প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুন ২০২৬
নীল খামের রহস্য
নাহিদ হোসেন ||
পর্ব ৭ : জীবিত মানুষটির ছায়াচাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল নীলা।তার বুকের ভেতর যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত সে বিশ্বাস করত, তার বাবা হয়তো মারা গেছেন।এখন একজন অচেনা মানুষ এসে বলছে—তোমার বাবা এখনও বেঁচে আছেন।নীলা কাঁপা গলায় বলল,— আপনি কে?লোকটি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।মুখভর্তি দাড়ি।চোখ দুটো ক্লান্ত।তবু তার চোখের ভেতরে এমন কিছু ছিল, যা মিথ্যা মনে হয় না।— আমার নাম জাহিদ।— আপনি আমার বাবাকে চেনেন?— শুধু চিনি না।লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।— শেষবার আমি তাকে দেখেছিলাম।চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।আরিয়ানও চুপ করে আছে।জাহিদ নিচু স্বরে বললেন,— সাত বছর আগে তোমার বাবার ওপর হামলা হয়েছিল।— হামলা?— হ্যাঁ।— কে করেছিল?জাহিদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,— যারা সম্পত্তি আর কিছু গোপন নথির জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল।— করিম চাচা?— তিনি একা ছিলেন না।নীলা অনুভব করল, প্রতিটি উত্তর যেন নতুন দশটি প্রশ্ন তৈরি করছে।জাহিদ বললেন,— তোমার বাবা আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।— তারপর?— তিনি বুঝতে পারেন, হাসপাতালেও তিনি নিরাপদ নন।— কেন?— কারণ যারা তাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল, তারা জানত তিনি বেঁচে আছেন।আরিয়ান হঠাৎ বলল,— তাহলে তিনি কোথায় গেলেন?জাহিদ উত্তর দিলেন না।বরং নীলার দিকে তাকালেন।— তোমার মা কি কিছু বলেননি?— মা?— হ্যাঁ।— মা কী জানেন?জাহিদ ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।— তোমার মায়ের চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না।নীলার মাথা ঘুরে উঠল।মা?তাহলে মা এতদিন সব জানতেন?ঠিক তখনই দূরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।জাহিদের মুখের রঙ বদলে গেল।— তারা চলে এসেছে।— কারা?— যাদের থেকে তোমার বাবাকে সাত বছর ধরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।কিছু বুঝে ওঠার আগেই কুয়োর পাশের উঠোনে কয়েকজন লোক ঢুকে পড়ল।সবার সামনে করিম চাচা।তার পাশে কাদের।আর তাদের পেছনে—রওশন আরা বেগম।নীলার মা।করিম চাচা শান্ত গলায় বললেন,— অনেক খোঁজাখুঁজি করছো দেখছি।কেউ উত্তর দিল না।তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।— বাক্সটা আমাকে দাও।আরিয়ান শক্ত গলায় বলল,— যদি না দিই?করিম চাচা হালকা হাসলেন।— তাহলে অনেকের ক্ষতি হবে।ঠিক তখনই নীলা প্রথমবার মায়ের দিকে তাকাল।মা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন।চোখে পানি।তিনি একবারও নীলার দিকে তাকাচ্ছেন না।হঠাৎ রওশন আরা বেগম সামনে এগিয়ে এলেন।তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।— আর লুকিয়ে লাভ নেই।তিনি ধীরে ধীরে নীলার দিকে তাকালেন।চোখ ভেজা।কণ্ঠ কাঁপছে।— তোর বাবাকে আমি নিজেই লুকিয়ে রেখেছিলাম।নীলার মনে হলো পৃথিবী থেমে গেছে।— মা... তুমি?— হ্যাঁ।— কেন?রওশন আরা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,— কারণ সেদিন যদি আমি ওকে না লুকাতাম...— তাহলে?— তাহলে ওকে মেরে ফেলা হতো।নীরবতা।শুধু রাতের বাতাসের শব্দ।করিম চাচা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন,— রওশন!কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।সাত বছরের গোপন সত্য প্রথমবারের মতো প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।রওশন আরা বেগম বললেন,— তোর বাবা বেঁচে আছে নীলা।— কোথায়?— আমি জানি।— আমাকে নিয়ে চলো।মা চোখ বন্ধ করলেন।তারপর ধীরে ধীরে বললেন—— কাল সকালে।— কেন এখন না?— কারণ আজ রাতটা হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক রাত।ঠিক তখনই করিম চাচা পকেট থেকে একটি পুরনো ছবি বের করলেন।ছবিটা দেখে জাহিদ হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।আরিয়ানও স্তব্ধ।ছবিতে একজন বৃদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।যাকে নীলা আগে কখনো দেখেনি।কিন্তু ছবির পেছনে লেখা নামটা দেখে তার বুক কেঁপে উঠল।মালিক হোসেনতার দাদা।
আর ছবির নিচে লেখা—আসল উইল এখনো খুঁজে পাওনি তোমরা।চলবে...
প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো