সাধারণ পর্যটকদের কাছে সাজেক মানেই মেঘের রাজ্য, পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য আর নির্জন প্রকৃতির এক স্বর্গীয় অনুভূতি। কিন্তু এই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, ভূমির অধিকার নিয়ে বিরোধ, অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং গভীর নিরাপত্তাহীনতার এক জটিল বাস্তবতা। সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় সাজেকের এই বহুমুখী সংকট আবারও তীব্রভাবে সামনে চলে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং সাজেক এলাকা থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের অপসারণের দাবিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন-এর যৌথ আহ্বানে গত বৃহস্পতিবার থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ শুরু হয়। এই অবরোধ চলাকালে বৃহস্পতিবার সকালে সাজেকের উজোবাজার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিব গণমাধ্যমকে এই সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে গোলাগুলিতে অংশ নেওয়া সশস্ত্র ব্যক্তিদের সাংগঠনিক পরিচয় এবং হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতির অবনতি ও বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতে জেলা প্রশাসন গত ২১ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকেই সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের ২২ অক্টোবর বিকেল চারটার মধ্যে নিরাপদে এলাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে বৃহস্পতিবার সকালে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় ফেরার পথে প্রায় দুই হাজার পর্যটক উজোবাজার এলাকায় অবরোধের কারণে সাময়িকভাবে আটকা পড়েন। পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেওয়ার পর পর্যটকবাহী গাড়ি চলাচল শুরু হলেও নতুন করে গোলাগুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সাজেকের এই বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কাঠামোগত বিরোধ। স্থানীয় আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গত ৩০ আগস্ট থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের সশস্ত্র সদস্যরা নতুন করে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি ও জুমচাষে বাধা সৃষ্টি করছে। যদিও জেএসএস এই অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই প্রধান আঞ্চলিক শক্তি জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যকার এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সাজেক অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বারবার বিঘ্নিত করছে।
পাশাপাশি সাজেকের ক্রমবর্ধমান পর্যটন অর্থনীতিও এই সংঘাতের আরেকটি বড় অনুঘটক। পর্যটনকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রিসোর্ট, কটেজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদা আদায়ের অভিযোগ নিয়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রথাগত ভূমি অধিকার, জুমচাষের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকার প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাজেক সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা কিংবা সাময়িক অবরোধ প্রত্যাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সশস্ত্র তৎপরতার নিরপেক্ষ তদন্ত, স্থানীয় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমেই কেবল মেঘের রাজ্যের এই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দূর করা সম্ভব।

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬
সাধারণ পর্যটকদের কাছে সাজেক মানেই মেঘের রাজ্য, পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য আর নির্জন প্রকৃতির এক স্বর্গীয় অনুভূতি। কিন্তু এই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, ভূমির অধিকার নিয়ে বিরোধ, অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত এবং গভীর নিরাপত্তাহীনতার এক জটিল বাস্তবতা। সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় সাজেকের এই বহুমুখী সংকট আবারও তীব্রভাবে সামনে চলে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং সাজেক এলাকা থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের অপসারণের দাবিতে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন-এর যৌথ আহ্বানে গত বৃহস্পতিবার থেকে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ শুরু হয়। এই অবরোধ চলাকালে বৃহস্পতিবার সকালে সাজেকের উজোবাজার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিব গণমাধ্যমকে এই সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে গোলাগুলিতে অংশ নেওয়া সশস্ত্র ব্যক্তিদের সাংগঠনিক পরিচয় এবং হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতির অবনতি ও বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতে জেলা প্রশাসন গত ২১ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকেই সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের ২২ অক্টোবর বিকেল চারটার মধ্যে নিরাপদে এলাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে বৃহস্পতিবার সকালে নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় ফেরার পথে প্রায় দুই হাজার পর্যটক উজোবাজার এলাকায় অবরোধের কারণে সাময়িকভাবে আটকা পড়েন। পরবর্তীতে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেওয়ার পর পর্যটকবাহী গাড়ি চলাচল শুরু হলেও নতুন করে গোলাগুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সাজেকের এই বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কাঠামোগত বিরোধ। স্থানীয় আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গত ৩০ আগস্ট থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের সশস্ত্র সদস্যরা নতুন করে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি ও জুমচাষে বাধা সৃষ্টি করছে। যদিও জেএসএস এই অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই প্রধান আঞ্চলিক শক্তি জেএসএস ও ইউপিডিএফের মধ্যকার এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াই সাজেক অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বারবার বিঘ্নিত করছে।
পাশাপাশি সাজেকের ক্রমবর্ধমান পর্যটন অর্থনীতিও এই সংঘাতের আরেকটি বড় অনুঘটক। পর্যটনকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা রিসোর্ট, কটেজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদা আদায়ের অভিযোগ নিয়ে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রথাগত ভূমি অধিকার, জুমচাষের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকার প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাজেক সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা কিংবা সাময়িক অবরোধ প্রত্যাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সশস্ত্র তৎপরতার নিরপেক্ষ তদন্ত, স্থানীয় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমেই কেবল মেঘের রাজ্যের এই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা দূর করা সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন