প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
কেবল এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, নদী রক্ষায় চাই দীর্ঘমেয়াদি সদিচ্ছা
নাহিদ হোসেন, সম্পাদক ||
নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি, অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও জনজীবনের মূল চালিকাশক্তি হলো আমাদের নদ-নদী। শনিবার (২৩ মে) সারা দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হলো জাতীয় নদী দিবস। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য—নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে, নদী রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসুন—অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত। দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, সেমিনার, র্যালি কিংবা নদী পরিষ্কারের মতো নানা আনুষ্ঠানিকতা আমরা দেখেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বছরের একটি মাত্র দিন নদী নিয়ে এই তোড়জোড় কি আমাদের মুমূর্ষু নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে?বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক রক্তের মতো গভীর। আমাদের কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবই নদীকেন্দ্রিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী শুধু পানির উৎস নয়; এটি একটি জীবন্ত প্রতিবেশ ব্যবস্থা। অথচ চরম বাস্তব হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান অবৈধ দখল, লাগামহীন দূষণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, বিষাক্ত শিল্পবর্জ্য এবং পলিথিন ফেলার কারণে দেশের বহু নদী আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর ভয়াবহ দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশবাদীরা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী সমাধান মেলেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট-বড় অসংখ্য নদী নাব্যতা হারিয়ে আজ শুকিয়ে মৃতপ্রায় খাঙে পরিণত হচ্ছে।নদী ধ্বংসের এই আত্মঘাতী মরণখেলার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদেরই। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে জলাবদ্ধতা, বন্যা, খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে নদী রক্ষায় সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খনন কার্যক্রমসহ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থাও কাজ করছে। কিন্তু আইনের কঠোর প্রয়োগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে এসব উদ্যোগের বেশিরভাগই আলোর মুখ দেখছে না। উচ্ছেদ অভিযানের কয়েকদিন পরই নদী আবার দখলদারদের কব্জায় চলে যাওয়ার চোর-পুলিশ খেলা বন্ধ হওয়া জরুরি।আমরা মনে করি, নদী পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হলে নদীভিত্তিক শিক্ষা ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন। স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই পরিবেশ ও নদী সুরক্ষার পাঠ দেওয়া উচিত। নদী শুধু আমাদের ভৌগোলিক পরিচয়ের অংশ নয়, এটি এই বদ্বীপের ফুসফুস। নদীকে বাঁচাতে পারলে তবেই আমাদের পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষিত থাকবে। অতএব, কেবল দিবসভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে নদী রক্ষায় জাতীয় অঙ্গীকার এবং তার কঠোর বাস্তবায়নই হোক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম ভিত্তি।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো