ফরিদপুর যাওয়ার বাসটা তখন মাওয়া রোড পেরিয়ে ছুটে চলেছে। জানালার বাইরে ধূসর আকাশ, মাঝেমধ্যে হালকা বাতাসে উড়ে যাওয়া ধুলা, আর আমার বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
ঘড়ির দিকে বারবার তাকাচ্ছিলাম।
দুপুর একটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই।
দীপা বলেছিল—
— একটার মধ্যে আসবা। আমি অপেক্ষা করবো।
এই অপেক্ষা করবো কথাটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা পুরো পথজুড়ে আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।
বাসটা যখন ফরিদপুরে ঢুকলো, তখন ঠিক একটা বাজে।
আমি তাড়াহুড়ো করে নেমে ফোন বের করলাম।
দীপা আগেই ঠিকানা পাঠিয়েছিল।
সেই ঠিকানা ধরে একটা রিকশা নিয়ে পৌঁছে গেলাম ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টের সামনে।
দূর থেকেই তাকে দেখা যাচ্ছিল।
নীল শাড়ি পরে জানালার পাশের টেবিলে বসে আছে।
চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে।
মুখে অদ্ভুত শান্তি।
আমি ধীরে ধীরে পেছন থেকে গিয়ে তার চোখ দুটো চেপে ধরলাম।
দীপা মৃদু হেসে বললো—
— ছাড়ো… জানি তুমি এসেছো।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
— কীভাবে বুঝলে?
দীপা আস্তে করে আমার হাত ছুঁয়ে বললো—
— কিছু ছোঁয়া মানুষ কোনোদিন ভুলে না।
মুহূর্তটা থেমে গিয়েছিল যেন।
আমি তার সামনে বসতেই সে অভিমানী গলায় বললো—
— অনেক দেরি করছো।
— রাস্তার জ্যাম… কিন্তু আসছি তো।
দীপা হেসে মাথা নিচু করলো।
তারপর বললো—
— চলো, আজ অনেক ঘুরবো।
আমরা একটা রিকশা নিলাম।
রিকশাটা ধীরে ধীরে শহরের ভিড় পেরিয়ে এগোচ্ছিল।
রাস্তার দু’পাশে পুরোনো গাছ, দোকান, মানুষের ব্যস্ততা— আর আমাদের মাঝখানে একরাশ নীরব ভালো লাগা।
আমি হাত বাড়িয়ে ধীরে দীপার হাত ধরলাম।
সে কিছু বললো না।
শুধু হালকা করে হাতটা আরও শক্ত করে ধরলো।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা খুব ছোট।
শুধু আমি, দীপা আর চলতে থাকা একটা বিকেল।
হঠাৎ খেয়াল করলাম দীপা চুপ হয়ে গেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—
— কি হলো?
সে সামনের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললো—
— সামনে আমার চাচা…
আমার বুক ধক করে উঠলো।
রিকশা থামার আগেই একজন মানুষ এগিয়ে এলেন।
কঠিন চোখে দীপার দিকে তাকালেন।
— তুই এখানে?
দীপা কিছু বলতে পারলো না।
আমি তখনও রিকশায় বসে আছি।
মনে হচ্ছিল হাজারটা কথা বুকের ভিতরে আটকে গেছে।
খুব বলতে ইচ্ছে করছিল—
আমি দীপাকে ভালোবাসি।
ওকে কিছুক্ষণ আমার সাথে থাকতে দিন…
কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
দীপা একবার শুধু পেছনে তাকিয়েছিল।
সেই চোখে ভয় ছিল, কষ্ট ছিল, আর ছিল অদ্ভুত এক অসহায়তা।
তারপর সে চলে গেল।
আমি রিকশায় বসে রইলাম অনেকক্ষণ।
রিকশাওয়ালা কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিল—
— ভাই, কোথায় যাবেন?
কিন্তু আমার তখন কোথাও যাওয়ার ছিল না।
শুধু মনে হচ্ছিল, কিছু মানুষ জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে—
তবু তারা পুরো জীবনজুড়ে থেকে যায়।
তারপর কেটে গেছে অনেক বছর।
জীবন বদলেছে।
শহর বদলেছে।
মানুষ বদলেছে।
কিন্তু কিছু দুপুর কখনো পুরোনো হয় না।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল দীপার চাচার সঙ্গে।
তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
— তুমি ইমন না?
আমি থেমে গেলাম।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
— তুমিই তো দীপাকে ভালোবাসতে…
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
শুধু মনে হলো, বুকের ভেতরে বহু বছর আগের সেই দুপুরটা আবার ফিরে এসেছে।
নীল শাড়ি, রিকশা, হাত ধরা আর হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া একটা বিকেল।
আমি ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে লাগলাম।
পেছনে পড়ে রইলো দীপার চাচা।
আর তার থেকেও অনেক দূরে পড়ে রইলো—
আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অথচ অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্পটা।
✍️ নাহিদ হোসেন

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
ফরিদপুর যাওয়ার বাসটা তখন মাওয়া রোড পেরিয়ে ছুটে চলেছে। জানালার বাইরে ধূসর আকাশ, মাঝেমধ্যে হালকা বাতাসে উড়ে যাওয়া ধুলা, আর আমার বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
ঘড়ির দিকে বারবার তাকাচ্ছিলাম।
দুপুর একটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই।
দীপা বলেছিল—
— একটার মধ্যে আসবা। আমি অপেক্ষা করবো।
এই অপেক্ষা করবো কথাটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা পুরো পথজুড়ে আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে।
বাসটা যখন ফরিদপুরে ঢুকলো, তখন ঠিক একটা বাজে।
আমি তাড়াহুড়ো করে নেমে ফোন বের করলাম।
দীপা আগেই ঠিকানা পাঠিয়েছিল।
সেই ঠিকানা ধরে একটা রিকশা নিয়ে পৌঁছে গেলাম ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টের সামনে।
দূর থেকেই তাকে দেখা যাচ্ছিল।
নীল শাড়ি পরে জানালার পাশের টেবিলে বসে আছে।
চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে।
মুখে অদ্ভুত শান্তি।
আমি ধীরে ধীরে পেছন থেকে গিয়ে তার চোখ দুটো চেপে ধরলাম।
দীপা মৃদু হেসে বললো—
— ছাড়ো… জানি তুমি এসেছো।
আমি অবাক হয়ে বললাম—
— কীভাবে বুঝলে?
দীপা আস্তে করে আমার হাত ছুঁয়ে বললো—
— কিছু ছোঁয়া মানুষ কোনোদিন ভুলে না।
মুহূর্তটা থেমে গিয়েছিল যেন।
আমি তার সামনে বসতেই সে অভিমানী গলায় বললো—
— অনেক দেরি করছো।
— রাস্তার জ্যাম… কিন্তু আসছি তো।
দীপা হেসে মাথা নিচু করলো।
তারপর বললো—
— চলো, আজ অনেক ঘুরবো।
আমরা একটা রিকশা নিলাম।
রিকশাটা ধীরে ধীরে শহরের ভিড় পেরিয়ে এগোচ্ছিল।
রাস্তার দু’পাশে পুরোনো গাছ, দোকান, মানুষের ব্যস্ততা— আর আমাদের মাঝখানে একরাশ নীরব ভালো লাগা।
আমি হাত বাড়িয়ে ধীরে দীপার হাত ধরলাম।
সে কিছু বললো না।
শুধু হালকা করে হাতটা আরও শক্ত করে ধরলো।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা খুব ছোট।
শুধু আমি, দীপা আর চলতে থাকা একটা বিকেল।
হঠাৎ খেয়াল করলাম দীপা চুপ হয়ে গেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—
— কি হলো?
সে সামনের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বললো—
— সামনে আমার চাচা…
আমার বুক ধক করে উঠলো।
রিকশা থামার আগেই একজন মানুষ এগিয়ে এলেন।
কঠিন চোখে দীপার দিকে তাকালেন।
— তুই এখানে?
দীপা কিছু বলতে পারলো না।
আমি তখনও রিকশায় বসে আছি।
মনে হচ্ছিল হাজারটা কথা বুকের ভিতরে আটকে গেছে।
খুব বলতে ইচ্ছে করছিল—
আমি দীপাকে ভালোবাসি।
ওকে কিছুক্ষণ আমার সাথে থাকতে দিন…
কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না।
দীপা একবার শুধু পেছনে তাকিয়েছিল।
সেই চোখে ভয় ছিল, কষ্ট ছিল, আর ছিল অদ্ভুত এক অসহায়তা।
তারপর সে চলে গেল।
আমি রিকশায় বসে রইলাম অনেকক্ষণ।
রিকশাওয়ালা কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিল—
— ভাই, কোথায় যাবেন?
কিন্তু আমার তখন কোথাও যাওয়ার ছিল না।
শুধু মনে হচ্ছিল, কিছু মানুষ জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্য আসে—
তবু তারা পুরো জীবনজুড়ে থেকে যায়।
তারপর কেটে গেছে অনেক বছর।
জীবন বদলেছে।
শহর বদলেছে।
মানুষ বদলেছে।
কিন্তু কিছু দুপুর কখনো পুরোনো হয় না।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল দীপার চাচার সঙ্গে।
তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন—
— তুমি ইমন না?
আমি থেমে গেলাম।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
— তুমিই তো দীপাকে ভালোবাসতে…
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
শুধু মনে হলো, বুকের ভেতরে বহু বছর আগের সেই দুপুরটা আবার ফিরে এসেছে।
নীল শাড়ি, রিকশা, হাত ধরা আর হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া একটা বিকেল।
আমি ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে লাগলাম।
পেছনে পড়ে রইলো দীপার চাচা।
আর তার থেকেও অনেক দূরে পড়ে রইলো—
আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অথচ অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্পটা।
✍️ নাহিদ হোসেন

আপনার মতামত লিখুন