প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১০ জুন ২০২৬
চিঠির ভাঁজে লুকানো প্রেম
নাহিদ হোসেন ||
মেঘলা বিকেলের শহরটা তখন বৃষ্টির পানিতে ধোয়া। কলেজ ছুটির পর ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। দূরের আকাশে কালো মেঘ, আর আমার চোখে একটাই নাম—মেহরিন।মেহরিনকে প্রথম দেখেছিলাম কলেজের লাইব্রেরিতে। সে বই পড়ত, আমি তাকে দেখতাম। সে জানত না। কিংবা হয়তো জানত, কিন্তু না জানার ভান করত।আমার বন্ধু রায়হান একদিন হঠাৎ বলল,—দোস্ত, মেয়েটাকে আমার খুব ভালো লাগে।আমি হেসে বললাম,—তাহলে বল।—পারি না। তুই একটু সাহায্য কর।বন্ধুর অনুরোধ ফেলতে পারিনি। শুরু হলো আমার অদ্ভুত দায়িত্ব।মেহরিনকে নানা অজুহাতে লাইব্রেরিতে নিয়ে যেতাম। রায়হান সেখানে অপেক্ষা করত। কখনো চায়ের দোকানে, কখনো নদীর ধারে, কখনো কলেজ মাঠে তাদের দেখা করানোর চেষ্টা করতাম।কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো—যতবার মেহরিনের সঙ্গে দেখা হতো, ততবার বুঝতে পারতাম আমি নিজেই তার চোখের গভীরে হারিয়ে যাচ্ছি।একদিন রায়হান বলল,—আমি ওকে একটা চিঠি দিতে চাই। কিন্তু লিখতে পারছি না।আমি হেসে বললাম,—ঠিক আছে, আমি লিখে দিচ্ছি।সেদিন রাতেই টেবিল ল্যাম্পের আলোয় বসে চিঠি লিখতে শুরু করলাম।তোমার হাসিটা অদ্ভুত সুন্দর। তোমাকে দেখলেই মনে হয় পৃথিবীর সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।লিখতে লিখতে থমকে গেলাম।এ কি রায়হানের কথা?নাকি আমার?তবু লিখলাম।একটার পর একটা চিঠি।প্রতিটি শব্দে যেন আমার নিজের হৃদস্পন্দন লুকিয়ে থাকত।কয়েকদিন পর উত্তর এলো।খামের ওপরে কোনো নাম নেই।ভেতরে শুধু একটি লাইন—যে মানুষ এই চিঠিগুলো লিখছে, আমি তাকে চিনে ফেলেছি।সেদিন রাতে ঘুম আসেনি।মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব তারারা যেন আমার জানালার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।তারপর শুরু হলো আমাদের চিঠির গল্প।দিনের পর দিন।রাতের পর রাত।কখন যে বন্ধুর জন্য লেখা চিঠি আমার নিজের প্রেমের ভাষা হয়ে উঠেছিল, বুঝতেই পারিনি।মেহরিনও বুঝেছিল।আমি-ও বুঝেছিলাম।কিন্তু কাউকে কিছু বলিনি।প্রেম অনেক সময় উচ্চারণের আগেই জন্ম নেয়।শব্দের আগেই তার অস্তিত্ব তৈরি হয়।আমাদেরও হয়েছিল ঠিক তেমন।বহু বছর পর একদিন শহরের এক স্কুলের সামনে রায়হানের সঙ্গে দেখা।তার চোখে আগের সেই উজ্জ্বলতা নেই।চুলে পাক ধরেছে।আমিও বদলে গেছি।কুশল বিনিময়ের পর হঠাৎ মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা কোনোদিন তাকে বলা হয়নি।যে চিঠিগুলো তার নামে লেখা হয়েছিল,সেগুলো আসলে আমার হৃদয়ের ভাষা ছিল।আমি চুরি করিনি।আমি শুধু ভালোবেসেছিলাম।আর ভালোবাসা কখনো কখনো এমনই—সে কারও অনুমতি নিয়ে আসে না।হঠাৎ আসে।নিঃশব্দে আসে।তারপর সারা জীবন থেকে যায় চিঠির ভাঁজে লুকিয়ে।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো