প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬
ঢাকা ফাঁকা, বিপদে আমি একা
নাহিদ হোসেন ||
ঈদের ছুটিতে আমি গ্রামে। এমন সময় এক ছোট ভাই ফোন দিল।— ভাই, আপনি কবে ফিরবেন?আমি বললাম,— কেন? কোনো জরুরি কাজ?সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,— জরুরি না, জীবন-মরণ সমস্যা।আমি একটু চিন্তিত হয়ে বললাম,— কী হয়েছে?ছোট ভাই বলল,— ঢাকা শহরে এখন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। মনে হচ্ছে পুরো শহরটা আমাকে একা রেখে সবাই গ্রামে চলে গেছে।আমি হাসতে হাসতে বললাম,— তুই তো আগে বলতিস, মানুষ বেশি হলে বিরক্ত লাগে!— ঠিকই বলতাম। কিন্তু মানুষ একেবারে না থাকলেও যে এত সমস্যা হবে, তা বুঝিনি।— কী সমস্যা?— ধরেন, আগে আমার এলাকায় হাজার হাজার মানুষ ছিল। এখন মনে হয় আমি আর দু-একটা বিড়াল ছাড়া কেউ নেই। কিন্তু মশাগুলো সব রয়ে গেছে। ওদের তো ঈদের ছুটি নেই! আগে হাজার মানুষের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে কামড় দিত। এখন পুরো এলাকার মশা আমার উপরই গবেষণা চালাচ্ছে।আমি বললাম,— তাহলে মশারির ভিতরে থাক।সে বলল,— থাকি। কিন্তু বাজারে তো যেতেই হয়। গতকাল বাজারে গেছি, দেখলাম দোকানদারও ঈদের ছুটিতে। একটা দোকানের সামনে লেখা, জরুরি প্রয়োজনে ফোন দিন। ফোন দিলাম। উনি বললেন, আমি এখন গ্রামের বাড়িতে। জরুরি হলে ঈদের পর আসেন।আমি বললাম,— ঢাকা ফাঁকা হওয়ারও সুবিধা আছে। যানজট নেই।ছোট ভাই বলল,— সুবিধা আছে, কিন্তু তারও বিপদ আছে। রাস্তায় এত কম মানুষ যে মাঝে মাঝে নিজের ছায়া দেখেও চমকে উঠি।আমি বললাম,— তুই বেশি নাটক করিস।সে বলল,— নাটক না ভাই, বাস্তব ঘটনা। গতকাল সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হয়েছিলাম। রাস্তা ফাঁকা। দূরে একটা মানুষকে দেখে খুব খুশি হলাম। ভাবলাম, অন্তত একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। কাছে গিয়ে দেখি, মানুষ না—একটা ম্যানিকিন!আমি হেসে ফেললাম।ছোট ভাই আবার বলল,— আরেকটা ঘটনা শুনেন। বৃষ্টি শুরু হলো। আমি দৌড়ে একটা ভবনের ছাউনির নিচে দাঁড়ালাম। একটু পর ভেতর থেকে একজন বের হয়ে বলল, কাকে চান?আমি বললাম, কাউকে না, শুধু বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছি।লোকটা বলল, আচ্ছা, তাহলে ঠিক আছে। আমি ভাবছিলাম, এত ফাঁকা শহরে কেউ এসে দরজায় দাঁড়ালেন নিশ্চয়ই আত্মীয়-স্বজন!আমি বললাম,— তারপর?— তারপর উনি চা খাওয়ালেন। কিন্তু চা শেষ হওয়ার পর বললেন, যেহেতু তুমি এখন ঢাকার বিরল মানুষদের একজন, একটা উপকার করবে? ছাদের ট্যাংকিটা একটু দেখে দাও তো!আমি বললাম,— এটা আবার কেমন উপকার?ছোট ভাই বলল,— ভাই, এখন ঢাকায় যে মানুষ পাওয়া যায়, তাকে সবাই বহুমুখী কর্মী মনে করে। কেউ বাজারের ব্যাগ ধরিয়ে দেয়, কেউ গ্যাসের সিলিন্ডার টানাতে চায়, কেউ আবার ওয়াই-ফাই ঠিক করতে বলে।আমি হেসে বললাম,— তাহলে তুই গ্রামে চলে আয়।সে একটু চুপ করে থেকে বলল,— আসলে সেটাও পারছি না।— কেন?— বাড়িওয়ালা বলেছে, তুমি থাকো বাবা। পুরো বিল্ডিং ফাঁকা। রাতে অন্তত একটা ঘরে আলো জ্বললে মনে হয় ভবনটা এখনও জীবিত আছে!ফোনের ওপাশে তার দীর্ঘশ্বাস শুনে মনে হলো, ঈদের ছুটিতে ঢাকার শেষ মানুষ হওয়ার কষ্টটা সত্যিই কম নয়!
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো