মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

গোপালগঞ্জ পুলিশ লাইন্সে মাস্টার প্যারেড ও কল্যাণসভা অনুষ্ঠিত

গোপালগঞ্জ পুলিশ লাইন্সে মাস্টার প্যারেড ও কল্যাণসভা অনুষ্ঠিত

কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়ায় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি: সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান

কোটালীপাড়া ও টুঙ্গিপাড়ায় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি: সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান

মুকসুদপুরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত

মুকসুদপুরে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মায় দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ ভাঙন: বিলীন ৫০০ বিঘা আবাদি জমি

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মায় দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ ভাঙন: বিলীন ৫০০ বিঘা আবাদি জমি

গোপালগঞ্জে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

গোপালগঞ্জে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত

ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে মুকসুদপুরে মাঠ পর্যায়ের সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ ও ল্যাপটপ প্রদান

ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে মুকসুদপুরে মাঠ পর্যায়ের সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ ও ল্যাপটপ প্রদান

মুকসুদপুরে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মতবিনিময় সভা

মুকসুদপুরে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মতবিনিময় সভা

মেহেরপুরের গাংনীতে ঘন কুয়াশায় নামল শীতের আমেজ, সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন

মেহেরপুরের গাংনীতে ঘন কুয়াশায় নামল শীতের আমেজ, সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন

বর্ষায় প্রাণ ফিরে পায় পিরোজপুরের আটঘর নৌকার হাট, কেনাবেচায় ভাটার টান

দেড় শ বছরের ঐতিহ্যে আটঘরের ভাসমান নৌকার হাট, খরচ বাড়ায় দুশ্চিন্তায় কারিগরেরা

দেড় শ বছরের ঐতিহ্যে আটঘরের ভাসমান নৌকার হাট, খরচ বাড়ায় দুশ্চিন্তায় কারিগরেরা
খালের পাড়ে বেঁধে রাখা হয়েছে সারি সারি ডিঙি নৌকা। ছবি: সংগৃহীত

সারি সারি কাঠের তৈরি ডিঙি নৌকা বাঁধা রয়েছে খালের দু’পাশে। ছোট খাল বেয়ে নৌকা চালিয়ে হাটে আসছেন বিক্রেতারা। বড় নৌকা ও ট্রলারে করেও হাটে আনা হচ্ছে আবহমান বাংলার নদীমাতৃক জীবনের অতি পরিচিত এই জলযান। খালের জলের ঢেউয়ের তালে তালেই হাঁকডাকে চলছে কেনাবেচা।

দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই চোখজুড়ানো দৃশ্য পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর খাল এলাকার। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই খাল এলাকাজুড়ে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান এই হাট জমজমাট হয়ে ওঠে। এই খালে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ভোরে বসে বিশেষ ডিঙি নৌকার হাট, যা চলে দুপুর পর্যন্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের জেলা ও দূরদূরান্ত থেকেও প্রচুর মানুষ এখানে আসেন পছন্দের নৌকা কিনতে।

নৌকা ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, নদী ও খালবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, কৃষিকাজ ও মাছ ধরার বাহন হিসেবে নৌকার কদর এখনো ফুরিয়ে যায়নি। প্রতি হাটে আটঘর এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে শত শত নৌকা ওঠে। তবে বর্তমানে কাঠ, পেরেক ও কারিগরের দৈনিক মজুরিসহ সব ধরনের উপাদান ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। ফলে লাভ কমে গিয়ে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে।

শুক্রবার সকালে উপজেলার বলদিয়া এলাকা থেকে হাটে ৩৫টি নৌকা নিয়ে এসেছিলেন কামরুল ইসলাম। তিনি বিষণ্ণ মনে বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে এই হাটে নৌকা বিক্রি করি। বর্ষাকালে হাটে ক্রেতা বেশি থাকে, তবে এবার বিক্রি অনেকটাই কম। সকাল থেকে ৩৫টি নৌকার মধ্যে মাত্র একটি বিক্রি করতে পেরেছি। বর্তমানে ৯ হাতের একটি নৌকা তিন হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আরেক ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম জানান, একটি ভালো মানের ৯ হাত দৈর্ঘ্যরে নৌকা তৈরিতে একজন দক্ষ কারিগরের দুই দিন সময় লাগে। দিনে ৮০০ টাকা মজুরি হিসেবে শুধু শ্রমিক খরচই পড়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা। এছাড়া কাঠের খরচ প্রায় দুই হাজার টাকা। সব মিলিয়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি করলেও মুনাফা নামমাত্র থাকে।

তবে হাটে আসা কিছু ক্রেতার কাছে দাম তুলনামূলক কিছুটা সহনীয় মনে হয়েছে। উপজেলার বিনয়কাঠি গ্রাম থেকে আসা আজিজ হাওলাদার বলেন, মাছ ধরার কাজের জন্য একটি ডিঙি নৌকা কিনতে এসেছি। গত বছরের তুলনায় নৌকার দাম কিছুটা কম মনে হচ্ছে। আড়াই হাজার টাকার মধ্যে পছন্দসই একটি নৌকা কিনে নেব।

শুধুমাত্র কেনাবেচাই নয়, দেড় শ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী হাটের রূপ দেখতে ভিড় করছেন দূরদূরান্তের দর্শনার্থীরাও। হাটে ঘুরতে আসা দুই গৃহিণী ফাতেমা ও সুরাইয়া নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, অনেক দিনের শখ ছিল ভাসমান নৌকার হাট দেখার। সরাসরি এসে খালের মধ্যে সারি সারি নৌকা আর এত মানুষের আনাগোনা দেখে খুব ভালো লাগছে।

হাটের ইজারা আদায়ের দায়িত্বে থাকা মো. ইকবাল জানান, নৌকাপ্রতি ১০০ টাকায় ১২ টাকা হারে সরকারি খাজনা নির্ধারণ করা রয়েছে। অনেকের সুবিধার্থে এর চেয়েও কম নেওয়া হয়। তবে এবার বেচাকেনা আগের চেয়ে কম হলেও প্রতি হাটে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকা বিক্রি হচ্ছে।

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি হাটে প্রায় ২০০টির মতো নৌকা বেচাকেনা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য অন্তত ১০ লাখ টাকা। প্রতিবছর কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে হাট ইজারা নেওয়া হলেও অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত ক্রেতা-বিক্রেতার জন্য হাটে কোনো শৌচাগার বা পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার নেই। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাঁদের।


স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রায় ১৫০ বছর আগে গোড়াপত্তন হওয়া এই আটঘর হাট শুধু একটি কেনাবেচার স্থান নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ জীবন, জীবিকা ও নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতির এক অনন্য জীবন্ত দলিল। কালের নিয়মে নৌকার ব্যবহার কিছুটা কমলেও প্রয়োজন আর ঐতিহ্যের টানে এখনো সগৌরবে টিকে আছে আটঘরের এই ঐতিহ্যবাহী ভাসমান হাট।

বিষয় : জেলার খবর পিরোজপুর বরিশাল বিভাগ নেছারাবাদ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


দেড় শ বছরের ঐতিহ্যে আটঘরের ভাসমান নৌকার হাট, খরচ বাড়ায় দুশ্চিন্তায় কারিগরেরা

প্রকাশের তারিখ : ১৪ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সারি সারি কাঠের তৈরি ডিঙি নৌকা বাঁধা রয়েছে খালের দু’পাশে। ছোট খাল বেয়ে নৌকা চালিয়ে হাটে আসছেন বিক্রেতারা। বড় নৌকা ও ট্রলারে করেও হাটে আনা হচ্ছে আবহমান বাংলার নদীমাতৃক জীবনের অতি পরিচিত এই জলযান। খালের জলের ঢেউয়ের তালে তালেই হাঁকডাকে চলছে কেনাবেচা।

দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই চোখজুড়ানো দৃশ্য পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার আটঘর খাল এলাকার। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই খাল এলাকাজুড়ে ঐতিহ্যবাহী ভাসমান এই হাট জমজমাট হয়ে ওঠে। এই খালে সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ভোরে বসে বিশেষ ডিঙি নৌকার হাট, যা চলে দুপুর পর্যন্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের জেলা ও দূরদূরান্ত থেকেও প্রচুর মানুষ এখানে আসেন পছন্দের নৌকা কিনতে।

নৌকা ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, নদী ও খালবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, কৃষিকাজ ও মাছ ধরার বাহন হিসেবে নৌকার কদর এখনো ফুরিয়ে যায়নি। প্রতি হাটে আটঘর এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে শত শত নৌকা ওঠে। তবে বর্তমানে কাঠ, পেরেক ও কারিগরের দৈনিক মজুরিসহ সব ধরনের উপাদান ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে। ফলে লাভ কমে গিয়ে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে।

শুক্রবার সকালে উপজেলার বলদিয়া এলাকা থেকে হাটে ৩৫টি নৌকা নিয়ে এসেছিলেন কামরুল ইসলাম। তিনি বিষণ্ণ মনে বলেন, প্রায় ৩০ বছর ধরে এই হাটে নৌকা বিক্রি করি। বর্ষাকালে হাটে ক্রেতা বেশি থাকে, তবে এবার বিক্রি অনেকটাই কম। সকাল থেকে ৩৫টি নৌকার মধ্যে মাত্র একটি বিক্রি করতে পেরেছি। বর্তমানে ৯ হাতের একটি নৌকা তিন হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আরেক ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম জানান, একটি ভালো মানের ৯ হাত দৈর্ঘ্যরে নৌকা তৈরিতে একজন দক্ষ কারিগরের দুই দিন সময় লাগে। দিনে ৮০০ টাকা মজুরি হিসেবে শুধু শ্রমিক খরচই পড়ে ১ হাজার ৬০০ টাকা। এছাড়া কাঠের খরচ প্রায় দুই হাজার টাকা। সব মিলিয়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি করলেও মুনাফা নামমাত্র থাকে।

তবে হাটে আসা কিছু ক্রেতার কাছে দাম তুলনামূলক কিছুটা সহনীয় মনে হয়েছে। উপজেলার বিনয়কাঠি গ্রাম থেকে আসা আজিজ হাওলাদার বলেন, মাছ ধরার কাজের জন্য একটি ডিঙি নৌকা কিনতে এসেছি। গত বছরের তুলনায় নৌকার দাম কিছুটা কম মনে হচ্ছে। আড়াই হাজার টাকার মধ্যে পছন্দসই একটি নৌকা কিনে নেব।

শুধুমাত্র কেনাবেচাই নয়, দেড় শ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী হাটের রূপ দেখতে ভিড় করছেন দূরদূরান্তের দর্শনার্থীরাও। হাটে ঘুরতে আসা দুই গৃহিণী ফাতেমা ও সুরাইয়া নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, অনেক দিনের শখ ছিল ভাসমান নৌকার হাট দেখার। সরাসরি এসে খালের মধ্যে সারি সারি নৌকা আর এত মানুষের আনাগোনা দেখে খুব ভালো লাগছে।

হাটের ইজারা আদায়ের দায়িত্বে থাকা মো. ইকবাল জানান, নৌকাপ্রতি ১০০ টাকায় ১২ টাকা হারে সরকারি খাজনা নির্ধারণ করা রয়েছে। অনেকের সুবিধার্থে এর চেয়েও কম নেওয়া হয়। তবে এবার বেচাকেনা আগের চেয়ে কম হলেও প্রতি হাটে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি নৌকা বিক্রি হচ্ছে।

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি হাটে প্রায় ২০০টির মতো নৌকা বেচাকেনা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য অন্তত ১০ লাখ টাকা। প্রতিবছর কয়েক লাখ টাকা রাজস্ব দিয়ে হাট ইজারা নেওয়া হলেও অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত ক্রেতা-বিক্রেতার জন্য হাটে কোনো শৌচাগার বা পর্যাপ্ত বিশ্রামাগার নেই। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় তাঁদের।


স্থানীয় প্রবীণদের মতে, প্রায় ১৫০ বছর আগে গোড়াপত্তন হওয়া এই আটঘর হাট শুধু একটি কেনাবেচার স্থান নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ জীবন, জীবিকা ও নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতির এক অনন্য জীবন্ত দলিল। কালের নিয়মে নৌকার ব্যবহার কিছুটা কমলেও প্রয়োজন আর ঐতিহ্যের টানে এখনো সগৌরবে টিকে আছে আটঘরের এই ঐতিহ্যবাহী ভাসমান হাট।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো