাত থেকে রক্ষা পায়।প্রকৃতিকে বাঁচাতে এবং আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আমরা কি এই ন্যূনতম ত্যাগটুকু করতে পারবো না? সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো