প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
হারিয়ে যাচ্ছে শিকড়: গ্রামবাংলার নৈতিকতার পাঠশালা কাচারি ঘর কি তবে শুধুই অতীত?
নাহিদ হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধি ||
আধুনিক নগরায়ণ আর প্রযুক্তির জোয়ারে আমরা প্রতিনিয়ত কত কিছুই না হারাচ্ছি। তবে কিছু কিছু হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি বস্তু বা স্থাপনার বিদায় নয়, বরং তা একটি পুরো প্রজন্মের চেনা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর সামাজিক মূল্যবোধের অপমৃত্যু। তেমনি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর সামাজিক জীবনের একসময়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল কাচারি ঘর। সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল পরিবারগুলোর বাড়ির আঙিনায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘরটি কেবল কাঠে-বাঁশে ঘেরা কোনো স্থাপনা ছিল না; এটি ছিল শিক্ষা, আড্ডা, সামাজিক মেলবন্ধন ও মানবিক সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রাণকেন্দ্র।আজকের শহুরে জীবনের ড্রয়িংরুম যেমন কেবলই অতিথি আপ্যায়নের এক যান্ত্রিক বা কৃত্রিম জায়গা, অতীতের গ্রামের কাচারি ঘর ছিল তার চেয়ে বহুগুণ বিস্তৃত। এটি ছিল মূলত গ্রামীণ সমাজের নৈতিক শিক্ষার এক অনানুষ্ঠানিক অবারিত পাঠশালা।এই কাচারি ঘরগুলোতেই একসময় আশ্রয় হতো দূর-দূরান্ত থেকে আসা লজিং শিক্ষক কিংবা গৃহশিক্ষকদের। ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই মুখরিত হয়ে উঠত এই ঘর। নামাজ শেষে শুরু হতো শিশুদের কোরআন তিলাওয়াত, নামাজ শিক্ষা, শিষ্টাচার ও নৈতিকতার পাঠদান। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষকেরা এখানে শিশুদের জীবনবোধের পাঠ দিতেন। আর এই শিক্ষার বিনিময়ে শিক্ষকেরা পেতেন নিখাদ পারিবারিক আন্তরিকতা ও সামাজিক বন্ধন। একসময় গ্রামের মানুষ চাল বা খাদ্যসামগ্রী দিয়ে লজিং শিক্ষকদের পরম শ্রদ্ধায় পুরস্কৃত করতেন, যা পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আর্থিক সম্মানী রূপ নেয়।কাচারি ঘরকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ সমাজে চমৎকার একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠত। সাধারণত এই ঘরের আশপাশেই থাকত একটি ছোট সামাজিক পরিসর— যার মধ্যে একটি ছোট মসজিদ, পুকুরঘাট, উন্মুক্ত খেলার মাঠ ও সুপেয় পানির উৎস। বিকালের আড্ডা থেকে শুরু করে গ্রামের বিচার-সালিশ, কিংবা মেহমানদের আবাসন— সবকিছুর মুশকিল আসান ছিল এই কাচারি ঘর।সময়ের নিষ্ঠুর পরিবর্তনে, আধুনিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিক জীবনের চাপে সেই কাচারি ঘর আজ গ্রামবাংলা থেকে প্রায় বিলুপ্ত। আজকের নতুন প্রজন্মের অনেক শিশু-কিশোর হয়তো এই ঐতিহ্যের নামটুকুও জানে না।আজকের আধুনিক যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক এগিয়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু ঠিক উল্টো পিঠে আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা ও মানবিকতার ভিত। চারপাশের অস্থিরতা দেখে আজ বারবার প্রশ্ন উঠছে— আমরা কি তবে আধুনিক হতে গিয়ে নিজেদের আসল শিকড়টাই হারিয়ে ফেলছি?আজকের এই নৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সম্ভবত নতুনভাবে কাচারি ঘরের ধারণাকে সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। গ্রাম কিংবা শহরের প্রতিটি পাড়ায় এমন ছোট ছোট অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র যদি আবার গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিশুদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নিখাদ নৈতিক আর মানবিক শিক্ষা দেওয়া হবে, তবেই হয়তো নতুন প্রজন্মকে আধুনিকতার পাশাপাশি তাদের আসল শিকড়ের সঙ্গে আবারও যুক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো