প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬
নীল খামের রহস্য
নাহিদ হোসেন ||
পর্ব ২ : পুরনো রেলস্টেশনের মানুষশুক্রবার সন্ধ্যা।আকাশে মেঘ নেই, তবু নীলার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা।বিকেল থেকেই সে বারবার ঘড়ি দেখছে।চিঠিতে স্পষ্ট লেখা ছিল—সন্ধ্যা সাতটায় পুরনো রেলস্টেশনে এসো।মাকে বলেছে বান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছে।মিথ্যা বলতে তার খারাপ লাগছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে অন্য কোনো উপায়ও ছিল না।সন্ধ্যা ছয়টা পঞ্চাশ।নীলা নীলগঞ্জ রেলস্টেশনের সামনে এসে দাঁড়াল।স্টেশনটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে।প্ল্যাটফর্মের ইটগুলো ভেঙে পড়েছে।রেললাইনের ফাঁকে ফাঁকে আগাছা জন্মেছে।চারদিকে এক ধরনের নিস্তব্ধতা।মনে হয় যেন সময় এখানে থেমে আছে।নীলা চারপাশে তাকাল।কেউ নেই।তার বুক ধকধক করতে লাগল।হঠাৎ পিছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো।— তুমি এসেছো।নীলা চমকে ঘুরে দাঁড়াল।প্রায় ত্রিশ বছরের এক যুবক।সাদা শার্ট।গাঢ় নীল জিন্স।মুখে হালকা দাড়ি।চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত।— আপনি কে?লোকটি মৃদু হাসল।— আমার নাম আরিয়ান।— আপনিই কি চিঠি পাঠিয়েছেন?— না।— তাহলে আমাকে এখানে কে ডেকেছে?আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর বলল,— যে মানুষটা তোমাকে সত্যিটা জানাতে চায়, সে এখন সামনে আসতে পারবে না।— কেন?— কারণ তার জীবন বিপদে পড়বে।নীলার বিরক্ত লাগল।— দেখুন, ধাঁধা পছন্দ করি না। আপনি যদি কিছু জানেন, তাহলে সরাসরি বলুন।আরিয়ান গভীরভাবে তার দিকে তাকাল।— তোমার বাবা মারা যাননি।নীলার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো পৃথিবী থেমে গেছে।— কী বললেন?— সত্যি বলছি।— প্রমাণ?আরিয়ান পকেট থেকে একটি পুরনো ডায়েরি বের করল।কালচে রঙের মলাট।কোণাগুলো ছেঁড়া।— এটা তোমার বাবার।নীলা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।ডায়েরির ভেতরের প্রথম পাতায় লেখা—মোঃ সাইফুর রহমানএটা তার বাবার নাম।নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।— এটা আপনার কাছে এলো কীভাবে?— সেই গল্পটা অনেক বড়।— আমি শুনতে চাই।আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।— তোমার পরিবার যেটা জানে, সেটা পুরো সত্য নয়।— তাহলে সত্যটা কী?— সত্যটা শুরু হয়েছিল তোমার দাদার মৃত্যুর আগের রাতে।— দাদা?— হ্যাঁ।— কিন্তু এর সঙ্গে বাবার সম্পর্ক কী?— সব সম্পর্ক আছে।আরিয়ান নিচু স্বরে বলল,— তোমার দাদার রেখে যাওয়া সম্পত্তির আসল উত্তরাধিকারী কে, সেটা নিয়ে তখন বড় একটা ঝামেলা শুরু হয়েছিল।নীলা বিস্মিত।তাদের পরিবারে তো কখনো এসব কথা শুনেনি।আরিয়ান বলল,— তোমার দাদা একটা উইল লিখেছিলেন।— তারপর?— সেই উইল হঠাৎ হারিয়ে যায়।— হারিয়ে যায়?— না... হারিয়ে ফেলা হয়।নীলা কিছু বলার আগেই আরিয়ান ব্যাগ থেকে একটি পুরনো ছবি বের করল।ছবিতে তার বাবা।আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন বৃদ্ধ।নীলা ছবিটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেল।বৃদ্ধ মানুষটিকে সে চেনে।খুব ভালো করে চেনে।কারণ মানুষটি তার নিজের চাচা।চাচা করিম।যিনি সবসময় বলতেন,তোমার বাবার মতো সৎ মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।নীলা কাঁপা গলায় বলল,— চাচা এখানে কেন?আরিয়ান ধীরে ধীরে উত্তর দিল,— কারণ তোমার বাবার হারিয়ে যাওয়ার রাতের শেষ মানুষ ছিলেন তিনি।হঠাৎ দূরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।টক...টক...টক...আরিয়ান সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।তার মুখের রঙ বদলে গেল।— আমাদের এখনই যেতে হবে।— কেন?— কেউ আমাদের অনুসরণ করছে।— কে?আরিয়ান উত্তর দিল না।সে শুধু নীলার হাত ধরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।ঠিক তখনই স্টেশনের অন্ধকার কোণ থেকে একটি মানুষ বেরিয়ে এলো।মানুষটির মুখ দেখা যাচ্ছিল না।কিন্তু তার হাতে থাকা টর্চের আলো এক মুহূর্তের জন্য মুখে পড়তেই নীলার বুক কেঁপে উঠল।কারণ লোকটাকে সে চিনে ফেলেছে।এবং সে মানুষটাকে এখানে দেখার কথা নয়।লোকটি তাদের বাড়িরই একজন।চলবে...
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো