প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬
নীলার অপেক্ষা।
নাহিদ হোসেন ||
শেষ পর্ব—সেদিন রাতটা রায়হানের জীবনের সবচেয়ে অস্থির রাতগুলোর একটি ছিল।ফেসবুকের সেই পোস্টটার পর তার আর কিছুতেই মন বসছিল না।বারবার নীলার প্রোফাইল ঘুরে দেখছিল।কিন্তু কোথাও স্পষ্ট করে কিছু লেখা নেই।শুধু কয়েকটা ছবি।কিছু অস্পষ্ট স্ট্যাটাস।আর মানুষের সমবেদনা।হঠাৎ সে নীলার এক পরিচিত বন্ধুকে মেসেজ করল।প্রায় আধা ঘণ্টা পর উত্তর এলো।আর সেই উত্তর পড়েই তার হাত কাঁপতে শুরু করল।নীলার স্বামী ছয় মাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।এরপর থেকে নীলা একাই আছে।একটা ছোট মেয়ে নিয়ে।কাউকে কিছু জানায়নি।কারো কাছে নিজের কষ্ট প্রকাশ করেনি।নিঃশব্দে সব সহ্য করেছে।মেসেজটা পড়ার পর রায়হান দীর্ঘক্ষণ বসে রইল।তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা কত অদ্ভুত!যে মেয়েটা একসময় তার কষ্টের সময় পাশে ছিল, সেই মেয়েটার সবচেয়ে কঠিন সময়ে সে কোথাও ছিল না।সেই রাতেই রায়হান নীলাকে মেসেজ পাঠাল।কেমন আছো?মেসেজ সিন হলো না।একদিন গেল।দুই দিন গেল।তিন দিন পর উত্তর এলো।মাত্র দুটো শব্দ।ভালো আছি।রায়হানের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।সে জানত, এই দুটো শব্দের আড়ালে অনেক না-বলা কান্না লুকিয়ে আছে।এরপর ধীরে ধীরে আবার কথা শুরু হলো।প্রথমে খুব কম।তারপর একটু বেশি।তারপর প্রায় প্রতিদিন।সাত বছর আগের বন্ধুত্বটা যেন আবার ফিরে এলো।তবে এবার দুজনেই অনেক বদলে গেছে।আগের মতো উচ্ছ্বল নয়।আগের মতো স্বপ্নবাজ নয়।জীবন তাদের দুজনকেই অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে।একদিন ভিডিও কলে নীলার মেয়েকে দেখল রায়হান।ছোট্ট মেয়েটা মিষ্টি করে হেসে বলল—— আঙ্কেল, আপনি বাংলাদেশে থাকেন?রায়হান হেসে বলল—— হ্যাঁ।— মা আপনাকে অনেকদিন ধরে চেনে?নীলা লজ্জা পেয়ে মেয়েটাকে সরিয়ে নিল।কিন্তু রায়হান লক্ষ্য করল—অনেকদিন পর নীলাকে হাসতে দেখাচ্ছে।সত্যিকারের হাসি।কথা বাড়তে লাগল।সময় বাড়তে লাগল।আর রায়হানের মনে একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরতে লাগল।সে কি খুব দেরি করে ফেলেছে?এক বর্ষার রাতে সাহস করে সে বলল—— নীলা...— হুম?— তুই কি এখন আমাকে ঘৃণা করিস?নীলা মৃদু হেসে বলল—— ভালোবাসার মানুষকে কেউ ঘৃণা করতে পারে?রায়হান চুপ হয়ে গেল।কারণ এই কথার উত্তর তার কাছে ছিল না।কয়েক মাস পর অফিসের কাজে কানাডা যাওয়ার সুযোগ পেল সে।যাওয়ার আগে কাউকে কিছু বলেনি।এমনকি নীলাকেও না।সে শুধু একটা ঠিকানা সংগ্রহ করেছিল।আর বুকভরা অজস্র না-বলা কথা।কানাডার সেই শীতের সকালে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রায়হান।হাত কাঁপছিল।হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছিল।তার মনে হচ্ছিল, যেন আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই প্রথম দিনে ফিরে গেছে।কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলল।আর ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখে সে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।নীলা।চোখের কোণে বয়সের ছাপ পড়েছে।চুলে হালকা পরিবর্তন এসেছে।কিন্তু সেই হাসিটা...সেই মায়াটা...একটুও বদলায়নি।নীলা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।— রায়হান?— হ্যাঁ।— তুই এখানে?— তোকে দেখতে এসেছি।এই কথাটা শোনার পর নীলার চোখ ভিজে উঠল।অনেক বছর পর কেউ তার জন্য এতটা পথ পাড়ি দিয়েছে।সেদিন তারা অনেকক্ষণ কথা বলেছিল।পুরোনো দিনের কথা।বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা।হারিয়ে যাওয়া সময়ের কথা।আর সেই চিঠির কথা।রাত গভীর হলে রায়হান ধীরে ধীরে বলল—— নীলা, আমি একটা ভুল করেছি।— কী ভুল?— যে মানুষটা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত, তাকে চিনতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে।নীলা কিছু বলল না।শুধু চুপ করে শুনছিল।— আমি মায়াকে ভালোবেসেছিলাম।— জানি।— কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা অনেক পরে বুঝেছি।— কী সত্যি?রায়হানের গলা কেঁপে উঠল।— যে মানুষটাকে আমি খুঁজছিলাম, সে সবসময় আমার পাশেই ছিল।নীলার চোখ দিয়ে টলমল করে জল গড়িয়ে পড়ল।অনেকক্ষণ নীরবতার পর সে ধীরে ধীরে বলল—— রায়হান...— হুম?— কিছু ভালোবাসা ঠিক সময়ে আসে না।— মানে?— তুই যদি এই কথাগুলো সাত বছর আগে বলতি, হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতো।রায়হান মাথা নিচু করল।কারণ সে জানত, কথাটা সত্যি।জানালার বাইরে তখন তুষার পড়ছিল।সাদা, নীরব, বিষণ্ণ।নীলা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল—— জীবন আমাদের দুজনকেই অনেক দেরিতে শিখিয়েছে।— তবুও কি আর কোনো সুযোগ নেই?নীলা উত্তর দিল না।শুধু দূরে খেলতে থাকা নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।কিছু প্রশ্নের উত্তর শব্দে দেওয়া যায় না।কিছু উত্তর শুধু নীরবতায় লুকিয়ে থাকে।আর সেই নীরবতার মাঝেই দুজন মানুষ বুঝতে পারল—তারা একে অপরকে ভালোবেসেছিল।কিন্তু একই সময়ে নয়।একজন যখন ভালোবেসেছিল, অন্যজন তখন অন্য কাউকে খুঁজছিল।আর যখন দ্বিতীয়জন ভালোবাসতে শিখল, তখন প্রথমজনের জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে।সেদিন বিদায়ের সময় বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে রায়হান শেষবারের মতো নীলার দিকে তাকাল।তার মনে হচ্ছিল—ভালোবাসার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি না-পাওয়া নয়।সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—ঠিক মানুষটাকে ভুল সময়ে ভালোবাসা।বিমানটা আকাশে উড়তে শুরু করল।আর জানালার পাশে বসে রায়হান চোখ বন্ধ করল।তার কানে তখনও নীলার শেষ কথাটা বাজছিল—আমি তোকে সবসময় ভালোবেসেছিলাম, রায়হান। শুধু ভাগ্যটা আমাদের পক্ষে ছিল না...আর সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল—কিছু মানুষ জীবনে আসে থেকে যাওয়ার জন্য নয়।ভালোবাসা শেখানোর জন্য।ভালোবাসা হয়ে ওঠার জন্য।আর আজীবন হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর ব্যথা হয়ে বেঁচে থাকার জন্য।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো