মুকসুদপুর    সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
সর্বশেষ
মুকসুদপুরে আলিম পরীক্ষায় শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন শেখ আব্দুর রাজ্জাক আলিম মাদরাসার

শিক্ষা / মুকসুদপুরে আলিম পরীক্ষায় শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন শেখ আব্দুর রাজ্জাক আলিম মাদরাসার

  • photo-stories ফটো স্টোরি
নামাজের সময়সূচী
লোডিং হচ্ছে...

জাতীয়

মতামতমতামত

৮১ বছরে জাতিসংঘ: মানবতার প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম?

২৪ অক্টোবর “জাতিসংঘ দিবস”। ২০২৬ সালে গোটা বিশ্ব এ দিবসটি পালন করবে এমন এক সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধ বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত পদক্ষেপ অচল করে দিচ্ছে, মানবাধিকার সুরক্ষায় দেখা যাচ্ছে দ্বৈতনীতি এবং জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আর্থিক চাপও বাধাগ্রস্ত করছে টেকসই উন্নয়ন।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করা এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার ৮১ বছর পরও এই লক্ষ্য অপরিহার্য। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যবধান প্রশ্ন তুলছে: জাতিসংঘ কি তার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম?প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতার সংকট :বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ১৯৩টি। ভ্যাটিকান ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সদস্য না হলেও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদায় রয়েছে। ১৯৪৫ সালে ৫১টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটিতে বাংলাদেশ যোগ দেয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। সর্বশেষ সদস্যরাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান, যার সদস্যপদ লাভের তারিখ ২০১১ সালের ১৪ জুলাই।সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট থাকলেও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার প্রভাব সমান নয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় ক্ষমতার অসম বণ্টন স্পষ্ট। তাই প্রশ্নটি জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং সংস্থাটি কতটা কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা :জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বে যুদ্ধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে। অথচ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা প্রায়ই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। যখন সম্মিলিত দায়িত্বের চেয়ে জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেপরিবার হারায় ঘরবাড়ি, শিশুরা হারায় শিক্ষার সুযোগ এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ বন্ধ হওয়া নয়; এর অর্থ নিরাপদে ঘরে ফেরা, ভয়মুক্ত জীবনযাপন এবং মর্যাদার সঙ্গে নতুন করে জীবন গড়ে তোলা। সংঘাত প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে অনু-প্রতিনিধিত্বশীল অঞ্চলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ব্যাপক নৃশংসতার ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহারে সংযম প্রতিষ্ঠা জরুরি। এজন্য প্রয়োজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।বহুপাক্ষিকতায় আস্থা ফেরানো :জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অবক্ষয় বৈশ্বিক সহযোগিতাকে দুর্বল করছে। কিছু সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখে; অন্যরা মনে করে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে না। আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দৃশ্যমান ফলাফল। অন্যদের কাছে জবাবদিহি দাবি করা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই বিতর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর সংস্থা’ এবং এর কর্মকর্তাদের ‘অহংকারী পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করেন বলে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সংস্থাটি সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্কারের আহ্বান জানান এবং ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন বলে আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাইবার হুমকি প্রমাণ করে, স্বার্থের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য। দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতা জাতীয় স্বার্থকে অস্বীকার করে না; বরং তা সুরক্ষায় সহায়তা করে। এজন্য আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিৎ।মানবাধিকার হতে হবে সর্বজনীন :মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমতার অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো অসম। কোনো কোনো সরকার সমালোচনা এড়াতে সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ ও ডিজিটাল দমন-পীড়ন ব্যক্তি-স্বাধীনতার জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী নয়, সর্বক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারলেই জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার হতে পারে না। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক সংহতি :জাতিসংঘের ২০৩০ সালের এজেন্ডা ও ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় অভিন্ন কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অভিঘাত, ঋণসংকট, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন অগ্রগতিকে মন্থর করছে। পরিবেশগত সংকটে যাদের অবদান সবচেয়ে কম, অনেক ক্ষেত্রে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন এবং অসহনীয় ঋণের বোঝা কমানো জরুরি। উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব আর্থিক সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে।তবে শুধু বৈদেশিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। জাতীয় নেতৃত্ব, সুশাসন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের দায়িত্ব হলো অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং উন্নয়নের সুফল যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ :জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য - ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ - বর্তমান চ্যালেঞ্জের সারকথা তুলে ধরে। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান অগ্রগতিই আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, ফলাফলের জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনসেবা উন্নত করতে পারে, তবে এর ব্যবহার মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও সাংবাদিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যায্য বৈশ্বিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরে তা আদায় করতে হবে।মানবতার প্রতি নতুন অঙ্গীকার :জাতিসংঘ দিবস কেবল বার্ষিকী উদ্‌যাপনের দিন নয়; বরং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান পর্যালোচনার উপলক্ষ্য। জাতিসংঘ নিখুঁত প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করলে বৈশ্বিক সংকট দূর হবে না; বরং সেগুলো মোকাবিলা আরও কঠিন হবে।৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের প্রতি নতুন অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। এর সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের দুর্ভোগ কমছে কি না, মানবাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, উন্নয়নশীল দেশগুলো ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতে।জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ যথার্থই বলেছেন, ‘শান্তির পরিমাপ শুধু স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে আসা পরিবর্তনের মাধ্যমেও করতে হবে।’ বিশ্বের প্রয়োজন এমন এক জাতিসংঘ, যে শুধু কিছু মুষ্টিমেয়দের পক্ষে কাজ করবে না, বরং সবার জন্য কাজ করবে এবং বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করবে।মতামত লেখকের নিজস্ব।নিকোলাস বিশ্বাস একজন সৃজনশীল লেখক, কলামিস্ট, অনুবাদক এবং উন্নয়ন পেশাজীবী। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য, জননীতি ও সুশাসন বিষয়ক তার প্রবন্ধ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি “জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল” (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। উন্নয়ন খাতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাকে তিনি চিন্তাশীল, গবেষণাভিত্তিক ও প্রভাবসৃষ্টিকারী লেখালেখির প্রতি গভীর অনুরাগের সঙ্গে একীভূত করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা ভাষায় একাধিক বই ও নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে -আন্তর্জাতিক সম্পর্ক- বিষয়ে স্নাতোকত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন।

শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ: কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র?

একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো - একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই বা কার?সংখ্যা শুধু গল্পের একটি অংশ :সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯ শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮ শিশু তথনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না।সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এক ধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর।ইউনিসেফসহ (UNICEF) আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।নিখোঁজ শিশু কোনো সাধারণ নিখোঁজ ব্যক্তির মামলা নয় :শিশু নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সবসময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে।জিডি করাই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন।পরিবারের অসহায়ত্ব যেন একটি ফাইলে আটকে না থাকে :সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক।প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো - কেউ তাদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।শিশু ফিরে এলেই দায়িত্ব শেষ নয় :নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে?এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে।সুরক্ষা শুরু হোক পরিবার ও বিদ্যালয় থেকে :যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়।এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে - তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি (Child Safeguarding Policy) থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি।তথ্য-প্রযুক্তি ঝুঁকি তৈরি করে, আবার সহায়তাও করতে পারে :একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে।ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে।হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে :Child Helpline 1098 শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ - বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও।শিশু সুরক্ষা সবার দায়িত্ব :শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম - সবারই ভূমিকা রয়েছে।স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিরোধ :একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়।এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয় - সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে।শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে।শিশু নিরাপত্তা; শিশুর একটি অধিকার :শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয় - “শিশুটি কোথায়?” আরও জিজ্ঞেস করতে হবে - কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ - তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগ: gonomaddzam@gmail.com মতামত লেখকের নিজস্ব।নিকোলাস বিশ্বাস একজন সৃজনশীল লেখক, কলামিস্ট, অনুবাদক এবং উন্নয়ন পেশাজীবী। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য, জননীতি ও সুশাসন বিষয়ক তার প্রবন্ধ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি “জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল” (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। উন্নয়ন খাতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাকে তিনি চিন্তাশীল, গবেষণাভিত্তিক ও প্রভাবসৃষ্টিকারী লেখালেখির প্রতি গভীর অনুরাগের সঙ্গে একীভূত করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা ভাষায় একাধিক বই ও নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে -আন্তর্জাতিক সম্পর্ক- বিষয়ে স্নাতোকত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন।

মুকসুদপুর প্রতিনিধি শামসুল আরিফিন মুক্তা’র বাবার ইন্তেকালে ‘দৈনিক নতুন আলো’ পরিবারের গভীর শোক

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ‘দৈনিক নতুন আলো’র মুকসুদপুর উপজেলা প্রতিনিধি শামসুল আরিফিন মুক্তা’র শ্রদ্ধেয় বাবা মোঃ আলিমুজ্জামান আলি মুন্সি আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।আজ (শুক্রবার) আনুমানিক সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে তিনি নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।তাঁর এই অকাল প্রস্থানে ‘দৈনিক নতুন আলো’ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত। আমরা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করছি এবং পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার দরবারে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনকে এই অপূরণীয় ক্ষতি ও গভীর শোক সহ্য করার শক্তি দান করেন।‘দৈনিক নতুন আলো’ পরিবারের পক্ষ থেকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জ্ঞাপন করা হচ্ছে।সম্পাদক ও প্রকাশকএবং সর্বস্তরের কর্মী ও কলাকুশলীবৃন্দদৈনিক নতুন আলো (www.dailynotonalo.com)

মানবতার নিঃশব্দ পদচারণা: বাংলাদেশে ইতালীয়দের অবদান ও ঐতিহাসিক স্বীকৃতি

সীমানা, ভৌগোলিক দূরত্ব ও ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ গণ্ডি অতিক্রম করে নিঃস্বার্থ মানবসেবায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার ইতিহাস এ পৃথিবীতে বিরল নয়, তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ইতালীয় মিশনারিদের দীর্ঘ কয়েক দশকের নীরব ত্যাগ ও আত্মনিবেদন সেই ইতিহাসকে এক অনন্য ও মহিমান্বিত উচ্চতায় উন্নীত করেছে। দক্ষিণবঙ্গের ঝোড়ো উপকূলীয় অঞ্চলের কুষ্ঠ ও যক্ষ্মারোগী থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের সমতলের সাঁওতাল সম্প্রদায় কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকার সুবিধাবঞ্চিত শিশু -এদেশের অবহেলিত, চরম শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের পাশে এই ইতালীয় ধর্মযাজক ও সন্ন্যাসিনীরা দাঁড়িয়েছেন পরম মমতায় ও পরম অভিভাবকত্বে। সম্প্রতি ইতালীয় প্রজাতন্ত্রের মহামান্য প্রেসিডেন্ট সার্জিও মাত্তারেলা কর্তৃক দুই নিবেদিতপ্রাণ ইতালীয় মিশনারি - সিস্টার রবার্টা পিনিওনে (Sister Roberta Pignone) এবং ফাদার পিয়েত্রো লুইজি লুপি (Father Pietro Luigi Lupi) -কে ইতালির অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নাইট সম্মাননা ‘Cavaliere dell’Ordine della Stella d’Italia’ (অর্ডার অব দ্য স্টার অব ইতালি) -তে ভূষিত করা কেবল তাঁদের ব্যক্তিসত্তার অনন্য মূল্যায়ন নয়; বরং এটি বাংলাদেশে তাঁদের যুগের পর যুগ ধরে চলা পালকীয়, চিকিৎসাসেবা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতি এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতি ক্যাথলিক মণ্ডলীর সেবাকে নতুন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে এবং বাংলাদেশে বসবাসরত সমগ্র ইতালীয় সম্প্রদায়ের জন্য বয়ে এনেছে এক অনন্য গৌরব। এটি ইতালির একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা। বিদেশে ইতালির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা এবং অন্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের এই 'নাইট' উপাধি দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যখাতে, বিশেষ করে দক্ষিণ বাংলাদেশের অবহেলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় সিস্টার রবার্টা পিনিওনের অবদান এক মহাকাব্যিক ও অবিশ্বাস্য দৃষ্টান্ত। ‘মিশনারি সিস্টার্স অব দি ইমাকুলেট’ (বাংলাদেশে এরা পিমে সিস্টার্স - PIME Sisters নামে পরিচিত) ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী সংঘের এই উৎসর্গীকৃতপ্রাণ পেশায় একজন দক্ষ চিকিৎসক। তিনি মূলত দক্ষিণবঙ্গের উপকূলীয়, দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবায় নিজেকে পুরোপুরি বিলিয়ে দিয়েছেন। খুলনা ধর্মপ্রদেশের অন্তর্গত ঐতিহাসিক ড্যামিয়েন হাসপাতালের (Damien Hospital) প্রকল্প পরিচালক এবং একমাত্র সার্বক্ষণিক চিকিৎসক হিসেবে সিস্টার রবার্টা পিনিওন দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে কুষ্ঠ (Leprosy), যক্ষ্মা (TB) এবং এইচআইভি/এইডস (AIDS) আক্রান্ত চরম সামাজিক অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার রোগীদের জন্য এই ড্যামিয়েন হাসপাতালটিই হলো একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র। সিস্টার রবার্টা এখানে ৩৩ শয্যার মূল হাসপাতালটি দক্ষতার সাথে পরিচালনার পাশাপাশি আরো ৩টি গ্রামীণ ক্লিনিক এবং ১৫টি যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র তদারকি করেন। শুধু হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে নিজের সেবাকে সীমাবদ্ধ না রেখে, তিনি খুলনার ভয়াবহ ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে এবং অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারগুলোর দরজায় দরজায় ঘুরে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিনামূল্যে মানসম্মত ওষুধ বিতরণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সমাজে কুষ্ঠ ও যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীরা যেন সামাজিক কুসংস্কার, ছোঁয়াচে ভয় ও বৈষম্যের শিকার হয়ে পরিবারচ্যুত না হন, সেই লক্ষ্যে তাঁর নিরলস মানসিক ও সামাজিক সংগ্রাম চিকিৎসা খাতকে অতিক্রম করে এক মানবিক ও রূপান্তরকামী আন্দোলনে উন্নীত হয়েছে। ছবি : সংগৃহীতঅন্যদিকে, শিক্ষা বিস্তার, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষা এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ফাদার পিয়েত্রো লুইজি লুপি (যাঁকে এদেশের মানুষ ভালোবেসে ফাদার লুপি নামে ডাকেন) এক নীরব অথচ গভীর সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। ইতালীয় ক্যাথলিক সংঘ 'জ্যভেরিয়ান ফাদার্স' (Xaverian Fathers) -এর সম্মানিত পুরোহিত এবং বাংলাদেশে এই সংঘের সাবেক আঞ্চলিক সুপিরিয়র (Regional Superior) হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন। এদেশের দরিদ্র, অসহায় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাঁদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। বিশেষ করে সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলের চরম অবহেলিত ও প্রান্তিক ‘দলিত’ (Dalit) সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরে ফাদার লুপির দূরদর্শী ভূমিকা অসাধারণ। তাঁর নিরবচ্ছিন্ন উৎসাহ, দিকনির্দেশনা ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় স্থানীয় দলিত যুবকরা উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন এবং নিজেদের আইনি ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে 'দলিত' নামক শক্তিশালী এনজিও গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। কেবল গ্রামীণ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই নয়, ঢাকার তেজগাঁও রেলস্টেশন সংলগ্ন নোংরা ও বিপজ্জনক বস্তি এলাকার ছিন্নমূল শিশুরা যেন কঠোর শিশুশ্রম ও অপরাধের অন্ধকার জগতে না হারিয়ে শিক্ষার আলো পায়, তার জন্য তিনি সমন্বিত স্কুল ও ডে-কেয়ার সেন্টার পরিচালনা করেছেন। পাশাপাশি বান্দরবানের লামার মতো দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষাদানে তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া অমানবিক পরিস্থিতির শিকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তা সুনিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাঁদের আর্তপীড়িত কণ্ঠস্বর তুলে ধরতেও ফাদার লুপি নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্যেও তিনি আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।বাংলাদেশে ইতালীয় মিশনারিদের এই নিঃস্বার্থ সেবা এবং প্রেমের ইতিহাস কেবল সাম্প্রতিক দশকগুলোর ঘটনাবলী নয়; এর রক্তের ও আত্মার শক্ত শেকড় প্রোথিত রয়েছে আমাদের ১৯৭১ সালের গৌরবময় মহান মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তানি বাহিনীর পাশবিক বর্বরতা ও গণহত্যার মুখে জ্যভেরিয়ান (Xaverian) এবং পিমে (PIME) Missions -এর ইতালীয় পুরোহিতগণ নিজেদের গির্জা, মিশন ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে চরম প্রাণভয় উপেক্ষা করে এলাকার ভীত-সন্ত্র্যস্থ আপামর জনসাধারণের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থানে পরিণত করেছিলেন। তাঁরা স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে পরম বন্ধুর মতো দাঁড়িয়েছিলেন। বিশেষভাবে ফাদার মারিনো রিগন আমাদের বানিয়ারচর ধর্মপল্লীতে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আশ্রয়ে রেখে চিকিৎসা দিয়েছেন ও নিরাপত্তা নিশ্চিৎ করেছেন। এই বীরত্বপূর্ণ মানবিক অবদান ও অকৃত্রিম বন্ধুত্বের ঐতিহাসিক স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার জ্যভেরিয়ান মিশনারি ফাদার মারিনো রিগনকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা' (Friends of Liberation War Honour) প্রদান করে। ছবি : সংগৃহীতফাদার মারিনো রিগন ছিলেন এদেশের ইতালীয় মিশনারিদের মধ্যে এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। দীর্ঘ ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করে তিনি শিক্ষা বিস্তার ও মানবসেবার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভালোবেসেছিলেন আপন হৃদয়ে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কবি জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ইতালি ভাষায় অনুবাদ করে তিনি বিশ্ব দরবারে বাঙলা সাহিত্যকে নতুন করে তুলে ধরেছিলেন। এ অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে অনন্য সম্মানসূচক নাগরিকত্ব (Honorary Citizenship) প্রদান করে। ২০১৭ সালে তিনি ইতালিতে মৃত্যুবরণ করলেও, তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল এই প্রিয় বাংলার মাটিতেই শায়িত হওয়ার। সেই আকুল ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ ও ঐতিহাসিক উদ্যোগে তাঁর মরদেহ ইতালির রোম থেকে মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে নিয়ে আসা হয়। সেখানে বাংলাদেশ পুলিশের একটি চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করে এবং সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, ভূমি অধিকার ও শিক্ষার প্রসারে ফাদার পাওলো চিচেরি সহ বহু ইতালীয় পিমে (PIME) মিশনারির ঐতিহাসিক ভূমিকা স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় পর্যায়ে সবসময় ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেছে। এই মহান ত্যাগের বার্তা শুধু সেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মূলত ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মেলবন্ধনের এক পরম শিক্ষা। বাংলাদেশের প্রথম কার্ডিনাল প্যাট্রিক ডি'রোজারিও সিএসসি যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা ও ভুল ধারণা দূর করতে খ্রিস্টানদের সম্প্রীতির সেতু হিসেবে কাজ করা অপরিহার্য। আন্তধর্মীয় সংলাপ ও প্রত্যক্ষ ভালোবাসার মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই মানবিক সম্পর্কই সমাজকে সুন্দর ও শান্তিময় করে তুলতে পারে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যখন বৈশ্বিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক স্বার্থপরতা ও বর্ণবাদী অসহিষ্ণুতা বিস্তার লাভ করছে, ঠিক সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এই ইতালীয় মিশনারিদের আত্মত্যাগী জীবন আমাদের নতুন করে শেখায় যে - প্রকৃত মানবধর্ম কোনো ভৌগোলিক সীমানা, জাতীয়তা বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। সিস্টার রবার্টা ও ফাদার লুপির মতো দূরদর্শী সাধকেরা এদেশের স্বাস্থ্য ও সামাজিক রূপান্তর সূচকে যে নীরব অবদান রেখে চলছেন, তা বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল শক্তিস্বরূপ। এ সম্পর্ক কেবল ব্যবসা-বাণিজ্য বা রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে গঠিত নয়, বরং এটি গঠিত হয়েছে রক্তের, মমতার ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক ইস্পাতকঠিন ভিতের ওপর। বাংলাদেশের এই নিভৃত আলো ছড়ানো বিদেশি বন্ধুদের প্রতি রাষ্ট্র, সমাজ ও এদেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। নিকোলাস বিশ্বাস, একজন ফ্রিল্যান্স মিডিয়া কর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। মতামত লেখকের নিজস্ব।নিকোলাস বিশ্বাস একজন সৃজনশীল লেখক, কলামিস্ট, অনুবাদক এবং উন্নয়ন পেশাজীবী। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য, জননীতি ও সুশাসন বিষয়ক তার প্রবন্ধ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি “জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল” (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। উন্নয়ন খাতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাকে তিনি চিন্তাশীল, গবেষণাভিত্তিক ও প্রভাবসৃষ্টিকারী লেখালেখির প্রতি গভীর অনুরাগের সঙ্গে একীভূত করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা ভাষায় একাধিক বই ও নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে -আন্তর্জাতিক সম্পর্ক- বিষয়ে স্নাতোকত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন।

বিশ্ব বাস্তবতায় জাতিসংঘের ঘোষিত ছয় অগ্রাধিকার

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই নিয়োগের মাধ্যমে প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক এই সম্মানজনক পদে প্রত্যাবর্তন করল। গত ২ জুনের নির্বাচনে ৯৯টি ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী অ্যান্ড্রেয়াস এস. কাকুরিসকে পরাজিত করে ড. রহমান সভাপতির পদটি নিশ্চিত করেন। জেনেভা ও নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক সম্পূর্ণ অধিবেশনজুড়ে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।এছাড়া, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া উচ্চপর্যায়ের সাধারণ সভায়ও ড. রহমান সভাপতিত্ব করবেন, যা জাতিসংঘের বার্ষিক সূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং এতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। উল্লেখ্য যে, প্রতি বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একজন সভাপতি নির্বাচিত হন।প্রতিবার নতুন সভাপতি একটি ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে আসেন। এই কর্মসূচিকে আলাদা করে তোলা মূল বিষয়বস্তু নয়; কারণ - শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু কার্যক্রম, মানবাধিকার ও মানবিক সুরক্ষা, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং বহুপাক্ষিকতার সংস্কার; এগুলো জাতিসংঘের পরিচিত শব্দভাণ্ডার। এই অধিবেশনের প্রকৃত প্রশ্ন এই নয় যে, ড. রহমান কী-কী অগ্রাধিকার দিতে চান, বরং প্রশ্নটি হলো - সাধারণ পরিষদ একটি বিশ্ব মঞ্চ বা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আদৌ কোন ক্ষমতা রাখে কিনা? জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতির ঘোষিত অগ্রাধিকারগুলো আগামী বারো মাসে কাঠামোগতভাবে অর্জনযোগ্য হবে কিনা তা নির্ভর করবে বর্তমান বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, বৈশ্বিক চাহিদা ও আচরণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রবলয়ের ভূমিকা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ধরণ ও আন্তরিকতার উপর।  মূল সংকট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম অভূতপূর্ব বিশ্ব অস্থিরতাবিশ্ব আজ তার যৌথ ইতিহাসের আরেকটি সংকটময় অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। সশস্ত্র সংঘাত, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, মানবিক সংকট, জলবায়ু জরুরি অবস্থা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস এমন সব চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে যা কোনো দেশের পক্ষেই একা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এমন একটি নির্ধারণী মুহূর্তে, জাতিসংঘ আজও এমন একটি অন্যতম বিশ্বমঞ্চ যেখানে দেশগুলো একত্র হয়ে আলোচনা করতে এবং যৌথ সমাধান খুঁজতে পারে।জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছে। প্রধান আলোচনাকারী, নীতিনির্ধারক ও প্রতিনিধিত্বকারী অঙ্গ হিসেবে সাধারণ পরিষদ ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসে, যেখানে প্রতিটি দেশের একটি করে ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি জাতিসংঘের একমাত্র অঙ্গ যেখানে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র সমান মর্যাদায় অংশগ্রহণ করে। এর দায়িত্বের পরিধি শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, মানবিক বিষয়াবলি, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং জাতিসংঘের বাজেট পর্যন্ত বিস্তৃত।এই পটভূমিতে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান ছয়টি মূল অগ্রাধিকার চিহ্নিত করেছেন:১) শান্তি ও নিরাপত্তা; ২) টেকসই উন্নয়ন; ৩) জলবায়ু পদক্ষেপ; ৪) মানবাধিকার ও মানবিক বিষয়াবলি; ৫) প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI); ৬) বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠনযদিও এই অগ্রাধিকারগুলো আমাদের সময়ের জরুরি প্রয়োজনীয়তাগুলোকে প্রতিফলিত করে, তবে মূল প্রশ্ন থেকেই যায়: সাধারণ পরিষদ কি এসব অঙ্গীকারকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে, নাকি বৈশ্বিক অস্থিরতা এই বাস্তবায়নকে থমকে দেবে? বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে প্রতিটি অগ্রাধিকার বিশ্লেষণ করলে বাস্তবায়নের একটি পরিষ্কার পথরেখা পাওয়া যায়। ছয়টি অগ্রাধিকারের বিশ্লেষণ: অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নে রূপান্তর:১. শান্তি ও নিরাপত্তা: সংকটের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ওপর জোরশান্তি ও নিরাপত্তা জাতিসংঘের মূল লক্ষ্যের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, অথচ নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ এবং ভূ-রাজনৈতিক ভেটো ক্ষমতার ব্যবহারে প্রায়শই আন্তর্জাতিক ঐক্যমত অচল হয়ে পড়ে। এই অগ্রাধিকারকে বাস্তবে রূপ দিতে সংঘাত ঘটার পর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে আগাম সংঘাত প্রতিরোধ, দ্রুত মধ্যস্থতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রক্রিয়ার দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সাধারণ পরিষদের সম-অধিকারের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে - যেখানে কোনো একক দেশের ভেটো ক্ষমতা নেই - জাতিসংঘ রাজনৈতিক সংলাপ, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং সংকট বড় আকারের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেওয়ার আগেই শান্তি প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে।২. টেকসই উন্নয়ন: বাস্তবায়নের ঘাটতি পূরণঅর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই অগ্রাধিকারকে দৃশ্যমান অগ্রগতিতে পরিণত করতে হলে জাতিসংঘকে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে সম্পদ প্রদানে জোর দিতে হবে। টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না; এটি বৈষম্য হ্রাস, বৈশ্বিক বাজারে সবার সমান প্রবেশাধিকার এবং কেবল অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে নয়, বরং মানুষের মর্যাদা ও স্থিতিস্থাপকতার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন পরিমাপের দাবি রাখে।৩. জলবায়ু পদক্ষেপ: দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণজলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো হুমকি নয়; চরম আবহাওয়া প্রতিনিয়ত বহু বছরের উন্নয়ন অগ্রগতি ধ্বংস করে দিচ্ছে। জলবায়ু লক্ষ্যকে পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হলে কেবল নামমাত্র অঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে এসে বাধ্যতামূলক জবাবদিহিতা, 'ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি' (Loss and Damage) তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ সুরক্ষাকে যুক্ত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু পদক্ষেপ একটি টিকে থাকার লড়াই। আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায়বিচার ও সম্পদ হস্তান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে সাধারণ পরিষদকে কাজ করতে হবে।৪. মানবাধিকার ও মানবিক সাড়াদান: মানুষকে প্রাধান্য প্রদানবৈশ্বিক সংঘাত প্রতিনিয়ত লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে, যা শরণার্থী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে মৌলিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। মানবাধিকার নীতিগুলোকে বাস্তব সুরক্ষায় রূপান্তর করতে মানবিক সহায়তাকে ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে মুক্ত করতে হবে। জাতিসংঘকে নিশ্চিত করতে হবে যেন আন্তর্জাতিক আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয় - কোনো দ্বিমুখী নীতি ছাড়াই - যাতে সংঘাত যেখানেই ঘটুক না কেন মানবিক সহায়তা ও তহবিল সুরক্ষিত থাকে।৫. প্রযুক্তি ও এআই শাসন: ডিজিটাল বৈষম্য প্রতিরোধকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রাখে, তবে কয়েকটা ধনী দেশের হাতে প্রযুক্তি সীমাবদ্ধ থাকলে তা বৈশ্বিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এই অগ্রাধিকারকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হলে নতুন প্রযুক্তির জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। এআই নীতি নির্ধারণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রযুক্তিকে বৈশ্বিক বিভাজনের কারণ না বানিয়ে যৌথ অগ্রগতির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।৬. বহুপাক্ষিকতার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন: সাফল্যের মূল নিয়ামকপূর্ববর্তী পাঁচটি অগ্রাধিকারের সফলতা সম্পূর্ণভাবে জাতিসংঘের নিজস্ব সংস্কার এবং ভাবমূর্তির ওপর নির্ভর করছে। যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে অকার্যকর বা পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করে, তখন বহুপাক্ষিকতা ব্যর্থ হয়। এই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জোরালো কণ্ঠস্বর প্রদান করা প্রয়োজন। আস্থা পুনর্গঠন কেবল কোনো প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মূল শর্ত।বাস্তবায়নের ব্যবধান কমানোর উপায়৮১তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের এই ছয়টি অগ্রাধিকার বর্তমান বিশ্ব সংকট মোকাবিলার জন্য একটি সুসংগঠিত কাঠামো প্রদান করে। নিরাপত্তা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে, উন্নয়ন জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ায়, জলবায়ু স্থায়িত্ব মানবিক সংকট কমায় এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি এই সবগুলোকে গতিশীল করে।তবে কেবল ঘোষণাপত্র প্রকাশ বিশ্ব অস্থিরতা সমাধান করতে পারবে না। ৮১তম অধিবেশন তখনই এই ছয়টি অগ্রাধিকারকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে পারবে, যখন সদস্য রাষ্ট্রগুলো সাধারণ পরিষদের গণতান্ত্রিক মঞ্চকে - যেখানে প্রতিটি দেশের সমান ভোট রয়েছে - রাজনৈতিক ঐক্যমত তৈরি, আর্থিক সম্পদ সংস্থান এবং যৌথ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কাজে ব্যবহার করবে।বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো বিশাল, তবে রাজনৈতিক মানসিকতা এবং বহুপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে জাতিসংঘ এই ছয়টি অগ্রাধিকারকে একটি স্থিতিশীল বিশ্বের জন্য বাস্তব সমাধানে রূপান্তর করতে পারে যদিও বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের অতীত সাফল্য খুবই নগন্য।নিকোলাস বিশ্বাস|একজন ফ্রিল্যান্স মিডিয়া কর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.comমতামত লেখকের নিজস্ব।নিকোলাস বিশ্বাস একজন সৃজনশীল লেখক, কলামিস্ট, অনুবাদক এবং উন্নয়ন পেশাজীবী। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য, জননীতি ও সুশাসন বিষয়ক তার প্রবন্ধ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি “জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল” (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। উন্নয়ন খাতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাকে তিনি চিন্তাশীল, গবেষণাভিত্তিক ও প্রভাবসৃষ্টিকারী লেখালেখির প্রতি গভীর অনুরাগের সঙ্গে একীভূত করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা ভাষায় একাধিক বই ও নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে -আন্তর্জাতিক সম্পর্ক- বিষয়ে স্নাতোকত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন।

জলবায়ু পরিবর্তন: বাস্তুচ্যুতি, বৈষম্য ও মানবিক ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু পরিচিত দৃশ্য—ভয়াবহ দাবানল, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ কিংবা খরায় ফেটে যাওয়া মাটি। সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশনের পর্দায় এসব দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি স্থান পায়। কারণ এগুলো তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান এবং উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।কিন্তু বাস্তবতা হলো, এগুলো জলবায়ু সংকটের কেবল দৃশ্যমান অংশ। যেমনি হিমশৈলের (Iceberg) সবচেয়ে বড় এবং গভীর অংশ লুকিয়ে থাকে পানির নিচে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের গভীর প্রভাব ও ক্ষত মিশে থাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাঝে—যা উপর থেকে দেখা যায় না।জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত ক্ষতি শুধু ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ফসলহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলে। এই সংকটকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দৃশ্যমান দুর্যোগের বাইরে গিয়ে এর অন্তর্নিহিত কারণ ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবগুলো বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।দৃশ্যমান দুর্যোগ: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকাশ্য রূপবর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এবং দাবানল পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করছে। এসব দুর্যোগ তাৎক্ষণিক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়।দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সরকার ও মানবিক সংস্থাগুলো ত্রাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের মনোযোগ সীমাবদ্ধ থাকে তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই, অথচ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলো অনেক বেশি গভীর এবং জটিল—যা আমাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।দুর্যোগের আড়ালে শুরু হয় আরেকটি সংকটপ্রতিটি জলবায়ুজনিত দুর্যোগ একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ার সূচনা করে:খাদ্য অনিরাপত্তা: যখন খরায় ফসল নষ্ট হয়, তখন শুধু কৃষকের উৎপাদনই কমে না; খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়, বাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি খাদ্য অনিরাপত্তার মুখোমুখি হয়। কৃষক তার আয়ের উৎস হারান, পরিবারগুলো ঋণের বোঝা বহন করতে বাধ্য হয় এবং অনেক মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব: একইভাবে নদী, খাল ও জলাধার শুকিয়ে গেলে শুধু পানির সংকটই সৃষ্টি হয় না; কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপদ পানির জন্য দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, যা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগকেও সীমিত করে।খাদ্য নিরাপত্তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবজলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুতর কিন্তু কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি হলো খাদ্য নিরাপত্তা। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, মাটির উর্বরতা হ্রাস, বন্যা ও খরার কারণে কৃষি উৎপাদন দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের ক্ষুদ্র কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।ফসলের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়। দরিদ্র পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে কম এবং নিম্নমানের খাদ্য গ্রহণ করে। এর ফলে অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের মধ্যে। ক্ষুধা তখন শুধু একটি মানবিক সংকট নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব হুমকিজলবায়ু পরিবর্তন এখন জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ:অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং তাপজনিত অসুস্থতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।বন্যার কারণে নিরাপদ পানির উৎস দূষিত হয়ে cholera, ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।অন্যদিকে তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে মশাবাহিত রোগ যেমন—ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বিস্তার নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অনেক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে জরুরি চিকিৎসা প্রদান ব্যাহত হয়।তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে স্বাস্থ্যখাতকে আরও শক্তিশালী ও সহনশীল করে গড়ে তোলা জরুরি।অর্থনৈতিক ক্ষতি ও বৈষম্যের বিস্তারজলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিটি দুর্যোগের পর সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠনে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়।দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। তারা সঞ্চয় হারায়, ঋণগ্রস্ত হয়, অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়ে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যেসব জনগোষ্ঠীর দায় সবচেয়ে কম, তারাই এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন ও সামাজিক অস্থিরতাজলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে বহু এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। ফলে জলবায়ুজনিত অভিবাসন দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে সীমিত ভূমি, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক অঞ্চলে সামাজিক উত্তেজনা, সংঘাত এবং নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত নয়, সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যানেরচিত্র:অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি: আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের কারণে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ নতুন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে।ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস: ভবিষ্যতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ এবং বৈশ্বিক অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বা পরিবেশগত অভিবাসীর সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১০০ কোটিরও বেশি হতে পারে।দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশ: বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে কোটি কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হতে পারে। এর মধ্যে শুধু বাংলাদেশেই প্রায় ২ কোটি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারে।এক দশকের তথ্য: Internal Displacement Monitoring Centre (IDMC)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে (২০১৪–২০২৩) জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ঘটিয়েছে—যা বিভিন্ন দেশে অমানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।জলবায়ু সংকট: উন্নয়নেরও বড় চ্যালেঞ্জজলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্পর্শ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষা ব্যাহত হয়, স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হয়ে পড়ে। কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে ব্যয় করতে হয়। ফলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন অনেক দেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এজন্য পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই জরুরি।দুর্যোগের আগে বিনিয়োগই সর্বোত্তম সমাধানজলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন: ১. জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ। ২. জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি। ৩. নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা। ৪. বন ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার। ৫. নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ। ৬. কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা।একই সঙ্গে এমন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা দুর্যোগ ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে এবং তাদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরে তাকানোর সময় এখনইজলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটিই মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই শুধু বন্যা, খরা কিংবা দাবানলের ক্ষয়ক্ষতি হিসাব করলেই চলবে না। আমাদের দেখতে হবে খাদ্য সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বাস্তুচ্যুতি এবং উন্নয়নের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব।এই সামগ্রিক চিত্রটি উপলব্ধি করলেই আমরা এমন নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সহনশীল, নিরাপদ এবং টেকসই পৃথিবী গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।উপসংহার: সংকটের আড়ালে গভীর সংকটজলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত সংকট নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ।অতএব, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আমাদের শুধু দৃশ্যমান দুর্যোগ নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোর প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ প্রকৃত সমাধান তখনই সম্ভব, যখন আমরা কেবল লক্ষণ নয়, সংকটের মূল কারণ এবং এর বহুমাত্রিক প্রভাব মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করব। তাহলেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল এবং টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।লেখক :নিকোলাস বিশ্বাস তিনি একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই

আদিবাসী জনগণের অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের নানামূখী চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। এ দিবসটি সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে আদিবাসী জনগণের অসামান্য অবদানকেও স্বীকৃতি জানায়। ২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য: “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো” যা মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ ও ঐতিহ্যগত জ্ঞানের সংরক্ষণ নিশ্চিতকরণের ওপর আলোকপাত করে।বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের বর্তমান পরিস্থিতি :বাংলাদেশ তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। এ দেশ বৈচিত্র্যময় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অনন্য আবাসস্থল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এখানে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস, যারা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী যুগ-যুগ ধরে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বজায় রেখে বসবাস করে আসছে।আমাদের সংবিধান ও সমঅধিকারের অঙ্গীকার :বাংলাদেশের সংবিধান সমতা ও ন্যায়বিচারের একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ কিংবা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তবে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সংবিধানে ‘জাতিসত্তা (Ethnicity) অথবা আদিবাসী (Indigenous Peoples)’ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন নং ১০৭ অনুসমর্থন করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে দেশের জাতিগত বৈচিত্র্য স্বীকৃত হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আদিবাসী জনগণ (Indigenous Peoples)’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। যদিও কিছু সাংস্কৃতিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, ভূমির মালিকানা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা, বিশেষ করে আইএলও -এর Committee of Experts on the Application of Conventions and Recommendations (CEACR), বার বার গুরুত্বারোপ করেছে যে, এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে; যেখানে আদিবাসী জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারেন।আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা :সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনও একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট। Kapaeeng Foundation -এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে মোট ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মতো অপরাধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী নারীদের চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার প্রতিফলন। তবে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়।প্রতিশোধের আশঙ্কা, সামাজিক কলঙ্ক, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তা ও সহায়ক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার বহু ঘটনাই নথিভুক্ত হয় না। এসব প্রতিবন্ধকতা শুধু ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে না; বরং সহিংসতা, প্রান্তিকীকরণ এবং বৈষম্যের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই জরুরি ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা ব্যবস্থা এবং অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে না।বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত :“বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত” - এই বহুল প্রচলিত উক্তিটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। সহিংসতার অসংখ্য বেঁচে থাকা মানুষের জন্য বিচার শুধু ধীরগতির নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা অধরাই থেকে যায়। তদন্তে বিলম্ব, দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বহু ক্ষেত্রে অপরাধীদের জবাবদিহিতার অভাব বিচারপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরী ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জানাতে নিরুৎসাহিত হন। এতে দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়।পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি: ঊনত্রিশ বছরের অপূর্ণ বাস্তবায়ন :১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর বহু গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল অধিকতর স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা। পরবর্তী বিভিন্ন সরকার চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে অগ্রগতির কথা উল্লেখ করলেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের মতে, অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণ, কার্যকর ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বেশ কয়েকটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। এই বাস্তবায়ন ঘাটতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসকে আরও গভীর করেছে।অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের এক নতুন সুযোগ :সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংরক্ষিত মহিলা আসন ১৯ -এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি সাক্ষাতে অংশ নেয়। বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ তুলে ধরে একটি সুপারিশপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। আদিবাসী নেতৃবৃন্দের এই উদ্যোগ নতুন করে দেশের জাতীয় আলোচনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ নির্মাণ :সংলাপ, সহনশীলতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ বহু জাতীয় সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। একই অঙ্গীকার এখন প্রয়োজন, যাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীও সংবিধানের পূর্ণ সুরক্ষা এবং অন্যান্য নাগরিকের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। তাদের কল্যাণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বিবেচনার দাবি রাখে:ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকারকে একটি কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসঙ্গে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা জরুরি।ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করা: আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংরক্ষণ ও বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যাতে তারা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ পরিচালনা করতে পারে।পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সকল অংশীজনের মধ্যে নতুন করে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করা অপরিহার্য।বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ :বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের বাইরের কেউ নয়; বরং তারা এই রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম অংশীদার। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বহু সদস্য বাঙালি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। দেশের প্রতি তাদের এই অবদান শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে নয়, বরং তাদের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান নাগরিকত্ব নিশ্চিতকারী নীতিমালার মাধ্যমে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হওয়া উচিত।বাংলাদেশের শক্তি কখনোই সাংস্কৃতিক একরূপতার ওপর নির্ভর করেনি। বরং এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধিতে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষায়। তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি এবং পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষা করা কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি দয়া প্রদর্শন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই ভবিষ্যতের প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ।নিকোলাস বিশ্বাস। একজন উন্নয়নকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত লেখক। যোগাযোগ: gonomaddyom@gmail.comমতামত লেখকের নিজস্ব।নিকোলাস বিশ্বাস একজন সৃজনশীল লেখক, কলামিস্ট, অনুবাদক এবং উন্নয়ন পেশাজীবী। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য, জননীতি ও সুশাসন বিষয়ক তার প্রবন্ধ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি “জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল” (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। উন্নয়ন খাতে দুই দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাকে তিনি চিন্তাশীল, গবেষণাভিত্তিক ও প্রভাবসৃষ্টিকারী লেখালেখির প্রতি গভীর অনুরাগের সঙ্গে একীভূত করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা ভাষায় একাধিক বই ও নিবন্ধ অনুবাদ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে -আন্তর্জাতিক সম্পর্ক- বিষয়ে স্নাতোকত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন।

​কোরবানির ঈদে অতিরিক্ত মাংস খাচ্ছেন? জেনে নিন কখন এই বদহজমই হতে পারে বিপদের সংকেত

ঈদুল আজহার আনন্দ ও উৎসবের অন্যতম মূল আকর্ষণ হলো হরেক রকমের মাংসের পদ। তবে কোরবানির ঈদে অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ফলে অনেকেই বুকজ্বালা, গ্যাস, পেট ফাঁপা বা বদহজমের মতো সমস্যায় ভোগেন। সামান্য অসাবধানতা উৎসবের আনন্দকে বিষাদে পরিণত করতে পারে। তাই এ সময়ে খাদ্য গ্রহণে সচেতন হওয়া এবং শরীরের বিপজ্জনক লক্ষণগুলো চিনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।​ঈদের দিনগুলোতে আমাদের কিছু অসচেতনতা ও ভুল অভ্যাসের কারণে হজমতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে :​অতিরিক্ত প্রোটিন ও চর্বি : মাংসের চর্বি হজম হতে দীর্ঘ সময় নেয়। অতিরিক্ত মাংস খেলে পাকস্থলীতে অ্যাসিড নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা বুকজ্বালার সৃষ্টি করে।​অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও কোমল পানীয়: ঘন ঘন মাংস খাওয়া এবং এর সঙ্গে কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার পরিপাক প্রক্রিয়াকে ধীর ও ব্যাহত করে।​আঁশযুক্ত খাবারের অভাব : মাংসের তুলনায় শাকসবজি ও সালাদ কম খাওয়ার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের ঝুঁকি বাড়ে।​সদ্য কাটা মাংস ও অতিরিক্ত মসলা : সদ্য কাটা শক্ত মাংস সঙ্গে সঙ্গে রান্না করলে তা হজম হতে বেশি সময় নেয়। এছাড়া অতিরিক্ত তেল-মসলা পাকস্থলীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।​বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং যাদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আছে, তাদের এই সময়ে অতিরিক্ত সচেতন থাকা প্রয়োজন।​পেট কিছুটা ভারী লাগা, অল্প বুকজ্বালা বা ঢেকুর ওঠাকে সাধারণ বদহজম ধরা হলেও, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে মোটেও অবহেলা করা যাবে না :​তীব্র পেটে ব্যথা: পেটের ওপরের দিকে প্রচণ্ড ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা গ্যাস্ট্রিক আলসার বা প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণ হতে পারে।​বারবার বমি: অনবরত বমি হওয়া বা বমির সঙ্গে রক্ত আসা অত্যন্ত বিপজ্জনক।​মলদ্বারে রক্তপাত: কালো পায়খানা বা মলের সাথে রক্ত যাওয়া পরিপাকতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ নির্দেশ করে।​বুকে প্রচণ্ড চাপ বা শ্বাসকষ্ট: অনেক সময় হার্ট অ্যাটাকের ব্যথাকে মানুষ গ্যাসের ব্যথা বলে ভুল করে। বুকের ব্যথা যদি চোয়ালে বা বাম হাতে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাথে শ্বাসকষ্ট হয়, তবে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।​জ্বর ও কাঁপুনি: বদহজমের পাশাপাশি উচ্চমাত্রার জ্বর পিত্তথলিতে ইনফেকশন বা অন্য কোনো জটিল সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়।​কোরবানি-পরবর্তী সময়ে শারীরিক জটিলতা এড়াতে কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চলা আবশ্যক :​পরিমাণ মেনে চলা : একবারে বেশি মাংস না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া উচিত এবং রান্নার সময় মাংসের চর্বি ফেলে দেওয়া ভালো।​খাবারে ভারসাম্য : মাংসের পদের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে সালাদ, শসা, লেবু ও ফাইবারযুক্ত সবজি পাতে রাখুন।​পর্যাপ্ত পানি পান : শরীর থেকে টক্সিন বের করতে এবং হজমপ্রক্রিয়া সচল রাখতে সারাদিনে অন্তত ২-৩ লিটার পানি পান করুন।​হাঁটাচলা করা : ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই শুয়ে না পড়ে অন্তত ৩০ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করা উচিত, যা মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে।​ওষুধের সঠিক ব্যবহার : চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো গ্যাসের ওষুধ বা ওষুধের ওপর অতি-নির্ভরশীল হওয়া যাবে না।​আপনার শরীর আপনারই আয়না; তাই অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার পর শরীর কোনো অস্বাভাবিক সংকেত দিচ্ছে কিনা, সেদিকে কড়া নজর রাখুন। সচেতনতাই পারে উৎসবের আনন্দকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে। ওপরে উল্লিখিত জটিল লক্ষণগুলোর কোনো একটি দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

এভাবে কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চলতে পারে?

পাবলিক পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়ের সঙ্গে শূন্য পাসের হার বা শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেলের বিষয়টিও সম্পর্কযুক্ত। যদিও অনেক বছর আগেই এর সূত্রপাত। শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বিভিন্ন বোর্ডে বছর বছর কমে এলেও, ধারাবাহিকভাবে এক মন্দ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড। সেখানে যেন তা পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। হয়তো কেউ বিশ্বাস করবেন না, আর সহজে তা বিশ্বাস না করারই কথা। কোনো কোনো শিক্ষা বোর্ডের ফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেসবে কেবল ফল বিপর্যয় না বলে মহাবিপর্যয় বললে বেশি বলা হবে না। আর ফল মহাবিপর্যয়ের ক্ষেত্রে নানা কারণে দিনাজপুর বোর্ডের নামটি সবার আগে চলে আসে। এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতিবছর মাত্র একজন বা দুজন করে অংশ নিয়ে সবাই ফেল করে এবং এভাবেই একটি প্রতিষ্ঠান এক যুগ কিংবা এরও বেশি সময় পার করে চলছে। এর কোনো ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না এবং শিগগির এ পরিস্থিতির উন্নয়নেরও কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির নাম উত্তর লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ। রংপুর বিভাগের দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত, মূল ফটকে লেখা রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৬৮ সাল। অনুসন্ধান করে জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটিতে ২৫ বছর আগে ২০০১ সালে উচ্চমাধ্যমিকে উন্নীত করে নাম বদলিয়ে উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ রাখা হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মোট সংখ্যা ২১ জন। কলেজ শাখা খোলার পর বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁরা (মোট ১৮ জন, প্রভাষক ১৪ জন ও কর্মচারী ৪ জন) এমপিওভুক্ত নন। দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে বিগত ১৩ বছরে (২০১৩-২৫) মোট ৩৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৭ জন, বাকি ২৯ জন পাস করেনি। ২০১৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক শাখায় মোট তিনজন অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র একজন শিক্ষার্থী। এরপর টানা তিন বছর (২০১৪-১৬) এখানকার আর কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০১৪ সালে ৫ জন, ২০১৫ সালে ৩ জন ও ২০১৬ সালে ১ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কেউই পাস করতে পারেনি। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিন বছরে ১০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিলেও পাস করেছে মাত্র ৪ জন। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিগত পাঁচ বছরে (২০২১-২৫) ব্যবসায় শিক্ষা, মানবিক ও বিজ্ঞান শাখায় অংশ নেওয়া মোট ১২ জন পরীক্ষার্থী কেউই পাস করতে পারেনি। শূন্য পাসের হার কিংবা শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেল এমন প্রতিষ্ঠানের কথা হয়তো হরহামেশা শোনা যায়, কিন্তু ধারাবাহিক বিপর্যয়ে হাবুডুবু খাওয়া প্রতিষ্ঠান আর কোনো বোর্ডের অধীনে এমন আরও আছে কি না, তা আমার জানা নেই। দেশের মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে দিনাজপুর বোর্ডের জন্য একটি ভয়াবহ বার্তা হলো পরীক্ষার ফলে এর ক্রমাবনতি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বোর্ডের তুলনায় দিনাজপুর বোর্ডের ধারাবাহিক ‘অধোগতি’ যেন থামতেই চাইছে না। ২০২১ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১টি বোর্ডে শতভাগ ফেল প্রতিষ্ঠান মোট ৫টি, এর মধ্যে উত্তর লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজসহ তিনটিই ছিল দিনাজপুর বোর্ডে। ২০২২ সালে ১১ বোর্ডে এমন প্রতিষ্ঠান মোট ৫০টি হলেও একমাত্র দিনাজপুর বোর্ডেই ছিল ১৩টি। ২০২৩ সালে ১১ বোর্ডে মোট ৪২টির বিপরীতে কেবল দিনাজপুর বোর্ডেই শূন্য পাসের হারের প্রতিষ্ঠান ১৬টি। ২০২৪ সালে ১১ বোর্ডে শতভাগ ফেল করে মোট ৬৫টি প্রতিষ্ঠান, এগুলোর মধ্যে দিনাজপুর বোর্ড ২০টি এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের পরীক্ষায় ১১ বোর্ডে মোট যেখানে ২০২টি প্রতিষ্ঠান শতভাগ ফেল করে, সেখানে কেবল দিনাজপুর বোর্ডেই রয়েছে ৪৩টি (সর্বোচ্চসংখ্যক) প্রতিষ্ঠানের নাম। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার দাঁতভাঙ্গা মডেল কলেজ, সমাজকল্যাণ মহিলা কলেজ ও ভূরুঙ্গামারী মেইডাম কলেজ, ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ আদর্শ কলেজ, নীলফামারী জেলার গলমুন্ডা আদর্শ কলেজ, লালমনিরহাট জেলার দুহুলি এসসি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং দক্ষিণ ঘনাসিয়াম হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ; দিনাজপুর জেলার উত্তর লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ। উল্লিখিত আটটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিটি থেকে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় একজন করে অংশ নিয়ে আট কলেজের সবাই ফেল করেছে। রংপুর বিভাগের আটটি জেলার ৬৭১টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ২০২৩ সালের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো পরীক্ষার্থী পাসের মুখ দেখেনি। শূন্য পাসের হার এ ১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮টি কলেজ ও ৮টি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ। একজন করে পরীক্ষা দিয়ে ফেল করা ৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এবার অন্যগুলো: কুড়িগ্রাম জেলার মোহানগঞ্জ আদর্শ কলেজ (মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১১), বাগুয়া অনন্তপুর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (৪ জন), লালমনিরহাট জেলার বেহলাবাড়ি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (৫ জন) এবং কুমরিরহাট এসসি স্কুল অ্যান্ড কলেজ (২ জন); দিনাজপুর জেলার বেপারিতলা আদর্শ কলেজ (৫ জন),ঠাকুরগাঁও জেলার মোড়লহাট জনতা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (৫ জন) এবং কদমরাসুল হাট হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ (৪ জন), গাইবান্ধা জেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ (২ জন)। ১৬টি কলেজের মোট পরীক্ষার্থী ৪৬ জন। এর মধ্যে ৮টি কলেজের মোট পরীক্ষার্থী যেমন ২৩ জন, ঠিক ৮টি হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের পরীক্ষার্থীও ২৩ জন (কী অদ্ভুত মিল!)। বিদ্যালয়টিতে মাধ্যমিকে কী হচ্ছে? ওই একই পরিস্থিতি, ধারাবাহিক ফল বিপর্যয়। দিনাজপুরের উত্তর লক্ষ্মীপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ ২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত (২০২১-২৫) এসএসসি পরীক্ষায় বোর্ডে অর্জিত পাসের হারের ধারেকাছেও নেই। ১৯৬৮ সালে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানটি থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ২০২১ সালে ৯০.৬৯ ভাগ (বোর্ডে পাসের হার ৯৪.৮০%), ২০২২ সালে ৬৭.৭৯ ভাগ (বোর্ডের হার ৮১.১৬%), ২০২৩ সালে ৫৬.৮৯ ভাগ (বোর্ডের হার ৭৬.৮৪%), ২০২৪ সালে ৫৪.৫৪ ভাগ (বোর্ডের হার ৭৮.৪৩%) ও ২০২৫ সালে ৩৮.১৫ ভাগ (বোর্ডে পাসের হার ৬৭.০৩%) পরীক্ষার্থী পাস করেছে। তাহলে এ রকম একটি নিম্নমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিকের পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক স্তর চালু করাটা কি খুবই জরুরি ছিল? মাসে কিংবা বছরে এ বাবদ খরচ কত? ১৩ বছরে মোট ৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য মাত্র ৭ জন—এমন তথ্য কী প্রমাণ করে? এ রকম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি একটি বা দুটি মাত্র? দেশজুড়ে এ রকম শত শত প্রতিষ্ঠানের কী অবস্থা? তা নিয়ে কি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেন কোনো ধরনের উদ্বেগ থাকবে না! মূল্যবোধ আর জবাবদিহির কথা না হয় বাদই দিলাম, দিনে দিনে লজ্জা-শরমের অবশিষ্টাংশটুকুও কি আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে না? এমন অন্তঃসারশূন্য শিক্ষাব্যবস্থা জাতির জন্য কী বার্তা বহন করে! তাহলে কি সরকার কা মাল, দরিয়া মে ঢাল—এই আমাদের পরিণতি?

অনলাইন জরিপ অনলাইন জরিপ

৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
আপনি কি মনে করেন, অনলাইনে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ ?

আপনি কি মনে করেন, অনলাইনে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ ?

  হ্যাঁ
  না
  মন্তব্য নেই
মোট ভোটদাতাঃ ২ জন
১

মুকসুদপুরে আলিম পরীক্ষায় শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন শেখ আব্দুর রাজ্জাক আলিম মাদরাসার

২

যোগ্য নেতৃত্বে দৃশ্যমান পরিবর্তন: শেখ আব্দুর রাজ্জাক আলিম মাদরাসায় ডিজিটাল ছোঁয়া

৩

মুকসুদপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন

৪

বিএনপি নেতা কার্তিক চন্দ্র ঠাকুরের সহধর্মিণী কানন বালা ঠাকুর

৫

গোপালগঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে আ. লীগ নেতার পদত্যাগ

৬

মুকসুদপুর প্রেসক্লাবের উদ্যোগে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত

৭

যুবদলের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক হলেন কাশিয়ানীর কৃতী সন্তান মাহমুদুল হাসান বাপ্পী

৮

সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণা কাল: বিএনপির মনোনয়ন আলোচনায় এগিয়ে সাবরিনা শুভ্রা।

৯

মুকসুদপুরে কাভার্ড ভ্যানের চাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

১০

মুকসুদপুরে আওয়ামী লীগ নেতা অশোক কুমার মণ্ডলের পদত্যাগ

জনপ্রিয় সব খবর
১

মুকসুদপুরে সাময়িক বরখাস্ত অধ্যক্ষের নিয়োগ নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন, নতুন করে তদন্তের দাবি

২

মুকসুদপুর ডিজিটাল সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর, সাধারণ সম্পাদক শহীদ

৩

মুকসুদপুরে জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে র‍্যালি, আলোচনা সভা ও ঋণের চেক বিতরণ

৪

মুকসুদপুর সরকারি কলেজে এইচএসসিতে বড় বিপর্যয়, পাসের হার মাত্র ২০.০৪%

৫

মিরপুরে ব্যাটিং বিপর্যয়ে ৮ উইকেটে হারল বাংলাদেশ, সিরিজে উইন্ডিজ ১-০ তে এগিয়ে থাকলো

৬

ফের এক সিনেমায় চঞ্চল-নিশো, ভিকি জাহেদের খলনায়ক-এ

৭

নরসিংদীতে আড়িয়াল খাঁ নদের তীর থেকে হাত-পা বাঁধা বস্তাবন্দি যুবকের মরদেহ উদ্ধার

৮

অপতথ্য প্রতিরোধ, স্বাধীন গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকত্ব

৯

উইন্ডিজের সামনে ১৭০ রানের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল বাংলাদেশ

১০

মুকসুদপুরে আলিম পরীক্ষায় শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন শেখ আব্দুর রাজ্জাক আলিম মাদরাসার

সর্বশেষ সব খবর

রাজনীতি

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: ১ লাখ ৩১ হাজার ভোটে বিজয়ী বিএনপির মির্জা ফয়সল

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: ১ লাখ ৩১ হাজার ভোটে বিজয়ী বিএনপির মির্জা ফয়সল

ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের সমস্ত ফলাফল গণনা শেষে তাঁকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে।আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর ২০২৬) সন্ধ্যা সোয়া ৯টায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনী ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম।ঘোষিত চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মির্জা ফয়সল আমীন পেয়েছেন মোট ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট সমর্থিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৪৫৩ ভোট। ফলে মির্জা ফয়সল আমীন ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৩৬ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করেন।এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী অপরাপর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী খাদেমুল ইসলাম হাতপাখা প্রতীকে পেয়েছেন ৩ হাজার ২৯১ ভোট। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থী আব্দুল আলিম নিজামী (বটগাছ) ৭৮৮ ভোট এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের প্রার্থী হোসাইন মোহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব) ৪৭৭ ভোট পেয়েছেন।এর আগে আজ সকাল ৮টা থেকে ১৮৫টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সকালের দিকে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের সমাগম কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ছিল এবং তা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।এদিকে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেন জানান, নির্বাচনে কোনো ধরণের প্রভাব বিস্তার বা কারচুপির সুযোগ ছিল না এবং সবার সহযোগিতায় পরিবেশ শান্ত রাখা সম্ভব হয়েছে।পাশাপাশি জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল হক বলেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পুরোপুরি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সাধারণ ভোটাররা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ চলছে, কয়েকটি কেন্দ্রে বিক্ষিপ্ত অনিয়মের অভিযোগ

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ চলছে, কয়েকটি কেন্দ্রে বিক্ষিপ্ত অনিয়মের অভিযোগ

উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর ২০২৬) সকাল ৭টা থেকে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সকালের দিকে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।এবারের উপনির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফয়সাল আমিন (ধানের শীষ) এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনের (দাঁড়িপাল্লা) মধ্যে। এছাড়া আরও তিনজন প্রার্থী এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।সকাল সাড়ে আটটার দিকে বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এবং জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাজীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও বেলা গড়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি কেন্দ্রে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দানাবাড়িয়া আনসারিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা কেন্দ্র থেকে জালিয়াতির অভিযোগে তিনজন ভুয়া ভোটারকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ভোটার স্লিপ বিতরণকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত অর্থের স্লিপ যুক্ত করার অভিযোগ সামনে এসেছে।অন্যদিকে, কিছু কেন্দ্রে পোলিং অফিসারদের পরিচয়পত্রে (আইডি কার্ড) ছবি না থাকার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন জামায়াত প্রার্থী। পাশাপাশি ডাব প্রতীকের প্রার্থীর পোলিং এজেন্টরা জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছেন বিএনপি প্রার্থী।এসব বিক্ষিপ্ত অভিযোগ ও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা বাদেও সামগ্রিক পরিবেশে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি বজায় রয়েছে। পুরো নির্বাচনী এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের অপেক্ষায় রয়েছেন সাধারণ ভোটাররা।

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর ২০২৬) বিকেলে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে উপজেলা বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষকদলসহ দলটির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। র‍্যালিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী, বুধবার বিকেলে উপজেলার কমলাপুর ব্রিজ এলাকা থেকে আনন্দ র‍্যালিটি বের করা হয়। এ সময় বিভিন্ন এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা এতে যোগ দেন। পরবর্তীতে মিছিলগুলো একত্রিত হয়ে মুকসুদপুর কলেজ মোড়ে এসে একত্রিত হয়। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আনন্দঘন আয়োজনে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি কর্মসূচিটিকে এক মিলনমেলায় পরিণত করে। বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড থেকে সুশৃঙ্খলভাবে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে আসার কারণে র‍্যালিতে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত লক্ষণীয়।উক্ত আনন্দ র‍্যালি ও কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন মুকসুদপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম খান, সাধারণ সম্পাদক তারেকুল ইসলাম রাজু, দপ্তর সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম শরীফ, সাবেক পৌর মেয়র সাজ্জাদ করিম মন্টু এবং পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মিন্টু।এ ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব মাহফুজ হাসান মৃধা, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুজ্জামান স্বপন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান বিপ্লব, গোবিন্দপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মিঠু লস্কর, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম লিটন এবং কৃষকদলের আহ্বায়ক মিজানুর রহমানসহ বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আগত বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।নেতাকর্মীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক অংশগ্রহণ স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। আনন্দঘন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নানা স্লোগানের মধ্য দিয়ে যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।

নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী যুবলীগের নৈরাজ্য, অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি ও অপতৎপরতার প্রতিবাদে মুকসুদপুরে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল

নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী যুবলীগের নৈরাজ্য, অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি ও অপতৎপরতার প্রতিবাদে মুকসুদপুরে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল

সারাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী যুবলীগের নৈরাজ্য, অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি ও অপতৎপরতার প্রতিবাদে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনসমূহ।রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় মুকসুদপুর উপজেলা ও পৌর বিএনপি এবং সহযোগী অঙ্গসংগঠন এর যৌথ উদ্যোগে এই বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।মিছিলটি পৌর শহরের সোনালী ব্যাংক চত্বর এলাকা থেকে শুরু হয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান সড়কসমূহ প্রদক্ষিণ করে। পরে পুনরায় সোনালী ব্যাংক চত্বর এসে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ সমাবেশের মাধ্যমে মিছিলটি শেষ হয়।মুকসুদপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুস সালাম খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম রাজু, পৌর বিএনপির সভাপতি আবুল বাশার টুলটু বিশ্বাস এবং সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মিন্টু।ছবি: দৈনিক নতুন আলোএছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম শরীফ, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব মাহফুজ হাসান মৃধা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান স্বপন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক সাইফুজ্জামান লিটন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান বিপ্লব, যুগ্ম আহ্বায়ক মো: রাজীব শরীফ, উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি মিজানুর রহমান, উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি হাবিবুর রহমান রইন এবং পৌর ছাত্রদলের সভাপতি আশিক মুন্সীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।সমাবেশে বক্তারা বলেন, অপকর্ম ও গণবিরোধী ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী অঙ্গসংগঠনগুলো আজ দেশের রাজনীতিতে প্রত্যাখ্যাত ও নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী যদি মুকসুদপুরের কোথাও শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট বা সাধারণ মানুষের জানমালের কোনো রূপ ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তবে সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে কঠোর হস্তে তা রাজপথে প্রতিহত করা হবে।

আন্তর্জাতিক

কলকাতার চোরবাগান পূজামণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে ১৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু

কলকাতার চোরবাগান পূজামণ্ডপে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে ১৮ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু

কলকাতার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গা পূজা মণ্ডপে এক ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের প্রাণহানির মর্মান্তিক সংবাদ পাওয়া গেছে। সংকীর্ণ প্রবেশপথ, হঠাৎ মুষলধারে বৃষ্টি এবং ছুটির দিনের উপচে পড়া ভিড়ের মারাত্মক সংমিশ্রণেই এই বিপর্যয় ঘটে বলে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা নিশ্চিত করেছেন।সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক থানা এলাকার সারদা পার্ক সংলগ্ন চোরবাগান মণ্ডপে এই দুর্ঘটনা ঘটে। মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটের রাম মন্দিরের নিকটবর্তী ৯০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী পূজায় দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে বাইরে অপেক্ষমাণ শত শত মানুষ একযোগে মণ্ডপের ভেতরে ঢোকার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করেন। মণ্ডপের ভেতরে ও বাইরে যাওয়ার পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং পর্যাপ্ত আলোর অভাব থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে মানুষ যখন ভেতরে প্রবেশের জন্য প্রবল ধাক্কাধাক্কি করছিলেন, ঠিক তখনই ভিড়ের চাপে কয়েকজন মাটিতে পড়ে যান। তাদের ওপর দিয়ে হুড়মুড় করে হাজারো মানুষ গড়িয়ে যাওয়ার ফলে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। অনেকের জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটে এবং দ্রুত তাদের মোটরসাইকেল ও স্থানীয় যানবাহনে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে মণ্ডপের একটি অংশ ভেঙে পড়ার কারণেও পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া এক প্রত্যক্ষদর্শী ও কুমোরটুলির বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী সোনু পাল বার্তা সংস্থা পিটিআইকে জানান, তিনি তার মায়ের সঙ্গে পূজা দেখতে এসেছিলেন। বৃষ্টির সময় হঠাৎ মানুষের অসহনীয় চাপের মুখে পড়ে তার মা চোখের সামনেই প্রাণ হারিয়েছেন। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার সময় সেখানে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক বা পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং উদ্ধারকাজ তদারকি করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীসহ রাজ্যের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনিক কর্তারা হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসা সেবার খোঁজখবর নেন এবং এই অপূরণীয় ক্ষতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। মণ্ডপগুলোতে অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ও সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।

১৮ অক্টোবর ২০২৬

সারাদেশ

মুকসুদপুর ডিজিটাল সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর, সাধারণ সম্পাদক শহীদ

সারাদেশ / মুকসুদপুর ডিজিটাল সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর, সাধারণ সম্পাদক শহীদ

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে 'মুকসুদপুর ডিজিটাল সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশন'-এর ৪৫ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে। নবগঠিত এই কমিটিতে মোঃ মিজানুর রহমান সভাপতি এবং মাসুদুর রহমান শহীদ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন।রোববার (১ নভেম্বর) অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন উপলক্ষে আয়োজিত এক সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে নতুন এই কমিটির শীর্ষ পদসহ পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করা হয়।পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মিন্টুর সভাপতিত্বে এবং নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান শহীদের সঞ্চালনায় সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।আলোচনা সভায় সভাপতি পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মিন্টু  ও অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মুকসুদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোঃ ছিরু মিয়া, ভাবড়াশুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান তবিউর রহমান ফাকের, মুকসুদপুর ডিজিটাল সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা হারুন অর রশিদ, বাংলাদেশ সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ফরিদপুরের সভাপতি শামীমুজ্জামান শামীম, সহ-সভাপতি রবিউল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইমরান হোসেন এবং নগরকান্দা ও সালথা সার্ভেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ আবুল খায়ের সিকদার।সভায় বক্তারা জমি পরিমাপের কাজে শতভাগ শুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা প্রদানের আহ্বান জানান। এ ছাড়া ডিজিটাল সার্ভেয়িং পেশার সার্বিক মানোন্নয়ন, পেশাগত স্বার্থরক্ষা এবং সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও ঐক্য সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।সাধারণ সভার শেষ পর্বে ৪৫ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী কমিটির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন অতিথিরা। নবগঠিত কমিটির নেতৃবৃন্দ পেশাগত মর্যাদা রক্ষা এবং সংগঠনের কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত ও গতিশীল করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

২০ ঘন্টা আগে

ফিচার

কাগজের বুকে অক্ষরের ছোঁয়া: প্রযুক্তির ঝড়ে কি হারিয়ে গেল চিঠির দিন?

আজ বিশ্ব চিঠি লেখা দিবস / কাগজের বুকে অক্ষরের ছোঁয়া: প্রযুক্তির ঝড়ে কি হারিয়ে গেল চিঠির দিন?

ইনবক্সের ভিড়ে নীল রঙের 'সিন' মার্ক কিংবা কয়েক সেকেন্ডে হারিয়ে যাওয়া ভয়েস মেসেজের যুগে মানুষ কি সত্যিই একে অপরের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারছে? নাকি দ্রুত যোগাযোগের ছদ্মবেশে মানুষ দিন দিন আরও বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে? এই যান্ত্রিক প্রশ্নটির উত্তর লুকানো রয়েছে নীল খামের পেটে পাঠানো সেই পুরোনো দিনের হাতে লেখা চিঠিতে।আজ ১ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব চিঠি লেখা দিবস। প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার থেকে ক্ষণিকের জন্য সরে এসে মানুষে মানুষে হৃদয়ের গভীর স্পন্দন বিনিময়ের উদ্দেশ্যেই দিনটি উদযাপিত হয়।দিবসটির পেছনের ইতিহাসটাও বেশ চমৎকার। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে অস্ট্রেলীয় লেখক ও আলোকচিত্রী রিচার্ড সিম্পকিন এক ভিন্নধর্মী উদ্যোগ নেন। তিনি নিজ দেশের বহু গুণী মানুষের কাছে হাতে লেখা চিঠি পাঠানো শুরু করেন। অবাক করার বিষয় হলো, আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যস্ততার মাঝেও তৎকালীন বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা সিম্পকিনকে চিঠির উত্তর লিখেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই রিচার্ড বুঝতে পেরেছিলেন—হাতে লেখা অক্ষরের মায়া আর আন্তরিকতার কোনো বিকল্প নেই। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে তিনি ১ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব চিঠি লেখা দিবস হিসেবে প্রবর্তন করেন।কিবোর্ডে টাইপ করা ‘আই লাভ ইউ’ কিংবা ‘কেমন আছ’ বার্তার চেয়ে হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজে ঝাপসা হওয়া কালির টানে যে আবেগ থাকে, তা কোনো ইমোজি বা ডিজিটাল স্টিকার দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। চিঠি মানেই ছিল শুধু কথা নয়—তাতে জড়িয়ে থাকত লেখকের হাতের লেখার ধরণ, কাঁপাকাঁপা আঙুলের স্পর্শ কিংবা অজান্তে ঝরে পড়া একফোঁটা চোখের জলের দাগ।চিঠি আমাদের শেখাত ধৈর্য ধারণ করতে। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দের জন্য দিন গুনতে গুনতে মানসিক সম্পর্কের যে গভীরতা তৈরি হতো, আজকের নোটিফিকেশননির্ভর যুগে তা একপ্রকার বিলুপ্ত।তাই বিশ্ব চিঠি লেখা দিবসের এই বিশেষ দিনে, যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছু সময়ের জন্য বিরতি নিয়ে কাগজ ও কলম তুলে নেওয়ার সময় এসেছে। বহুদিন না বলা কোনো অনুশোচনা, পুরনো অভিমান কিংবা বাবা-মা ও জীবনের বিশেষ মানুষটির উদ্দেশ্যে নিজ হাতে কয়েক লাইন লিখে ফেলুন। কারণ, টেক্সট মেসেজ একসময় সার্ভার থেকে মুছে যায়, কিন্তু হাতে লেখা চিঠি থেকে যায় পরম মমতায় স্মৃতির বাক্সে।

ফ্রিজে রাখা সবজিতে কি পুষ্টিগুণ ঠিক থাকে?

টাটকা নাকি ফ্রিজের সবজি: পুষ্টির ব্যবধান কতখানি? / ফ্রিজে রাখা সবজিতে কি পুষ্টিগুণ ঠিক থাকে?

প্রতিদিনের ব্যস্ততায় রোজ বাজারে যাওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই ছুটির দিনে একসংগে কয়েক দিনের সবজি কিনে ফ্রিজে রেখে দেওয়া এখন শহরের প্রায় প্রতিটি গৃহস্থালির সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এতে সময় বাঁচে এবং সবজি পচে যাওয়া থেকেও রক্ষা পায়। তবে বাজার থেকে এনেই রান্না করা তাজা সবজি এবং ফ্রিজে কয়েক দিন রেখে খাওয়া সবজির মধ্যে পুষ্টিগুণের কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য থেকে যায়। তাই সবজি কীভাবে এবং কত দিন সংরক্ষণ করছেন, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খেত থেকে সবজি তোলার পর থেকেই স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী তার পুষ্টিগুণ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বিশেষ করে সাধারণ তাপমাত্রায় বাজার থেকে এনে দীর্ঘ দিন ফেলে রাখলে সবজিতে থাকা পুষ্টিকর উপাদানগুলো নষ্ট হয় দ্রুত। সে ক্ষেত্রে আনার পর যত দ্রুত সম্ভব তা রান্না করে খেলেই সর্বোচ্চ পুষ্টি নিশ্চিত করা সম্ভব।সবজি ফ্রিজে রাখলে পচন প্রক্রিয়া অনেকটাই ধীর হয়ে যায়। ফলে সবজি দেখতে তাজা থাকে এবং বেশ কিছু দিন ভালোও থাকে। তবে ফ্রিজে রাখলেই যে সবজির পুষ্টি উপাদান একদম অপরিবর্তিত থাকবে, তা কিন্তু নয়। দিন যত বাড়ে, ফ্রিজের ভেতরের তাপমাত্রায় কিছু উপাদান কমতে থাকে। বিশেষ করে ভিটামিন ‘সি’ এবং পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলোর পরিমাণ দীর্ঘ সংরক্ষণের ফলে হ্রাস পেতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে, ২-৩ দিন ফ্রিজে রাখলেই সবজি বিষাক্ত বা সম্পূর্ণ পুষ্টিহীন হয়ে পড়ে।সবজির পুষ্টিমান যথাসম্ভব ধরে রাখতে কিছু সঠিক নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। বাজার থেকে আনার পরপরই সবজির পচা বা নষ্ট অংশ কেটে আলাদা করে ফেলা ভালো। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার করে পানি খুব ভালোভাবে ঝরিয়ে তবেই ফ্রিজে তোলা উচিত। তবে সবজি আগে থেকে কেটে দীর্ঘ দিন ফ্রিজে না রেখে, রান্নার ঠিক পূর্বমুহূর্তে কাটাই শ্রেয়।বিশেষ করে শাক বা পাতাজাতীয় সবজি খুব দ্রুত পুষ্টিগুণ হারায় এবং নষ্ট হয়ে যায়; তাই এগুলো ফ্রিজে না রেখে দ্রুত খেয়ে ফেলা ভালো। ব্যস্ত জীবনের প্রয়োজনে সবজি ফ্রিজে সংরক্ষণ করতেই হতে পারে, তবে তা যেন খুব বেশি দীর্ঘদিনের না হয়। শরীরকে পুরোপুরি সুস্থ রাখতে তাজা সবজি দ্রুত রান্না করে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে উত্তম।

সারা দিন ক্লান্তি লাগে? / সারাদিন ফিট থেকেও সন্ধ্যায় ক্লান্ত লাগলে কী করবেন?

প্রতিদিনের রুটিন একই রকম আছে, কিন্তু কাজ শেষে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর শরীর ভীষণ ক্লান্ত লাগছে? আগে যেখানে চটজলদি সব কাজ শেষ করে ফেলা যেত, আজকাল সেখানে যেন অলসতা এসে ভর করছে? শারীরিকভাবে ফিট থাকার পরও যদি আপনার সারা দিন এমন অহেতুক ক্লান্তি ও অলসতা কাজ করে, তবে বুঝতে হবে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় কিছুটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।সঠিক জীবনযাত্রা ও নিয়মতান্ত্রিক ছোট কিছু অভ্যাস আমাদের শরীরের ভেতরের শক্তির মাত্রা (Energy Level) প্রাকৃতিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। আপনার হারিয়ে যাওয়া সেই চাটুয্য ও উদ্যম ফিরিয়ে আনতে রুটিনে যে পরিবর্তনগুলো আনা জরুরি, তা জেনে নিন:১. ঘুম থেকে উঠে গরম পানিসকালে ঘুম থেকে চোখ খুলেই এক গ্লাস হালকা গরম পানি পান করার অভ্যাস করুন। রাতে দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর পর শরীরে যে মৃদু পানিশূন্যতা তৈরি হয়, তা দূর করতে এটি দারুণ কাজ করে। এ ছাড়া ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে সতেজ ও সক্রিয় করতেও পানির বিকল্প নেই।২. সকালের মিষ্টি রোদ গ্রহণঘুম ভাঙার ৩০ মিনিটের মধ্যে অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট সকালের রোদে কাটান। সকালের সূর্যের আলো শরীরের ‘মেলাটোনিন’ হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে শরীর ও মনের স্বাভাবিক 'বায়োলজিক্যাল ক্লক' বা ঘুম-জাগরণের চক্র ঠিক রাখে।৩. হালকা ব্যায়াম ও প্রাতঃরাশমাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিটের ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ অথবা একটু দ্রুত হাঁটা আপনার পুরো শরীরের রক্তসঞ্চালন বাড়িয়ে দেবে। এরপর সকালের ভারী নাশতা কোনো অবস্থাতেই বাদ দেওয়া যাবে না। নাশতায় ওটস, ডিম, লাল আটার রুটি কিংবা ফলমূলের মতো জটিল শর্করা (Complex Carbohydrate) ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন।৪. খাবারের সময়সূচি ও পানিপানএকবারে অনেক বেশি পরিমাণে না খেয়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পরপর অল্প করে পুষ্টিকর খাবার খান। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে কমে না এবং হঠাৎ ক্লান্তি আসে না। পাশাপাশি সারাদিন কাজের টেবিলে পানির বোতল রাখুন এবং অল্প অল্প করে চুমুক দিন। শরীরে মাত্র ২ শতাংশ পানির ঘাটতি হলেও মারাত্মক ক্লান্তি ও মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে।৫. চা-কফিতে নিয়ন্ত্রণ ও কাজের বিরতিক্লান্তি কাটাতে ঘন ঘন অতিরিক্ত চিনিযুক্ত চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংকস খাওয়া বন্ধ করুন। এগুলো তাৎক্ষণিক সাময়িক উদ্দীপনা দিলেও কিছুক্ষণ পর শরীরকে আরও বেশি অবসাদগ্রস্ত করে ফেলে। বিশেষ করে দুপুরের পর কফি এড়িয়ে চলাই ভালো। এ ছাড়া একটানা বসে কাজ না করে প্রতি ৫০-৬০ মিনিট পর ৫ মিনিটের ছোট বিরতি নিন, একটু হেঁটে আসুন।৬. মানসিক চাপ ও মানসম্মত ঘুমদুশ্চিন্তা ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ শরীরের ভেতরের শক্তি শুষে নেয়। ক্লান্তি দূর করতে প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট গভীর শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম (Deep Breathing) বা মেডিটেশন করুন। রাতের ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় মেনে চলুন। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠার অভ্যাস বজায় রাখুন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার ভালো ঘুম অত্যন্ত জরুরি।৭. স্ক্রিনটাইম কমানো ও রাতের খাবারঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভির স্ক্রিন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিন। ডিজিটাল ডিভাইসের 'ব্লু-লাইট' রাতের স্বাভাবিক ঘুমে বড় ব্যাঘাত ঘটায়। পাশাপাশি ঘুমানোর অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগেই রাতের খাবার শেষ করুন।বিশেষ পরামর্শ:জীবনযাত্রায় এসব ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পরও যদি টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনার তীব্র ক্লান্তি ও দুর্বলতা বজায় থাকে, তবে রক্তে কোনো ভিটামিনের ঘাটতি বা থাইরয়েডসহ অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

সারাদিন ফিট থেকেও সন্ধ্যায় ক্লান্ত লাগলে কী করবেন?

কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী কুলফি মালাই / স্বাদে অনন্য কুষ্টিয়ার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কুলফি মালাই

সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া জেলা শুধু বাউল সম্রাট লালন শাহের মাজার কিংবা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহের কুঠিবাড়ির জন্যই বিখ্যাত নয়, এ জেলার রয়েছে শত বছরের প্রাচীন খাদ্যের ঐতিহ্য। আর এই ঐতিহ্যের তালিকায় অন্যতম শীর্ষে রয়েছে কুষ্টিয়ার কুলফি মালাই। সর্দি-কাশির ভয় ভুলে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সীদের কাছেই এই কুলফি মালাই এখন এক পরম তৃপ্তির নাম।অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশের নদীয়া জেলার অংশ ছিল এই কুষ্টিয়া। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সময়কার নদীবন্দর থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের রেল যোগাযোগ—সবই এ জেলার সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষী। দেশের প্রথম রেলওয়ে স্টেশন জগতি এবং একসময়ের নামকরা বস্ত্রকল মোহিনী মিল আজও কুষ্টিয়ার সোনালী দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। পদ্মা ও গড়াই নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই জনপদ এখন সারা দেশে পরিচিত তার অনন্য স্বাদের খাবারের জন্য।সম্প্রতি কুষ্টিয়ার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এক বাস্তব সত্য। দেশের অন্য যেকোনো স্থানে কুষ্টিয়ার কুলফি বলে যা বিক্রি হয়, তার চেয়ে এখানকার আসল কুলফির স্বাদ আকাশ-পাতাল ভিন্ন। বিশেষ করে কুষ্টিয়া শহরের মীর মোশাররফ হোসেন সেতুর (গড়াই সেতু) পূর্ব পাশে বসা দোকানগুলো এখন কুলফিপ্রেমীদের প্রধান আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।ছবি : দৈনিক নতুন আলোস্থানীয় বিক্রেতারা জানান, তাঁরা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে খাঁটি দুধ, কিসমিস, এলাচ ও কিছু বিশেষ উপাদানের মিশ্রণে বাড়িতেই এই মালাই তৈরি করেন। প্রতি পিস কুলফি এখানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫০ টাকায়। স্বাদ ও মানের ব্যাপারে বিক্রেতারা এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে, গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে তাঁদের চ্যালেঞ্জ— যদি খেয়ে মজা না লাগে, তবে দাম দিতে হবে না।খুলনা থেকে অফিসের কাজে কুষ্টিয়া আসা এক দর্শনার্থী জানান, অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকার পরেও কুষ্টিয়ার কুলফি খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা ছিল। তাই এখানে এসে একসঙ্গে চারটি কুলফি খেয়েছি। এখানকার মালাইয়ের যে ঘন ও শীতল স্বাদ, তা মুহূর্তেই সব ক্লান্তি দূর করে মন সতেজ করে দেয়। শুধু তাই নয়, স্বাদ মুখে লেগে থাকায় অনেক পর্যটকই ফেরার সময় তাঁদের পরিবারের জন্য বাসায় পার্সেল করে নিয়ে যাচ্ছেন এই বিখ্যাত খাবার।কুষ্টিয়ার তিলের খাজা আর কুলফি মালাই এখন শুধু কোনো সাধারণ খাবার নয়, এটি এ জেলার গর্ব ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যাঁরা ঐতিহ্যবাহী এবং নির্ভেজাল খাবারের আসল স্বাদ নিতে চান, তাঁদের জন্য কুষ্টিয়ার এই কুলফি মালাই হতে পারে সেরা অভিজ্ঞতা।

স্বাদে অনন্য কুষ্টিয়ার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কুলফি মালাই

মেঘলা আকাশ মানেই কি অকারণ বিষণ্নতা ও একাকিত্ব? কী বলছেন মনোবিদরা; মেঘ কাটিয়ে মনে রোদেলা আলো ফেরানোর সহজ কিছু কৌশল / বৃষ্টির দিনে কেন মন খারাপ হয়?

টাপুর-টুপুর বৃষ্টির শব্দ, ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর শীতল বাতাস— বৃষ্টি অনেকের কাছেই প্রশান্তি, ভালোবাসা আর রোমান্টিক অনুভূতির প্রতীক। কিন্তু এই একই বৃষ্টি সবার মনে আনন্দের সুর তোলে না। অনেকের কাছেই মেঘলা আকাশ মানে অকারণ বিষণ্নতা, ক্লান্তি, একাকিত্ব কিংবা মন খারাপের এক অদ্ভুত অনুভূতি।আপনিও যদি বৃষ্টির দিনে অস্বাভাবিকভাবে মনমরা অনুভব করেন, তবে জেনে রাখুন— এটি কিন্তু মোটেও আপনার একার সমস্যা বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ২০২০ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মেঘলা আকাশ বা দীর্ঘ সময় সূর্যালোকের অভাবে মানুষের মধ্যে হতাশা ও বিষণ্নতার লক্ষণ বেশি প্রকাশ পায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় রেইনি ডে ব্লুজ(Rainy Day Blues)।তবে এর অর্থ এই নয় যে বৃষ্টি নিজেই বিষণ্নতার মূল কারণ। বরং বৃষ্টির আবহাওয়া আমাদের মানসিক অবস্থার ওপর এমন কিছু প্রভাব ফেলে, যা আগে থেকে থাকা হালকা বিষণ্নতা বা সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার(Seasonal Affective Disorder—SAD)-এর লক্ষণগুলোকে আরও তীব্র করে তোলে।মনোবিদদের মতে, বৃষ্টির দিনে আমাদের মন খারাপ হওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ :ঋতুভিত্তিক বিষণ্নতা বা স্যাড (SAD) : সিজনাল অ্যাফেকটিভ ডিসঅর্ডার হলো এমন এক ধরনের মানসিক সমস্যা, যা বছরের নির্দিষ্ট সময়ে— বিশেষ করে শীতকাল বা দীর্ঘ সময় মেঘলা ও কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় বেশি দেখা যায়। এ সময় অনেকেই অকারণে ক্লান্ত ও অনুৎসাহী বোধ করেন।সূর্যালোক ও হরমোনের খেলা : সূর্যের আলো আমাদের শরীরে সেরোটোনিন নামের একটি হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে, যা আমাদের মেজাজ ফুরফুরে রাখে। মেঘলা দিনে সূর্যের আলো না পাওয়ায় শরীরে সেরোটোনিনের মাত্রা কমে যায়। একই সাথে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন-এর উৎপাদনেও তারতম্য ঘটে, যা ঘুমের রুটিন নষ্ট করে মানসিক অবসাদ বাড়িয়ে দেয়।জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উদ্বেগ : অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা বা জলাবদ্ধতা মানুষের মনে এক ধরনের অবচেতন উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে আবহাওয়া দ্রুত চরম রূপ নেয়, সেখানে মানুষের মধ্যে হতাশার হার তুলনামূলক বেশি।ঘরবন্দি জীবনের একঘেয়েমি : বৃষ্টির কারণে বাইরে হাঁটাচলা, আড্ডা বা খেলাধুলার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকলে অলসতা ও একাকিত্ব জেঁকে বসে, যা মন খারাপের অনুভূতিকে দ্বিগুণ করে দেয়।মন খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক হলেও কিছু ছোট ও কার্যকর অভ্যাস আপনাকে এই মেঘলা দিনেও চনমনে রাখতে সাহায্য করতে পারে :লাইট থেরাপির সাহায্য নিন : সিজনাল ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে লাইট থেরাপি দারুণ কাজ করে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঘরের উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোতে কিছুটা সময় কাটালে শরীরে সেরোটোনিনের কার্যকারিতা বাড়ে এবং দ্রুত মেজাজ উন্নত হয়। ঘরেই শরীরচর্চা করুন : বাইরে বৃষ্টি বলে ব্যায়াম বন্ধ রাখবেন না। ঘরের মধ্যেই হালকা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ, ইয়োগা, নাচ কিংবা ঘরের টুকটাক কাজের মাধ্যমে শরীরকে সচল রাখুন। নিয়মিত শরীরচর্চা মস্তিষ্কে এনডরফিন হরমোন নিঃসরণ করে মানসিক চাপ কমায়। পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম : প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুব জরুরি। মনে রাখবেন, ঘুম কম হওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি বৃষ্টির দিনে অতিরিক্ত ঘুমানোও কিন্তু মন খারাপের অন্যতম কারণ হতে পারে। প্রিয় মানুষদের সাথে গল্প করুন : বৃষ্টির দিনে নিজেকে একা গুটিয়ে না রেখে পরিবার ও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখুন। একটি ফোন কল, ভিডিও চ্যাট, কিংবা সবাই মিলে একসাথে বসে গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে ছোট্ট আড্ডাও আপনার মনের সব মেঘ দূর করে দিতে পারে।সাময়িক মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক, তবে এই বিষণ্নতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং আপনার দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করতে শুরু করে, তবে দেরি না করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। বিশেষ করে যদি দীর্ঘদিন ধরে কোনো কিছুতেই মন না বসে এবং তীব্র একাকিত্ব বোধ হয়, তবে আবহাওয়াজনিত বিষণ্নতা  চিকিৎসায় অভিজ্ঞ একজন থেরাপিস্টের গাইডলাইন নেওয়া জরুরি।বৃষ্টি প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার। কারও কাছে এটি আনন্দের জলছবি, আবার কারও কাছে অকারণ মন খারাপের মেঘ। তাই বৃষ্টির দিনে মন খারাপ লাগলে নিজেকে দোষারোপ করবেন না। নিজের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দিন, পর্যাপ্ত আলো ও প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে থাকুন। একটু সচেতনতা আর নিজের যত্নেই এই সাময়িক রেইনি ডে ব্লুজ কেটে গিয়ে আপনার মনে আবার ফিরে আসবে রোদেলা আলো।

বৃষ্টির দিনে কেন মন খারাপ হয়?

কেমন ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর / হারিয়ে যাচ্ছে শিকড়: গ্রামবাংলার নৈতিকতার পাঠশালা কাচারি ঘর কি তবে শুধুই অতীত?

আধুনিক নগরায়ণ আর প্রযুক্তির জোয়ারে আমরা প্রতিনিয়ত কত কিছুই না হারাচ্ছি। তবে কিছু কিছু হারিয়ে যাওয়া শুধু একটি বস্তু বা স্থাপনার বিদায় নয়, বরং তা একটি পুরো প্রজন্মের চেনা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর সামাজিক মূল্যবোধের অপমৃত্যু। তেমনি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর সামাজিক জীবনের একসময়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল কাচারি ঘর। সম্ভ্রান্ত ও সচ্ছল পরিবারগুলোর বাড়ির আঙিনায় সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘরটি কেবল কাঠে-বাঁশে ঘেরা কোনো স্থাপনা ছিল না; এটি ছিল শিক্ষা, আড্ডা, সামাজিক মেলবন্ধন ও মানবিক সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রাণকেন্দ্র।আজকের শহুরে জীবনের ড্রয়িংরুম যেমন কেবলই অতিথি আপ্যায়নের এক যান্ত্রিক বা কৃত্রিম জায়গা, অতীতের গ্রামের কাচারি ঘর ছিল তার চেয়ে বহুগুণ বিস্তৃত। এটি ছিল মূলত গ্রামীণ সমাজের নৈতিক শিক্ষার এক অনানুষ্ঠানিক অবারিত পাঠশালা।এই কাচারি ঘরগুলোতেই একসময় আশ্রয় হতো দূর-দূরান্ত থেকে আসা লজিং শিক্ষক কিংবা গৃহশিক্ষকদের। ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই মুখরিত হয়ে উঠত এই ঘর। নামাজ শেষে শুরু হতো শিশুদের কোরআন তিলাওয়াত, নামাজ শিক্ষা, শিষ্টাচার ও নৈতিকতার পাঠদান। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষকেরা এখানে শিশুদের জীবনবোধের পাঠ দিতেন। আর এই শিক্ষার বিনিময়ে শিক্ষকেরা পেতেন নিখাদ পারিবারিক আন্তরিকতা ও সামাজিক বন্ধন। একসময় গ্রামের মানুষ চাল বা খাদ্যসামগ্রী দিয়ে লজিং শিক্ষকদের পরম শ্রদ্ধায় পুরস্কৃত করতেন, যা পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আর্থিক সম্মানী রূপ নেয়।কাচারি ঘরকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ সমাজে চমৎকার একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠত। সাধারণত এই ঘরের আশপাশেই থাকত একটি ছোট সামাজিক পরিসর— যার মধ্যে একটি ছোট মসজিদ, পুকুরঘাট, উন্মুক্ত খেলার মাঠ ও সুপেয় পানির উৎস। বিকালের আড্ডা থেকে শুরু করে গ্রামের বিচার-সালিশ, কিংবা মেহমানদের আবাসন— সবকিছুর মুশকিল আসান ছিল এই কাচারি ঘর।সময়ের নিষ্ঠুর পরিবর্তনে, আধুনিকতা ও প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিক জীবনের চাপে সেই কাচারি ঘর আজ গ্রামবাংলা থেকে প্রায় বিলুপ্ত। আজকের নতুন প্রজন্মের অনেক শিশু-কিশোর হয়তো এই ঐতিহ্যের নামটুকুও জানে না।আজকের আধুনিক যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক এগিয়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু ঠিক উল্টো পিঠে আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নৈতিকতা ও মানবিকতার ভিত। চারপাশের অস্থিরতা দেখে আজ বারবার প্রশ্ন উঠছে— আমরা কি তবে আধুনিক হতে গিয়ে নিজেদের আসল শিকড়টাই হারিয়ে ফেলছি?আজকের এই নৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সম্ভবত নতুনভাবে কাচারি ঘরের ধারণাকে সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। গ্রাম কিংবা শহরের প্রতিটি পাড়ায় এমন ছোট ছোট অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র যদি আবার গড়ে তোলা যায়, যেখানে শিশুদের পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি নিখাদ নৈতিক আর মানবিক শিক্ষা দেওয়া হবে, তবেই হয়তো নতুন প্রজন্মকে আধুনিকতার পাশাপাশি তাদের আসল শিকড়ের সঙ্গে আবারও যুক্ত করা সম্ভব হবে।

হারিয়ে যাচ্ছে শিকড়: গ্রামবাংলার নৈতিকতার পাঠশালা কাচারি ঘর কি তবে শুধুই অতীত?

বিনোদন

সকল জেলার খবর

খেলাধুলা

খেলাধুলা / মিরপুরে ব্যাটিং বিপর্যয়ে ৮ উইকেটে হারল বাংলাদেশ, সিরিজে উইন্ডিজ ১-০ তে এগিয়ে থাকলো

নিজের চেনা আঙিনা হোম অব ক্রিকেট খ্যাত মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামেই হোঁচট খেল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচ টেস্ট সিরিজের প্রথমটিতে ব্যাটিং ব্যর্থতার খেসারত দিয়ে ৮ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হেরেছে স্বাগতিকেরা। এই জয়ে ১-০ ব্যবধানে সিরিজে এগিয়ে গেল সফরকারী ক্যারিবীয় দল।মিরপুরের ঘূর্ণি উইকেটে শুরু থেকেই ব্যাটারদের চরম ব্যর্থতা বাংলাদেশকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেয়। দুই ইনিংসেই উইন্ডিজ স্পিনারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতে পারেননি স্বাগতিক ব্যাটারদের কেউ। বলের বাড়তি টার্ন ও নিচু হয়ে যাওয়ার প্রবণতায় মিরপুরের বাইশ গজ ব্যাটসম্যানদের জন্য এক প্রকার মরণফাঁদে পরিণত হয়। যার ফলে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত পুঁজি গড়তে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।এর আগে দ্বিতীয় ইনিংসে নাঈম হাসানের প্রথম টেস্ট ফিফটি এবং টেলএন্ডারদের লড়াইয়ে ভর করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৭০ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে স্বল্প পুঁজি নিয়ে বোলাররা শুরুর দিকে কিছুটা প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও তা জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। ক্যারিবীয় ব্যাটাররা সহজেই প্রয়োজনীয় রান তুলে নিয়ে বড় জয় নিশ্চিত করেন।এই পরাজয়ের ফলে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ল টাইগাররা। সিরিজে সমতা ফিরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এবার দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের প্রস্তুতি নিতে হবে স্বাগতিকদের।

আর্কাইভ

সম্পাদকীয়

অপতথ্য প্রতিরোধ, স্বাধীন গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকত্ব

সম্পাদকীয় / অপতথ্য প্রতিরোধ, স্বাধীন গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকত্ব

গণমাধ্যমের অবাধ্য ও মুক্ত চর্চাকে যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে এই স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ও স্বার্থকতা নির্ভর করে একটি সচেতন নাগরিক সমাজের ওপর। আধুনিক প্রযুক্তির সুবাদে মানুষ প্রতিদিন তথ্যের এক অসীম সমুদ্রে সাঁতার কাটছে। তবে বিড়ম্বনা হচ্ছে, তথ্যের পর্যাপ্ততার চেয়ে এখন বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা—তা নির্ধারণ করতে পারা। একটি চটকদার কিংবা অসম্পূর্ণ শিরোনাম, কাটছাঁট করা ছবি কিংবা এডিট করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে মুহূর্তে জনমতকে বিভ্রান্ত করে তুলছে। এহেন পরিস্থিতিতে তথ্য গ্রহণের পাশাপাশি তার সঠিক উৎস, উদ্দেশ্য ও বস্তুনিষ্ঠতা বিচার করার সক্ষমতা অর্জন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় নাগরিক তাগিদ।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে সংবাদের গতি বাড়লেও বেড়েছে অপতথ্য এবং অসত্য তথ্য ছড়ানোর বহুগুণ ঝুঁকি। গণমাধ্যম-সচেতনতা বলতে কেবল সংবাদ পাঠ করা বোঝায় না; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ, পেছনের স্বার্থ চিহ্নিতকরণ ও নিরপেক্ষতা অনুধাবন। তবে সব দায় কেবল সাধারণ তথ্যগ্রহীতা বা পাঠকদের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। এখানে সংবাদমাধ্যমেরও পেশাগত নৈতিকতা এবং গণস্বার্থ রক্ষার বড় দায়িত্ব রয়েছে। দ্রুততম সময়ে সংবাদ দেওয়ার অনর্থক প্রতিযোগিতা বা ক্লিকবেইট সংস্কৃতির কাছে বস্তুনিরপেক্ষতা যেন হেরে না যায়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। গণমাধ্যমের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে জনগণের আস্থার ওপর; আর সেই আস্থা অর্জিত হয় তথ্যের নির্ভুলতা ও পেশাগত সততার মাধ্যমে।বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অসত্য বা অসত্যে ঘেরা তথ্যের প্রভাব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অসংবেদনশীল ঘটনা কিংবা সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সামাজিকভাবে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার নজির নতুন নয়। এসব অপতথ্য প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত পদক্ষেপের চেয়েও বেশি প্রয়োজন সংবাদমাধ্যমের সত্যনিষ্ঠতা, সঠিক তথ্য যাচাইয়ের সামাজিক সংস্কৃতি ও নাগরিকদের পরিপক্কতা। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো—সরকারি তথ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করা এবং সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ বজায় রাখা। অপতথ্য দমনের অজুহাতে স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর আঘাত কিংবা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার যেকোনো প্রয়াস যেমন অনাকাঙ্ক্ষিত, তেমনি স্বাধীনতার নাম দিয়ে দায়িত্বহীনভাবে অসত্য ছড়ানোও কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।ইউনেস্কোর বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও তথ্য সাক্ষরতা সপ্তাহের মূল বার্তাকে কোনো নির্দিষ্ট দিন বা সপ্তাহের মধ্যে বন্দি না রেখে, একে নাগরিক সংস্কৃতির নিয়মিত চর্চায় পরিণত করতে হবে। তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকাই হলো একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয়। একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে স্বাধীন গণমাধ্যম, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা এবং সচেতন নাগরিক সমাজের ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় সাধন অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্রকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তরিক হতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে তাদের নীতি ও জবাবদিহিতায় অবিচল থাকতে হবে, আর নাগরিককে হতে হবে তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল।