প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মার্চ ২০২৬
৫ টাকার নোটের সেই মসজিদ: স্বচক্ষে দেখুন নওগাঁর ঐতিহাসিক কুসুম্বা।
নাহিদ হোসেন , বিশেষ প্রতিনিধি ||
শৈশবে ৫ টাকার নোটের ওপর যে কালো ব্যাসল্ট পাথরের জটিল নকশা দেখে আমরা বড় হয়েছি, সেই শৈল্পিক স্মৃতিই এখন অনেকের কাছে জীবন্ত বাস্তবতা। নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অবস্থিত ৫শ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক কুসুম্বা মসজিদ, যা তার স্থাপত্যশৈলীর কারণে ‘বাংলার কালো রত্ন’ হিসেবে সমধিক পরিচিত।
শৈশবের স্মৃতি ও বাস্তবতার মিলন
১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে বাংলাদেশের ছোট মুদ্রা এবং পরবর্তীতে ২০১১ সালে ৫ টাকার নোটের বিপরীত পাশে কুসুম্বা মসজিদের এই স্থাপত্যের চিত্র শোভা পায়। সম্প্রতি এই মসজিদ প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, এর প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী আজও অম্লান। নওগাঁ শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পশ্চিমে মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার অবস্থান।
স্থাপত্যের এক অনন্য মাস্টারপিস
১৫৫৮-১৫৫৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে (৯৬৬ হিজরি) আফগান সুলতান গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহের রাজত্বকালে সুলেমান নামক এক প্রভাবশালী কর্মকর্তা এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের বিশেষত্ব হলো এর দেয়াল এবং কারুকাজ। ঝাড়খণ্ডের রাজমহল পাহাড় থেকে আনা কালো ব্যাসল্ট পাথর দিয়ে এর দেয়ালগুলো ভেতর ও বাইরে আবৃত।
ছয় গম্বুজবিশিষ্ট এই আয়তাকার কাঠামোটি সুলতানি আমলের স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এখানে ঐতিহ্যবাহী টেরাকোটার পরিবর্তে পাথরের ওপর সূক্ষ্ম ত্রাণ কর্ম বা খোদাই কাজকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পানির পাত্র, লতাগুল্ম এবং গোলাপের যে ত্রিমাত্রিক নকশা পাথরের গায়ে খোদাই করা আছে, তা পাঁচ শতাব্দী আগের কারিগরদের অসামান্য দক্ষতার সাক্ষ্য দেয়।
‘বাদশা-কা-তখত’ ও মসজিদের অভ্যন্তর
মসজিদের ভেতরে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি উঁচু মঞ্চ রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘বাদশা-কা-তখত’ বা রাজার গ্যালারি। ঐতিহাসিকদের মতে, এক সময় কাজীরা (বিচারক) এখান থেকে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবটিতে অত্যন্ত কারুকার্যপূর্ণ ঝুলন্ত শিকল ও পাতার নকশা রয়েছে, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
দিঘি ও গ্রামীণ কিংবদন্তি
মসজিদ সংলগ্ন একটি বিশাল দিঘি রয়েছে, যা মুসল্লিদের ওজু ও গ্রামবাসীর ব্যবহারের জন্য খনন করা হয়েছিল। গ্রামের নামকরণ নিয়ে প্রচলিত আছে এক চমৎকার লোকগাথা। বলা হয়, গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের স্ত্রী কুসুম বিবি এই এলাকায় কিছুকাল বসবাস করেছিলেন এবং তার নামানুসারেই এই গ্রামের নাম হয় ‘কুসুম্বা’।
বর্তমান অবস্থা ও পর্যটন
বর্তমানে এই মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। যদিও মসজিদের ভেতরে প্রায় ৮০ জনের মতো মুসল্লির স্থান সংকুলান হয়, তবে জুমার নামাজে প্রাঙ্গণসহ প্রায় ৭০০ জন মুসল্লি এখানে সমবেত হন। বিশেষ করে বৈশাখী মেলা বা ছুটির দিনগুলোতে এখানে শত শত পর্যটকের ভিড় নামে।
যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে শীতল ও শান্ত পরিবেশে ইতিহাসের ঘ্রাণ নিতে ‘বাংলার কালো রত্ন’ কুসুম্বা মসজিদ হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের গন্তব্য।
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো