বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে নদীর জলে মিশে যাচ্ছিল। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল মলিন কমলা রঙ, যেন দিনটা বিদায়ের আগে শেষবারের মতো পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখতে চাইছে। নদীর পাড়ের পুরোনো ঘাটটায় আজও তেমন ভিড় নেই। শুধু হালকা বাতাস, দূরের নৌকার ক্ষীণ শব্দ আর কিছু না বলা অনুভূতির ভার।
ঘাটের শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল মেহরাব।
এক হাতে ছোট্ট কালো ব্যাগ, অন্য হাতটা পকেটে গুঁজে রেখেছে। মুখে অদ্ভুত এক শান্ত নীরবতা, অথচ চোখের ভেতর জমে আছে অনেক ক্লান্তি।
আজ চলে যাওয়ার কথা তার।
হয়তো এই শহর থেকে, হয়তো কিছু সম্পর্ক থেকে—কিংবা হয়তো নিজের ভেতর জমে থাকা কিছু স্মৃতি থেকে।
তবুও পা দুটো যেন এগোতে চাইছিল না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— এত চুপচাপ চলে যাচ্ছেন?
মেহরাব ধীরে পেছনে তাকালো।
নীলা দাঁড়িয়ে আছে। হালকা নীল শাড়ি, এলোমেলো চুল, চোখে ক্লান্ত এক মায়া। মনে হচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু সাহস করে সামনে আসতে পারছিল না।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।
শুধু নদীর বাতাস এসে দু’জনের মাঝের নীরবতাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
মেহরাব ম্লান হেসে বলল,
— তুমি তো বলেছিলে, আমাকে ছাড়া থাকতে শিখে গেছো।
নীলা মাথা নিচু করল।
তার ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছিল না।
অনেকক্ষণ পরে খুব আস্তে বলল,
— মানুষ সবই শিখে যায়।
কিন্তু কিছু অভ্যাস কখনো বদলায় না।
মেহরাব কিছু বলল না।
নীলা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— জানেন, এই শহরটা আগে এত নির্জন লাগতো না।
এখন সবকিছু কেমন ফাঁকা লাগে।
রাস্তা, বিকেল, বৃষ্টি—এমনকি প্রিয় গানগুলোও।
মেহরাব এবার তাকালো নীলার দিকে।
নীলার চোখদুটো ভিজে উঠেছে। সেখানে জমে আছে অসংখ্য রাতের না বলা কান্না।
সে খুব ধীরে বলল,
— আপনি চলে যাওয়ার পর বুঝেছি,কিছু মানুষকে দূরে রাখা যায়, কিন্তু ভুলে থাকা যায় না।
নদীর ওপার থেকে একটা নৌকা ভেসে যাচ্ছিল। সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে আসছিল।
মেহরাব হঠাৎ খুব শান্ত গলায় বলল,
— তাহলে সেদিন এত সহজে যেতে বললে কেন?
নীলা হেসে ফেলল।
একটা ভাঙা, ক্লান্ত হাসি।
— কারণ ভালোবাসলে মাঝে মাঝে ছেড়ে দিতেও হয়।
আমি ভেবেছিলাম আপনি ভালো থাকবেন।
— আর তুমি?
প্রশ্নটা শুনে নীলা চুপ হয়ে গেল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— আমি তো এখনও ওই দিনটাতেই আটকে আছি। যেদিন আপনি প্রথমবার বলেছিলেন, চলো, নদীর ধারে একটু হাঁটি।
চারদিক নিস্তব্ধ।
শুধু বাতাসে কাশফুল দুলছে।
মেহরাব অনুভব করল, এতদিনের অভিমানগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে। কিছু দূরত্ব আসলে ইচ্ছে করে তৈরি করা হয়, যাতে মানুষ বুঝতে পারে— কার অনুপস্থিতি সত্যিই কষ্ট দেয়।
সে ধীরে নিজের ব্যাগটা নিচে নামিয়ে রাখল।
নীলা অবাক হয়ে তাকালো।
— কী হলো?
মেহরাব মৃদু হেসে বলল,
— জানি না।
হয়তো কিছু পথ একা হাঁটার জন্য না।
নীলার চোখ ভিজে উঠল আবার।
কিন্তু এবার সেই চোখে কষ্টের চেয়ে শান্তি বেশি।
তারপর দু’জন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল নদীর পাশ দিয়ে।
সন্ধ্যার শেষ আলো তাদের ছায়াগুলো লম্বা করে দিচ্ছিল।
কেউ আর কিছু বলছিল না।
কারণ কিছু অনুভূতি শব্দে বলতে নেই।
শুধু পাশে থাকলেই হয়।
আর নদীর ওপাশে তখন অন্ধকার নেমে আসছিল ধীরে ধীরে—
ঠিক যেমন কিছু গল্প শেষ হয়ে গিয়েও পুরোপুরি শেষ হয় না।
✍️ নাহিদ হোসেন

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
বিকেলের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে নদীর জলে মিশে যাচ্ছিল। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল মলিন কমলা রঙ, যেন দিনটা বিদায়ের আগে শেষবারের মতো পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখতে চাইছে। নদীর পাড়ের পুরোনো ঘাটটায় আজও তেমন ভিড় নেই। শুধু হালকা বাতাস, দূরের নৌকার ক্ষীণ শব্দ আর কিছু না বলা অনুভূতির ভার।
ঘাটের শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল মেহরাব।
এক হাতে ছোট্ট কালো ব্যাগ, অন্য হাতটা পকেটে গুঁজে রেখেছে। মুখে অদ্ভুত এক শান্ত নীরবতা, অথচ চোখের ভেতর জমে আছে অনেক ক্লান্তি।
আজ চলে যাওয়ার কথা তার।
হয়তো এই শহর থেকে, হয়তো কিছু সম্পর্ক থেকে—কিংবা হয়তো নিজের ভেতর জমে থাকা কিছু স্মৃতি থেকে।
তবুও পা দুটো যেন এগোতে চাইছিল না।
ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— এত চুপচাপ চলে যাচ্ছেন?
মেহরাব ধীরে পেছনে তাকালো।
নীলা দাঁড়িয়ে আছে। হালকা নীল শাড়ি, এলোমেলো চুল, চোখে ক্লান্ত এক মায়া। মনে হচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরে সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু সাহস করে সামনে আসতে পারছিল না।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।
শুধু নদীর বাতাস এসে দু’জনের মাঝের নীরবতাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
মেহরাব ম্লান হেসে বলল,
— তুমি তো বলেছিলে, আমাকে ছাড়া থাকতে শিখে গেছো।
নীলা মাথা নিচু করল।
তার ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছিল না।
অনেকক্ষণ পরে খুব আস্তে বলল,
— মানুষ সবই শিখে যায়।
কিন্তু কিছু অভ্যাস কখনো বদলায় না।
মেহরাব কিছু বলল না।
নীলা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল। তারপর নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— জানেন, এই শহরটা আগে এত নির্জন লাগতো না।
এখন সবকিছু কেমন ফাঁকা লাগে।
রাস্তা, বিকেল, বৃষ্টি—এমনকি প্রিয় গানগুলোও।
মেহরাব এবার তাকালো নীলার দিকে।
নীলার চোখদুটো ভিজে উঠেছে। সেখানে জমে আছে অসংখ্য রাতের না বলা কান্না।
সে খুব ধীরে বলল,
— আপনি চলে যাওয়ার পর বুঝেছি,কিছু মানুষকে দূরে রাখা যায়, কিন্তু ভুলে থাকা যায় না।
নদীর ওপার থেকে একটা নৌকা ভেসে যাচ্ছিল। সন্ধ্যা আরও ঘন হয়ে আসছিল।
মেহরাব হঠাৎ খুব শান্ত গলায় বলল,
— তাহলে সেদিন এত সহজে যেতে বললে কেন?
নীলা হেসে ফেলল।
একটা ভাঙা, ক্লান্ত হাসি।
— কারণ ভালোবাসলে মাঝে মাঝে ছেড়ে দিতেও হয়।
আমি ভেবেছিলাম আপনি ভালো থাকবেন।
— আর তুমি?
প্রশ্নটা শুনে নীলা চুপ হয়ে গেল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— আমি তো এখনও ওই দিনটাতেই আটকে আছি। যেদিন আপনি প্রথমবার বলেছিলেন, চলো, নদীর ধারে একটু হাঁটি।
চারদিক নিস্তব্ধ।
শুধু বাতাসে কাশফুল দুলছে।
মেহরাব অনুভব করল, এতদিনের অভিমানগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে। কিছু দূরত্ব আসলে ইচ্ছে করে তৈরি করা হয়, যাতে মানুষ বুঝতে পারে— কার অনুপস্থিতি সত্যিই কষ্ট দেয়।
সে ধীরে নিজের ব্যাগটা নিচে নামিয়ে রাখল।
নীলা অবাক হয়ে তাকালো।
— কী হলো?
মেহরাব মৃদু হেসে বলল,
— জানি না।
হয়তো কিছু পথ একা হাঁটার জন্য না।
নীলার চোখ ভিজে উঠল আবার।
কিন্তু এবার সেই চোখে কষ্টের চেয়ে শান্তি বেশি।
তারপর দু’জন ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল নদীর পাশ দিয়ে।
সন্ধ্যার শেষ আলো তাদের ছায়াগুলো লম্বা করে দিচ্ছিল।
কেউ আর কিছু বলছিল না।
কারণ কিছু অনুভূতি শব্দে বলতে নেই।
শুধু পাশে থাকলেই হয়।
আর নদীর ওপাশে তখন অন্ধকার নেমে আসছিল ধীরে ধীরে—
ঠিক যেমন কিছু গল্প শেষ হয়ে গিয়েও পুরোপুরি শেষ হয় না।
✍️ নাহিদ হোসেন

আপনার মতামত লিখুন