প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
নীলার অপেক্ষা।
নাহিদ হোসেন ||
দ্বিতীয় পর্ব—সেদিন বিকেলটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর।আকাশে হালকা মেঘ ছিল, বাতাসে কাশফুলের গন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের লেকের ধারে বসে ছিল রায়হান। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে ছিল।আজ সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।আজ আর নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখবে না।তিন বছর ধরে যে কথাটা বলতে পারেনি, আজ সে বলবেই।মায়া একটু পরে এসে পাশে বসল।হাতে একটা বই।মুখে সেই পরিচিত শান্ত হাসি।রায়হান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর কাঁপা গলায় বলল,— মায়া, একটা কথা বলব?— বলো।— আমি তোমাকে ভালোবাসি।বাতাসটা যেন হঠাৎ থেমে গেল।মায়ার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।সে অনেকক্ষণ কিছু বলল না।শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।রায়হানের বুকের ভেতর ধকধক করছিল।তার মনে হচ্ছিল, এই কয়েক সেকেন্ডই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়।অবশেষে মায়া মাথা তুলল।তার চোখ দুটো ভেজা।— রায়হান... আমি জানতাম।— তাহলে?মায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।— কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি না।মুহূর্তেই পৃথিবীটা থেমে গেল।রায়হান কিছু শুনতে পাচ্ছিল না।চারপাশে মানুষ হাঁটছে।বাতাস বইছে।লেকের পানিতে ঢেউ উঠছে।কিন্তু তার কাছে সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল।মায়া ধীরে ধীরে বলল,— তুমি আমার খুব প্রিয় বন্ধু। কিন্তু আমার জীবনে অন্য একজন আছে।রায়হান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।— অন্য কেউ?— হ্যাঁ। অনেক আগে থেকেই।সেদিন প্রথমবার রায়হান বুঝল, ভালোবাসা মানেই পাওয়া নয়।কখনো কখনো ভালোবাসা মানে শুধু হারিয়ে ফেলা।সেই রাতেই সে অনেক কেঁদেছিল।ফোন বন্ধ করে রেখেছিল।কারো সাথে কথা বলেনি।কিন্তু একজন মানুষ সারারাত জেগে ছিল।নীলা।সে বারবার রায়হানকে ফোন করেছিল।মেসেজ করেছিল।কোনো উত্তর পায়নি।অবশেষে ভোর চারটায় শুধু একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল।যত কষ্টই হোক, নিজেকে হারিয়ে ফেলিস না।সকালে ঘুম থেকে উঠে মেসেজটা দেখে রায়হানের চোখ ভিজে উঠেছিল।পরের কয়েক মাস রায়হান বদলে গেল।আগের মতো হাসত না।বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত না।নিজের মধ্যেই ডুবে থাকত।আর নীলা?সে আগের মতোই পাশে ছিল।প্রতিদিন।নীরবে।রায়হানের জন্মদিনে প্রথম শুভেচ্ছা।পরীক্ষার আগে প্রথম ফোন।অসুস্থ হলে প্রথম খোঁজ।সব জায়গায় নীলা।কিন্তু রায়হান তখনও বুঝতে পারেনি।কারণ মানুষ যখন কাউকে ভুলতে পারে না, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখতে পায় না।একদিন হঠাৎ নীলা বলল,— রায়হান, যদি কেউ তোকে খুব ভালোবাসে, তুই কি সেটা বুঝতে পারবি?রায়হান হেসে বলল,— ভালোবাসা লুকিয়ে রাখা যায় নাকি?নীলা মৃদু হাসল।কিন্তু কিছু বলল না।কারণ সে জানত—সবচেয়ে গভীর ভালোবাসাগুলোই সবচেয়ে বেশি লুকিয়ে থাকে।সময়ের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে গেল।সবাই নিজের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।ঠিক তখনই আরেকটা খবর এলো।মায়া বিদেশে চলে যাচ্ছে।স্কলারশিপ পেয়েছে।চলে যাবে কয়েক বছরের জন্য।সেদিন বিদায়ের সময় রায়হান শুধু একটা কথাই বলেছিল।— ভালো থেকো।মায়াও হেসে বলেছিল,— তুমিও।এরপর মায়া চলে গেল।আর ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমতে কমতে একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।রায়হান ভেবেছিল, মায়াকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না।কিন্তু মানুষ সবকিছু নিয়েই বেঁচে থাকে।ভাঙা হৃদয় নিয়েও।অসমাপ্ত গল্প নিয়েও।শুধু কিছু শূন্যতা থেকে যায়।যেগুলো কোনোদিন পূরণ হয় না।একদিন সন্ধ্যায় নীলা হঠাৎ বলল,— চল, আজকে কফি খেতে যাই।দুজন বসেছিল পুরনো এক ক্যাফেতে।অনেকক্ষণ গল্প হলো।হাসি হলো।স্মৃতিচারণ হলো।হঠাৎ নীলা চুপ হয়ে গেল।তারপর ধীরে ধীরে বলল,— রায়হান, যদি কোনোদিন আমি আর তোর পাশে না থাকি, তখন কি আমাকে মনে পড়বে?রায়হান হেসে বলল,— তুই কোথায় যাবি?নীলা উত্তর দিল না।শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।তার চোখে তখন এমন এক বিষণ্ণতা ছিল, যা রায়হান কোনোদিন পড়তে পারেনি।কয়েক সপ্তাহ পর খবরটা এলো।নীলার বিয়ে ঠিক হয়েছে।একজন প্রবাসী ইঞ্জিনিয়ারের সাথে।ছেলেটা কানাডায় থাকে।সবাই খুব খুশি।শুধু একজন ছাড়া।নীলা।আর অদ্ভুতভাবে, রায়হানও।খবরটা শোনার পর তার বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা অনুভব হয়েছিল।কারণটা সে বুঝতে পারেনি।অথবা বুঝেও স্বীকার করতে চায়নি।বিয়ের আগের রাতে নীলা তাকে একটা চিঠি দিয়েছিল।বলেছিল,— আমি চলে যাওয়ার পর পড়িস।রায়হান চিঠিটা ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিল।খোলেনি।ভাবছিল পরে পড়বে।সময় আছে।অনেক সময়।কিন্তু মানুষ জানে না, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলো সে পরে করার জন্যই জমিয়ে রাখে।আর সেই চিঠির ভেতরে লেখা ছিল এমন কিছু কথা, যা রায়হানের পুরো জীবন বদলে দিতে পারত...চলবে...
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো