কালো গাড়িটার দরজা ধীরে ধীরে খুলল।
একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক নেমে এলেন। পরিপাটি সাদা পাঞ্জাবি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখে কঠোরতা থাকলেও চোখে ছিল অদ্ভুত এক ক্লান্তি।
মেহরিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
ভদ্রলোক ধীরে বললেন,
— চলো, অনেক রাত হয়েছে।
মেহরিন নড়ল না।
আরিয়ান সামনে এসে দাঁড়াল।
— আপনি কে?
লোকটি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন,
— আমি মেহরিনের মামা।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করলেন,
— ওর মা মারা যাওয়ার আগে ওকে আমার কাছেই রেখে গিয়েছিলেন।
আরিয়ানের মনে হাজারটা প্রশ্ন।
— তাহলে ওকে নিয়ে যেতে চাইছেন কেন?
ভদ্রলোক উত্তর দিলেন না।
বরং মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— যে সত্যিটা এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম, আজ আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।
সেদিন রাতেই সবাই বসেছিল জমিদারবাড়ির পুরোনো বারান্দায়।
রহিম চাচাও ছিলেন।
চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
মেহরিনের মামা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
পঁচিশ বছর আগে তোমার বাবা এই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাননি। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। গ্রামের কিছু প্রভাবশালী লোকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
তারপর?
মেহরিন কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
তারপর তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা হয়। তিনি বুঝতে পারেন, থাকলে শুধু তাঁর নয়, তোমার আর তোমার মায়ের জীবনও বিপদে পড়বে। তাই এক রাতে কাউকে কিছু না বলে চলে যান।
মেহরিনের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
তিনি কি... বেঁচে আছেন?
লোকটি ধীরে মাথা নাড়লেন।
না। পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন।
চারদিকে যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল।
মেহরিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আরিয়ান কোনো কথা বলল না।
শুধু খুব আস্তে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
কখনো কখনো নীরব উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
পরদিন সকাল।
মেহরিন নদীর পাড়ে একা বসেছিল।
হাতে বাবার পুরোনো ডায়েরি।
আরিয়ান পাশে এসে বসল।
দীর্ঘক্ষণ কেউ কথা বলল না।
হঠাৎ মেহরিন বলল,
— জানো, আমি বাবাকে খুঁজতে এসেছিলাম।
হ্যাঁ।
কিন্তু... এখানে এসে অন্য কাউকে খুঁজে পেলাম।
আরিয়ান তাকিয়ে রইল।
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
— একটা মানুষ, যার পাশে দাঁড়ালে পৃথিবীটা একটু কম ভয়ংকর লাগে।
সেদিন বিকেলে পুরো গ্রামের মানুষ জমায়েত হলো নদীর ধারে।
রহিম চাচা, করিম চা-ওয়ালা, স্কুলের বাচ্চারা, পাশের বাড়ির খালা, সবাই।
করিম হাসতে হাসতে বলল,
— শহরের মেয়ে, এখন আর শহরে যাবে না তো?
সবাই হেসে উঠল।
মেহরিনও হেসে বলল,
— জানি না।
কিন্তু তার চোখ অন্য কথা বলছিল।
দিন কেটে যেতে লাগল।
বর্ষা শেষ হলো।
কাশফুল ফুটল।
নদীর পানি কমতে শুরু করল।
আরিয়ান আর মেহরিনের সম্পর্কও ধীরে ধীরে নাম পেল।
ভালোবাসা।
কেউ কাউকে প্রস্তাব দেয়নি।
তবু গ্রামের সবাই জানত—
এই দু'জন মানুষ একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।
এক সন্ধ্যায়...
আরিয়ান মেহরিনকে নিয়ে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে গেল, যেখানে প্রথম দিন সে একা বসেছিল।
হাতে একটা ছোট্ট বাক্স।
মেহরিন অবাক।
— এটা কী?
আরিয়ান বাক্সটা খুলল।
ভেতরে কোনো আংটি নেই।
একটা পুরোনো শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুল।
সেই ফুল।
যেটা প্রথম দেখা হওয়ার দিন মেহরিনের বই থেকে পড়ে গিয়েছিল।
আরিয়ান বলল,
— আংটি সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। সোনা পুরোনো হয়। কিন্তু এই ফুলটা আমাকে মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা শুরু হয়েছিল খুব ছোট্ট একটা মুহূর্ত থেকে।
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
সে আস্তে করে বলল,
— আমি যদি কোনোদিন আবার হারিয়ে যাই?
আরিয়ান হেসে উত্তর দিল,
— তাহলে আবার খুঁজে নেব।
সেই মুহূর্তে...
মেহরিন প্রথমবার নিজের ইচ্ছায় আরিয়ানের হাত ধরে বলল,
— আমি আর কোথাও যেতে চাই না।
নদীর ওপাশে সূর্য ডুবছিল।
হাওয়ায় কৃষ্ণচূড়ার ফুল উড়ছিল।
গ্রামের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল।
মনে হচ্ছিল—
প্রকৃতিও যেন তাদের জন্য দোয়া করছে।
চন্দ্রপুর বদলে গেছে।
জমিদারবাড়ির এক অংশে এখন একটা ছোট্ট পাঠাগার।
মেহরিন গ্রামের মেয়েদের নিয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছে।
আরিয়ান সন্ধ্যায় বাচ্চাদের গান শেখায়।
করিমের চায়ের দোকানে এখনো আড্ডা বসে।
রহিম চাচা এখনো প্রতিদিন নদীর ধারে হাঁটেন।
সবকিছু যেন সুন্দর।
খুব সুন্দর।
একদিন বিকেলে...
মেহরিন পাঠাগার গুছাচ্ছিল।
একটা পুরোনো বইয়ের ভেতর থেকে একটা হলদে হয়ে যাওয়া খাম পড়ে গেল।
খামের ওপর লেখা—
মেহরিনের জন্য—
হাতের লেখা...
ঠিক তার বাবার ডায়েরির মতো।
মেহরিনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে তাড়াতাড়ি খামটা খুলল।
ভেতরে মাত্র একটা কাগজ।
সেখানে লেখা—
তুমি যদি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝবে আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। কিন্তু একটা সত্য আমি তোমার কাছেও লুকিয়ে রেখেছিলাম। তোমার জন্মের গল্পটা তুমি যা জানো... তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। সত্যিটা লুকিয়ে আছে সেই মানুষের কাছে, যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো...
চিঠিটা এখানেই শেষ।
আর কোনো নাম নেই।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরিয়ানের কণ্ঠ ভেসে এল—
— মেহরিন... কোথায় তুমি?
মেহরিন কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার হাত কাঁপছে।
মুখে একসঙ্গে বিস্ময়, ভয় আর অজস্র প্রশ্ন।
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাল—
বিষয় : গল্প

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ জুলাই ২০২৬
রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
কালো গাড়িটার দরজা ধীরে ধীরে খুলল।
একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক নেমে এলেন। পরিপাটি সাদা পাঞ্জাবি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। মুখে কঠোরতা থাকলেও চোখে ছিল অদ্ভুত এক ক্লান্তি।
মেহরিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
ভদ্রলোক ধীরে বললেন,
— চলো, অনেক রাত হয়েছে।
মেহরিন নড়ল না।
আরিয়ান সামনে এসে দাঁড়াল।
— আপনি কে?
লোকটি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন,
— আমি মেহরিনের মামা।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করলেন,
— ওর মা মারা যাওয়ার আগে ওকে আমার কাছেই রেখে গিয়েছিলেন।
আরিয়ানের মনে হাজারটা প্রশ্ন।
— তাহলে ওকে নিয়ে যেতে চাইছেন কেন?
ভদ্রলোক উত্তর দিলেন না।
বরং মেহরিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— যে সত্যিটা এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম, আজ আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।
সেদিন রাতেই সবাই বসেছিল জমিদারবাড়ির পুরোনো বারান্দায়।
রহিম চাচাও ছিলেন।
চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
মেহরিনের মামা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
পঁচিশ বছর আগে তোমার বাবা এই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাননি। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক ছিলেন। গ্রামের কিছু প্রভাবশালী লোকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।
তারপর?
মেহরিন কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
তারপর তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা হয়। তিনি বুঝতে পারেন, থাকলে শুধু তাঁর নয়, তোমার আর তোমার মায়ের জীবনও বিপদে পড়বে। তাই এক রাতে কাউকে কিছু না বলে চলে যান।
মেহরিনের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
তিনি কি... বেঁচে আছেন?
লোকটি ধীরে মাথা নাড়লেন।
না। পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন।
চারদিকে যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল।
মেহরিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
আরিয়ান কোনো কথা বলল না।
শুধু খুব আস্তে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
কখনো কখনো নীরব উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।
পরদিন সকাল।
মেহরিন নদীর পাড়ে একা বসেছিল।
হাতে বাবার পুরোনো ডায়েরি।
আরিয়ান পাশে এসে বসল।
দীর্ঘক্ষণ কেউ কথা বলল না।
হঠাৎ মেহরিন বলল,
— জানো, আমি বাবাকে খুঁজতে এসেছিলাম।
হ্যাঁ।
কিন্তু... এখানে এসে অন্য কাউকে খুঁজে পেলাম।
আরিয়ান তাকিয়ে রইল।
মেহরিন মৃদু হেসে বলল,
— একটা মানুষ, যার পাশে দাঁড়ালে পৃথিবীটা একটু কম ভয়ংকর লাগে।
সেদিন বিকেলে পুরো গ্রামের মানুষ জমায়েত হলো নদীর ধারে।
রহিম চাচা, করিম চা-ওয়ালা, স্কুলের বাচ্চারা, পাশের বাড়ির খালা, সবাই।
করিম হাসতে হাসতে বলল,
— শহরের মেয়ে, এখন আর শহরে যাবে না তো?
সবাই হেসে উঠল।
মেহরিনও হেসে বলল,
— জানি না।
কিন্তু তার চোখ অন্য কথা বলছিল।
দিন কেটে যেতে লাগল।
বর্ষা শেষ হলো।
কাশফুল ফুটল।
নদীর পানি কমতে শুরু করল।
আরিয়ান আর মেহরিনের সম্পর্কও ধীরে ধীরে নাম পেল।
ভালোবাসা।
কেউ কাউকে প্রস্তাব দেয়নি।
তবু গ্রামের সবাই জানত—
এই দু'জন মানুষ একে অপরকে ছাড়া অসম্পূর্ণ।
এক সন্ধ্যায়...
আরিয়ান মেহরিনকে নিয়ে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে গেল, যেখানে প্রথম দিন সে একা বসেছিল।
হাতে একটা ছোট্ট বাক্স।
মেহরিন অবাক।
— এটা কী?
আরিয়ান বাক্সটা খুলল।
ভেতরে কোনো আংটি নেই।
একটা পুরোনো শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুল।
সেই ফুল।
যেটা প্রথম দেখা হওয়ার দিন মেহরিনের বই থেকে পড়ে গিয়েছিল।
আরিয়ান বলল,
— আংটি সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। সোনা পুরোনো হয়। কিন্তু এই ফুলটা আমাকে মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসা শুরু হয়েছিল খুব ছোট্ট একটা মুহূর্ত থেকে।
মেহরিনের চোখ ভিজে উঠল।
সে আস্তে করে বলল,
— আমি যদি কোনোদিন আবার হারিয়ে যাই?
আরিয়ান হেসে উত্তর দিল,
— তাহলে আবার খুঁজে নেব।
সেই মুহূর্তে...
মেহরিন প্রথমবার নিজের ইচ্ছায় আরিয়ানের হাত ধরে বলল,
— আমি আর কোথাও যেতে চাই না।
নদীর ওপাশে সূর্য ডুবছিল।
হাওয়ায় কৃষ্ণচূড়ার ফুল উড়ছিল।
গ্রামের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছিল।
মনে হচ্ছিল—
প্রকৃতিও যেন তাদের জন্য দোয়া করছে।
চন্দ্রপুর বদলে গেছে।
জমিদারবাড়ির এক অংশে এখন একটা ছোট্ট পাঠাগার।
মেহরিন গ্রামের মেয়েদের নিয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করেছে।
আরিয়ান সন্ধ্যায় বাচ্চাদের গান শেখায়।
করিমের চায়ের দোকানে এখনো আড্ডা বসে।
রহিম চাচা এখনো প্রতিদিন নদীর ধারে হাঁটেন।
সবকিছু যেন সুন্দর।
খুব সুন্দর।
একদিন বিকেলে...
মেহরিন পাঠাগার গুছাচ্ছিল।
একটা পুরোনো বইয়ের ভেতর থেকে একটা হলদে হয়ে যাওয়া খাম পড়ে গেল।
খামের ওপর লেখা—
মেহরিনের জন্য—
হাতের লেখা...
ঠিক তার বাবার ডায়েরির মতো।
মেহরিনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে তাড়াতাড়ি খামটা খুলল।
ভেতরে মাত্র একটা কাগজ।
সেখানে লেখা—
তুমি যদি এই চিঠি পড়ে থাকো, তাহলে বুঝবে আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। কিন্তু একটা সত্য আমি তোমার কাছেও লুকিয়ে রেখেছিলাম। তোমার জন্মের গল্পটা তুমি যা জানো... তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। সত্যিটা লুকিয়ে আছে সেই মানুষের কাছে, যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করো...
চিঠিটা এখানেই শেষ।
আর কোনো নাম নেই।
কোনো ব্যাখ্যা নেই।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আরিয়ানের কণ্ঠ ভেসে এল—
— মেহরিন... কোথায় তুমি?
মেহরিন কাগজটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার হাত কাঁপছে।
মুখে একসঙ্গে বিস্ময়, ভয় আর অজস্র প্রশ্ন।
সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাল—

আপনার মতামত লিখুন