মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

গল্প

মেঘডাকা বিকেলের প্রেম

মেঘডাকা বিকেলের প্রেম
ছবি : দৈনিক নতুন আলো

বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে নদীর জলে গিয়ে মিশছিল। সূর্যটা যেন বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখতে চাইছিল। নদীর পাড়ে পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে বসে ছিল আরিয়ান। হাতে একটা ডায়েরি, কিন্তু তাতে অনেকদিন ধরে কোনো শব্দ লেখা হয়নি। শুধু সাদা পাতাগুলো বাতাসে উল্টে যাচ্ছিল।

আরিয়ান বিশ্বাস করত, কিছু মানুষের জীবনে গল্প শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়।

বয়স মাত্র আটাশ। তবু তার চোখের নিচের ক্লান্তি বলে দিত, সে তার বয়সের চেয়ে অনেক বেশি জীবন দেখেছে।

গ্রামের মানুষ তাকে খুব ভালোবাসত।

আরিয়ান ভাই বললেই সবাই চিনে ফেলত।

কেউ জমির কাগজ বুঝতে না পারলে তার কাছে আসত, কারও ছেলে কলেজে ভর্তি হবে—আরিয়ানই ফরম পূরণ করে দিত। বৃদ্ধ রহিম চাচা বলতেন,

— এই ছেলেটা শহরে থাকলে অনেক বড় অফিসার হতো, কিন্তু গ্রামের জন্য নিজের জীবনটাই রেখে দিল।

আরিয়ান শুধু হাসত।

কিছু উত্তর হাসির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।


সেই গ্রামটার নাম ছিল চন্দ্রপুর।

ছোট্ট একটা নদী, দুই পাশে ধানের মাঠ, বিকেল হলে কাশফুলের মাথায় বাতাস নেচে বেড়ায়।

গ্রামে সবাই সবাইকে চেনে।

কারও সুখে পুরো গ্রাম হাসে, কারও দুঃখে পুরো গ্রাম কাঁদে।

ঠিক সেই সময়ই শহর থেকে একজন নতুন মানুষ এলো।

তার নাম—

মেহরিন।

চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।

খোলা চুল।

মুখে খুব কম কথা।

জেলা শহরের একটি কলেজে বাংলা সাহিত্যের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছে।

কিন্তু শহরে থাকার বদলে সে চন্দ্রপুর গ্রামের পুরোনো জমিদারবাড়ির একাংশ ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করল।

গ্রামের মানুষ অবাক।

শহরের মেয়ে গ্রামে থাকবে?

নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।

নাহলে কেউ এমন করে?

চায়ের দোকানে শুরু হলো আলোচনা।

চা-ওয়ালা করিম হেসে বলল,

— দেখেন, গল্প আছে। মানুষ এমনি এমনি গ্রামে আসে না।

সবাই হেসে উঠল।

শুধু আরিয়ান কোনো মন্তব্য করল না।


দুই দিন পর।

সকাল আটটা।

বাজারের রাস্তা।

মেহরিন এক হাতে বই, অন্য হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে হাঁটছে।

হঠাৎ সামনে একটা ছোট ছেলে সাইকেল নিয়ে পড়ে গেল।

বইগুলো ছিটকে রাস্তায়।

ছেলেটা ভয়ে কাঁদছে।

মেহরিন নিজে পড়ে গিয়েও প্রথমে ছেলেটাকে তুলে নিল।

ঠিক তখনই আরিয়ান এগিয়ে এলো।

— লাগেনি তো?

— না... আমি ঠিক আছি।

আরিয়ান বইগুলো তুলে দিল।

একটা বইয়ের ভেতর থেকে শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুল পড়ে গেল।

আরিয়ান সেটা তুলে দিল।

মেহরিন ফুলটা নিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— ধন্যবাদ।

এটাই ছিল তাদের প্রথম কথা।

মাত্র দুটি শব্দ।

কিন্তু কখনও কখনও সবচেয়ে বড় গল্পগুলো শুরু হয় খুব ছোট্ট একটি বাক্য দিয়ে।


পরের কয়েকদিন তারা প্রায়ই একে অপরকে দেখত।

কখনও নদীর পাড়ে।

কখনও বাজারে।

কখনও স্কুলের সামনে।

তারা কথা বলত না।

শুধু চোখাচোখি হতো।

অদ্ভুত এক নীরবতা।

যেন দু'জনই অপেক্ষা করছে, কে আগে কথা বলবে।


এক সন্ধ্যায়।

বৃষ্টি শুরু হলো।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

পুরো গ্রাম অন্ধকার।

মেহরিন বাজার থেকে ফিরছিল।

রাস্তার মাঝখানে হাঁটুসমান কাদা।

হঠাৎ পিছন থেকে একটা কণ্ঠ—

— এদিকে আসুন। এই পথটা শুকনো।

আরিয়ান।

হাতে টর্চ।

দু'জনে পাশাপাশি হাঁটছে।

কেউ কিছু বলছে না।

শুধু বৃষ্টির শব্দ।

হঠাৎ মেহরিন বলল,

— আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?

আরিয়ান হেসে বলল,

— সব কথা সবাইকে বলা যায় না।

— আর যেগুলো বলা যায়?

— সেগুলো বলার মতো মানুষ খুব কম পাওয়া যায়।

মেহরিন আর কিছু বলল না।

কিন্তু সেই রাতেই প্রথমবার সে আরিয়ানকে নিয়ে ভাবল।


এরপর থেকে গ্রামের মানুষ লক্ষ্য করল—

আরিয়ান প্রায়ই জমিদারবাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটে।

আর মেহরিন বিকেল হলেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে।

চায়ের দোকানে নতুন খবর।

করিম চা বানাতে বানাতে বলল,

— কাহিনি শুরু হয়েছে মনে হয়।

রহিম চাচা হেসে বললেন,

— ভালো মানুষ দুইটা যদি এক হয়, মন্দ কী?


একদিন গ্রামের স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সবাই এসেছে।

বাচ্চারা গান গাইছে।

নাটক করছে।

মেহরিন কবিতা আবৃত্তি করল।

তার কণ্ঠে জীবনানন্দের কবিতা শুনে পুরো মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

অনুষ্ঠান শেষে আরিয়ান বলল,

— আপনার কণ্ঠে কবিতা শুনলে মনে হয় শব্দগুলোও বেঁচে ওঠে।

মেহরিন একটু হেসে বলল,

— এটাই আজকের সবচেয়ে সুন্দর প্রশংসা।

প্রথমবার...

দু'জনের হাসি একই মুহূর্তে মিলল।


এরপর থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা নদীর পাড়ে দেখা করত।

কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না।

কোনো নাম ছিল না সেই সম্পর্কের।

তবু দু'জনেই অপেক্ষা করত।

একদিন না দেখা হলে মনে হতো দিনটাই অসম্পূর্ণ।


কিন্তু...

গ্রামে সবাই যেমন ভালোবাসতে জানে,

তেমনি অন্যের জীবন নিয়ে গল্প বানাতেও জানে।

একদিন দুপুরে মেহরিন বাড়ি ফিরতেই দেখল—

দুইজন মহিলা তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে।

শহরের মেয়েরা এমনই হয়।

প্রতিদিন ওই ছেলেটার সঙ্গে দেখা করে।

কথাগুলো খুব আস্তে বলা হলেও,

মেহরিন শুনে ফেলেছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় সে নদীর পাড়ে গেল না।

আরিয়ান অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল।

সূর্য ডুবে গেল।

জোনাকি জ্বলে উঠল।

তবু মেহরিন এলো না।


পরদিনও না।

তারও পরদিন না।

তিন দিন পর আরিয়ান সাহস করে জমিদারবাড়ির সামনে গেল।

দরজায় তালা।

পাশের বাড়ির বৃদ্ধা বললেন,

— মেয়েটা নাকি শহরে গেছে।

— কবে ফিরবে?

— জানি না বাবা।

সেদিন প্রথমবার আরিয়ানের মনে হলো—

অপেক্ষা শব্দটা আসলে খুব ভারী।


রাত।

প্রবল বৃষ্টি।

হঠাৎ আরিয়ানের ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ—

আরিয়ান...

মাত্র একটা শব্দ।

কিন্তু সেই কণ্ঠে এমন এক ভয়, এমন এক অসহায়তা ছিল, যা সে আগে কখনো শোনেনি।

আর তারপর...

ফোনের ওপাশে হঠাৎ একটা প্রচণ্ড শব্দ।

কারও চিৎকার।

লাইন কেটে গেল।

স্ক্রিনে শুধু লেখা রইল—

Call Ended.

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর আবার সেই নম্বরে ফোন করল।

The number you are trying to call is currently switched off.

বাইরে বজ্রপাত হলো।

ঘরের আলো নিভে গেল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে...

আরিয়ানের দরজার নিচ দিয়ে ভেতরে ঢুকে এলো একটা ভেজা খাম।

খামের ওপর কাঁপা হাতে লেখা—

যদি আমাকে সত্যিই খুঁজে পেতে চাও... তাহলে কাল সূর্য ওঠার আগেই পুরোনো রেলস্টেশনে এসো। একা এসো। কাউকে কিছু বলো না...

আরিয়ান খামটা শক্ত করে ধরে রইল।

কিন্তু সে জানত না—

পরদিন ভোরে যে সত্যের মুখোমুখি সে দাঁড়াতে যাচ্ছে, সেটি শুধু তার আর মেহরিনের জীবন নয়, পুরো চন্দ্রপুর গ্রামের ইতিহাসই বদলে দেবে...

চলবে...

বিষয় : গল্প

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


মেঘডাকা বিকেলের প্রেম

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুলাই ২০২৬

featured Image

বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে নদীর জলে গিয়ে মিশছিল। সূর্যটা যেন বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখতে চাইছিল। নদীর পাড়ে পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে বসে ছিল আরিয়ান। হাতে একটা ডায়েরি, কিন্তু তাতে অনেকদিন ধরে কোনো শব্দ লেখা হয়নি। শুধু সাদা পাতাগুলো বাতাসে উল্টে যাচ্ছিল।

আরিয়ান বিশ্বাস করত, কিছু মানুষের জীবনে গল্প শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়।

বয়স মাত্র আটাশ। তবু তার চোখের নিচের ক্লান্তি বলে দিত, সে তার বয়সের চেয়ে অনেক বেশি জীবন দেখেছে।

গ্রামের মানুষ তাকে খুব ভালোবাসত।

আরিয়ান ভাই বললেই সবাই চিনে ফেলত।

কেউ জমির কাগজ বুঝতে না পারলে তার কাছে আসত, কারও ছেলে কলেজে ভর্তি হবে—আরিয়ানই ফরম পূরণ করে দিত। বৃদ্ধ রহিম চাচা বলতেন,

— এই ছেলেটা শহরে থাকলে অনেক বড় অফিসার হতো, কিন্তু গ্রামের জন্য নিজের জীবনটাই রেখে দিল।

আরিয়ান শুধু হাসত।

কিছু উত্তর হাসির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।


সেই গ্রামটার নাম ছিল চন্দ্রপুর।

ছোট্ট একটা নদী, দুই পাশে ধানের মাঠ, বিকেল হলে কাশফুলের মাথায় বাতাস নেচে বেড়ায়।

গ্রামে সবাই সবাইকে চেনে।

কারও সুখে পুরো গ্রাম হাসে, কারও দুঃখে পুরো গ্রাম কাঁদে।

ঠিক সেই সময়ই শহর থেকে একজন নতুন মানুষ এলো।

তার নাম—

মেহরিন।

চোখে কালো ফ্রেমের চশমা।

খোলা চুল।

মুখে খুব কম কথা।

জেলা শহরের একটি কলেজে বাংলা সাহিত্যের প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছে।

কিন্তু শহরে থাকার বদলে সে চন্দ্রপুর গ্রামের পুরোনো জমিদারবাড়ির একাংশ ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করল।

গ্রামের মানুষ অবাক।

শহরের মেয়ে গ্রামে থাকবে?

নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।

নাহলে কেউ এমন করে?

চায়ের দোকানে শুরু হলো আলোচনা।

চা-ওয়ালা করিম হেসে বলল,

— দেখেন, গল্প আছে। মানুষ এমনি এমনি গ্রামে আসে না।

সবাই হেসে উঠল।

শুধু আরিয়ান কোনো মন্তব্য করল না।


দুই দিন পর।

সকাল আটটা।

বাজারের রাস্তা।

মেহরিন এক হাতে বই, অন্য হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে হাঁটছে।

হঠাৎ সামনে একটা ছোট ছেলে সাইকেল নিয়ে পড়ে গেল।

বইগুলো ছিটকে রাস্তায়।

ছেলেটা ভয়ে কাঁদছে।

মেহরিন নিজে পড়ে গিয়েও প্রথমে ছেলেটাকে তুলে নিল।

ঠিক তখনই আরিয়ান এগিয়ে এলো।

— লাগেনি তো?

— না... আমি ঠিক আছি।

আরিয়ান বইগুলো তুলে দিল।

একটা বইয়ের ভেতর থেকে শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুল পড়ে গেল।

আরিয়ান সেটা তুলে দিল।

মেহরিন ফুলটা নিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।

তারপর বলল,

— ধন্যবাদ।

এটাই ছিল তাদের প্রথম কথা।

মাত্র দুটি শব্দ।

কিন্তু কখনও কখনও সবচেয়ে বড় গল্পগুলো শুরু হয় খুব ছোট্ট একটি বাক্য দিয়ে।


পরের কয়েকদিন তারা প্রায়ই একে অপরকে দেখত।

কখনও নদীর পাড়ে।

কখনও বাজারে।

কখনও স্কুলের সামনে।

তারা কথা বলত না।

শুধু চোখাচোখি হতো।

অদ্ভুত এক নীরবতা।

যেন দু'জনই অপেক্ষা করছে, কে আগে কথা বলবে।


এক সন্ধ্যায়।

বৃষ্টি শুরু হলো।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।

পুরো গ্রাম অন্ধকার।

মেহরিন বাজার থেকে ফিরছিল।

রাস্তার মাঝখানে হাঁটুসমান কাদা।

হঠাৎ পিছন থেকে একটা কণ্ঠ—

— এদিকে আসুন। এই পথটা শুকনো।

আরিয়ান।

হাতে টর্চ।

দু'জনে পাশাপাশি হাঁটছে।

কেউ কিছু বলছে না।

শুধু বৃষ্টির শব্দ।

হঠাৎ মেহরিন বলল,

— আপনি সবসময় এত চুপচাপ থাকেন?

আরিয়ান হেসে বলল,

— সব কথা সবাইকে বলা যায় না।

— আর যেগুলো বলা যায়?

— সেগুলো বলার মতো মানুষ খুব কম পাওয়া যায়।

মেহরিন আর কিছু বলল না।

কিন্তু সেই রাতেই প্রথমবার সে আরিয়ানকে নিয়ে ভাবল।


এরপর থেকে গ্রামের মানুষ লক্ষ্য করল—

আরিয়ান প্রায়ই জমিদারবাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটে।

আর মেহরিন বিকেল হলেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে।

চায়ের দোকানে নতুন খবর।

করিম চা বানাতে বানাতে বলল,

— কাহিনি শুরু হয়েছে মনে হয়।

রহিম চাচা হেসে বললেন,

— ভালো মানুষ দুইটা যদি এক হয়, মন্দ কী?


একদিন গ্রামের স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সবাই এসেছে।

বাচ্চারা গান গাইছে।

নাটক করছে।

মেহরিন কবিতা আবৃত্তি করল।

তার কণ্ঠে জীবনানন্দের কবিতা শুনে পুরো মাঠ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

অনুষ্ঠান শেষে আরিয়ান বলল,

— আপনার কণ্ঠে কবিতা শুনলে মনে হয় শব্দগুলোও বেঁচে ওঠে।

মেহরিন একটু হেসে বলল,

— এটাই আজকের সবচেয়ে সুন্দর প্রশংসা।

প্রথমবার...

দু'জনের হাসি একই মুহূর্তে মিলল।


এরপর থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারা নদীর পাড়ে দেখা করত।

কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না।

কোনো নাম ছিল না সেই সম্পর্কের।

তবু দু'জনেই অপেক্ষা করত।

একদিন না দেখা হলে মনে হতো দিনটাই অসম্পূর্ণ।


কিন্তু...

গ্রামে সবাই যেমন ভালোবাসতে জানে,

তেমনি অন্যের জীবন নিয়ে গল্প বানাতেও জানে।

একদিন দুপুরে মেহরিন বাড়ি ফিরতেই দেখল—

দুইজন মহিলা তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করছে।

শহরের মেয়েরা এমনই হয়।

প্রতিদিন ওই ছেলেটার সঙ্গে দেখা করে।

কথাগুলো খুব আস্তে বলা হলেও,

মেহরিন শুনে ফেলেছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় সে নদীর পাড়ে গেল না।

আরিয়ান অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল।

সূর্য ডুবে গেল।

জোনাকি জ্বলে উঠল।

তবু মেহরিন এলো না।


পরদিনও না।

তারও পরদিন না।

তিন দিন পর আরিয়ান সাহস করে জমিদারবাড়ির সামনে গেল।

দরজায় তালা।

পাশের বাড়ির বৃদ্ধা বললেন,

— মেয়েটা নাকি শহরে গেছে।

— কবে ফিরবে?

— জানি না বাবা।

সেদিন প্রথমবার আরিয়ানের মনে হলো—

অপেক্ষা শব্দটা আসলে খুব ভারী।


রাত।

প্রবল বৃষ্টি।

হঠাৎ আরিয়ানের ফোন বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ—

আরিয়ান...

মাত্র একটা শব্দ।

কিন্তু সেই কণ্ঠে এমন এক ভয়, এমন এক অসহায়তা ছিল, যা সে আগে কখনো শোনেনি।

আর তারপর...

ফোনের ওপাশে হঠাৎ একটা প্রচণ্ড শব্দ।

কারও চিৎকার।

লাইন কেটে গেল।

স্ক্রিনে শুধু লেখা রইল—

Call Ended.

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর আবার সেই নম্বরে ফোন করল।

The number you are trying to call is currently switched off.

বাইরে বজ্রপাত হলো।

ঘরের আলো নিভে গেল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে...

আরিয়ানের দরজার নিচ দিয়ে ভেতরে ঢুকে এলো একটা ভেজা খাম।

খামের ওপর কাঁপা হাতে লেখা—

যদি আমাকে সত্যিই খুঁজে পেতে চাও... তাহলে কাল সূর্য ওঠার আগেই পুরোনো রেলস্টেশনে এসো। একা এসো। কাউকে কিছু বলো না...

আরিয়ান খামটা শক্ত করে ধরে রইল।

কিন্তু সে জানত না—

পরদিন ভোরে যে সত্যের মুখোমুখি সে দাঁড়াতে যাচ্ছে, সেটি শুধু তার আর মেহরিনের জীবন নয়, পুরো চন্দ্রপুর গ্রামের ইতিহাসই বদলে দেবে...

চলবে...


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো