প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
যে চিঠিগুলো আমার ছিল
নাহিদ হোসেন ||
তাড়াতাড়ি কর, নীল! এত ভয় পেলে হবে?পাশের বাড়ির ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে রাইমা আমাকে ডাকছিল। দুই ছাদের মাঝখানে তিনতলার সমান ফাঁক। নিচে ভেজা গলি, বৃষ্টির পানি জমে আছে।আমি মাথা নেড়ে বললাম, আমি পারব না।রাইমা হাসল।তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতু ছেলে।অভিমান হলো। কিন্তু কিছু বললাম না। কারণ আমি রাইমার সঙ্গে সময় কাটানোর কোনো সুযোগ হারাতে চাইতাম না।তাছাড়া আমি তখন একটা বিশেষ দায়িত্বে ছিলাম।আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু অর্ণব রাইমাকে ভালোবাসত।আর আমি ছিলাম তাদের দুজনের মাঝে সেতু।অর্ণব প্রথম দিন আমাকে বলেছিল এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়।চায়ের দোকানের টিনের চালের নিচে বসে আমরা দুজন ভিজছিলাম। সে হঠাৎ বলল,দোস্ত, ওকে ছাড়া আমার কিছু ভালো লাগে না।আমি হেসে বলেছিলাম,তাহলে গিয়ে বল।পারি না।তাহলে?তুই সাহায্য কর।বন্ধুর অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে পারিনি।তারপর শুরু হলো আমার দৌড়ঝাঁপ।কখনো রাইমাকে নিয়ে যেতাম শহরের পুরোনো লাইব্রেরিতে।অর্ণব সেখানে মোটা বই খুলে বসে থাকত। আমি কোনো অজুহাতে বাইরে চলে যেতাম।ফিরে এসে দেখতাম দুজনেই চুপচাপ।একজন বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, আরেকজন জানালার বাইরে।মনে হতো যেন কথা বলার বদলে নীরবতাকেই তারা ব্যবহার করছে।কখনো আমরা নদীর ধারের পুরোনো রেলসেতুতে বসতাম।তিনজনে পাশাপাশি।নিচে স্রোত বয়ে যেত।আমি প্রাণপণে আলাপ জমাতে চাইতাম।অর্ণব মাঝে মাঝে রাইমার দিকে তাকাত।রাইমা নদীর পানির দিকে।আর আমি ভাবতাম, এভাবে প্রেম হয় নাকি?একদিন অর্ণব হঠাৎ বলল,ওকে কিছু বলতে পারি না।চিঠি লিখ।লিখতেও পারি না।আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,তাহলে আমি লিখে দিচ্ছি।সে যেন নতুন জীবন পেল।সত্যি?হ্যাঁ।সেই রাতেই আমি চিঠি লিখলাম।প্রথমে অর্ণবের হয়ে লিখতে বসেছিলাম।কিন্তু লিখতে লিখতে কখন যে শব্দগুলো আমার নিজের হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি।আমি লিখলাম—তোমার হাসি দেখলে কেন যেন মনে হয় শহরের সব বৃষ্টি একসঙ্গে নেমেছে।আমি লিখলাম—তোমার সঙ্গে নদীর উৎস পর্যন্ত হাঁটতে ইচ্ছে করে।আমি লিখলাম—তোমাকে দেখলে বুকের ভেতরটা অদ্ভুত হয়ে যায়।চিঠি শেষ করে খেয়াল করলাম, কোথাও অর্ণব নেই।শুধু আমি আছি।আর রাইমা।দুদিন পর উত্তর এলো।খামের ভেতরে কয়েক পাতার চিঠি।শেষ লাইনে লেখা—নীল, তোমার হাতের লেখা আমি চিনি। অর্ণবের নাম কেন লিখেছ?সেই প্রশ্নের উত্তর আমি আর কখনো লিখিনি।বরং পরের চিঠি শুরু হয়েছিল অন্যভাবে।তারপর আরেকটা।আরেকটা।আরেকটা।চিঠির ভেতর দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে একে অপরের জীবনে ঢুকে গেলাম।রাইমা জানত আমি কী ভাবি।আমি জানতাম সে কখন হাসে, কখন কাঁদে, কখন জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখে।আমরা খুব কম দেখা করতাম।কিন্তু চিঠিগুলো আমাদের প্রতিদিন একসঙ্গে রাখত।একসময় মনে হতো, পৃথিবীতে আমাদের দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।অর্ণব বুঝতে পারেনি।অথবা বুঝেও কিছু বলেনি।আমি নিজেও জানতাম না কখন বন্ধুর দায়িত্ব শেষ হয়ে নিজের অনুভূতি শুরু হয়েছে।শুধু এটুকু জানতাম—রাইমার জন্য লেখা প্রতিটি শব্দ সত্যি ছিল।তারপর একদিন রাইমার বাবা অন্য শহরে বদলি হয়ে গেলেন।প্রথমে চিঠি চলল।তারপর কমে গেল।তারপর একসময় থেমে গেল।জীবন আমাদের আলাদা পথে নিয়ে গেল।অনেক বছর পরে ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে অর্ণবের সঙ্গে দেখা।চুলে পাক ধরেছে।চোখের কোণে বয়সের রেখা।কিন্তু হাসিটা একই আছে।সে আমাকে জড়িয়ে ধরল।দোস্ত, কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি?আমি হাসলাম।উত্তর দিলাম না।অনেকক্ষণ গল্প হলো।সংসার, চাকরি, সন্তান—সব নিয়ে।শুধু রাইমার কথা কেউ তুলল না।তবু আমি অনুভব করছিলাম, আমাদের মাঝখানে সে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।অদৃশ্য হয়ে।বিদায় নেওয়ার আগে অর্ণব বলল,একদিন বাসায় আসিস।আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলাম।কিন্তু ভেতরে ভেতরে জানতাম, হয়তো যাব না।কারণ এত বছর পরেও একটা প্রশ্ন আমাকে তাড়া করে।আমি কি বন্ধুর প্রেম চুরি করেছিলাম?নাকি প্রেম এমনই—যেখানে কোনো চোর থাকে না, থাকে শুধু দুটো মানুষের অনিবার্যভাবে একে অপরের দিকে চলে যাওয়া?আজও উত্তরটা জানি না।শুধু জানি, সেই চিঠিগুলো অর্ণবের নামে লেখা হলেও—প্রতিটি শব্দ ছিল আমার।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো