মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

রম্য গল্প

মশা মারতে কামান দাগা!

মশা মারতে কামান দাগা!
ছবি : সংগৃহীত

১৭৫৭ সাল। পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর ব্রিটিশদের পা তখন আর মাটিতে পড়ছে না। লর্ড ক্লাইভ ভাবলেন, একটু ভারতীয় উপমহাদেশটা ঘুরে আসা যাক। সেই অনুযায়ী তল্পিতল্পা গুটিয়ে সাহেবরা দলবল নিয়ে এলেন কলকাতা পরিদর্শনে। লর্ড ক্লাইভের আগমন বলে কথা! চারিদিকে বিশাল প্যান্ডেল, রাজকীয় সিংহাসন মার্কা চেয়ার—আয়োজনের কোনো কমতি নেই।

লর্ড ক্লাইভ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে কেবলই তাঁর বিজয়ী বক্তৃতা শুরু করেছেন, ঠিক তখনই তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা হলো। তবে কোনো স্বাধীনতাকামী বাঙালি এই হামলা করেনি, করেছে স্বয়ং বাংলার মশার দল! একটি-দুটি নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে হাজার হাজার মশার কামড়ে লর্ড ক্লাইভ স্ক্রিপ্ট ভুলে চিৎকার করে উঠলেন—

আই উইল ডেস্ট্রয় বেঙ্গল, সরি, প্রোটেক্ট বেঙ্গল অ্যাট অ্যানি কস্ট! ফর গডস সেক, সামওয়ান প্লিজ ব্রিং সাম গানস অ্যান্ড শুট দিস মসকিউটোস!


অবস্থা বেগতিক দেখে ইংরেজরা তড়িঘড়ি করে অনুষ্ঠান শেষ করল। তবে সাহেবদের গায়ে হুল ফোটানোর অপরাধে ঘটনাস্থল থেকে তিন-তিনটি মশাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো।

মশাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড!

পরদিন ব্রিটিশদের তৈরি বিশেষ আদালতে তোলা হলো আসামিদের। লর্ডকে কামড়ানোর অপরাধে আদালত মশা তিনটির সোজা পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন! রিমান্ডের রুমে বসে ছটফট করতে করতে প্রথম মশা অবাক হয়ে বলল, দোস্ত, আমরা আসলে কাকে কামড়ালাম যে আমাদের এভাবে ধরে নিয়ে এল?

দ্বিতীয় মশা ডানা চুলকাতে চুলকাতে জবাব দিল, গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুই হবে রে! দেখিসনি রক্তটা কেমন যেন একটু ভিন্ন স্বাদের ছিল?

তা শুনে তৃতীয় মশা চরম হতাশার গলায় বলল, ধুর শ্লা! ওটা রক্ত ছিল? আমি তো ভাবলাম বাঙ্গির জুস খাচ্ছি। একদমই পানসে!

পরদিন সকালে মস্ত বড় গোঁফওয়ালা এক ইংরেজ জেলার এলেন জিজ্ঞাসাবাদ করতে। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, ইউ টাইনি ব্লাড সাকারস, হাউ ডেয়ার ইউ বাইট আওয়ার লর্ড?

কিন্তু মশার দল তো খাঁটি বাংলা মিডিয়ামের! ইংরেজি না বোঝায় তড়িঘড়ি করে দোভাষী হিসেবে ডেকে আনা হলো ইংরেজদের পরম মিত্র মীর জাফরকে।


মীর জাফরের মাধ্যমে জেলার যখন হুমকি দিলেন যে লর্ডকে কামড়ানোর অপরাধে ওদের ফাঁসি বা যাবজ্জীবন হতে পারে, তখন মশক সমাজ খেপে লাল! তারা যুক্তি দিল, আমরা তো কেবল বেঁচে থাকার জন্য একটু রক্ত চুষি, আপনাদের মতো তো আর যা পাই তা-ই চিবিয়ে গিলি না! আর আপনারা যে কয়েল জ্বালিয়ে, স্প্রে মেরে আমাদের এডিস-অ্যানোফিলিসদের সংসার ধ্বংস করেন, ডানাকাটা পরি বানিয়ে দেন—তার জন্য আমরা কখনো মামলা করেছি? শাস্তি যদি দিতেই হয়, তবে লর্ডকেও বলুন আমাদের কামড় দিতে। হিসাব বরাবর!

এমন সময় স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ সেখানে হাজির হয়ে রেগেমেগে বললেন, এদের আর নাটক না দেখিয়ে এখনই রুলার দিয়ে চটাস করে বাড়ি মেরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করো!

কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চতুর সেনাপতি লর্ডের কানে ফিসফিস করে বললেন, স্যার! এত সহজে বিনে পয়সায় মশা মারলে তো কোনো লাভ নেই। একটা বড়সড় প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার। হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা খরচ হবে, চারদিকে শোরগোল হবে—তবেই না লোকে বুঝবে লর্ড একটা কিছু করছেন!

সেনাপতির মাথায় প্রকল্প আর বাজেট শব্দ দুটো শুনে লর্ড ক্লাইভের বুদ্ধির বাতি জ্বলে উঠল। তিনি তুড়ি মেরে বললেন, আইডিয়া! মশাগুলোর ওপর কামানের গোলা ছুড়লে কেমন হয়? মশা মরবে, আবার আওয়াজও হবে!

পরদিন দেশজুড়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে, রাজকীয় তোপধ্বনির ব্যবস্থা করে কামানের মুখে মশাগুলোকে বেঁধে কয়েক রাউন্ড গোলা ফোটানো হলো। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো—কামানের বিকট শব্দ আর ধোঁয়ায় একটা মশাও মরল না। উল্টো কামানের গোলার পিঠে চড়ে কোনো প্রকার ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই মশার দল উড়ে এসে আছড়ে পড়ল সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকায়!

এভাবেই আজ থেকে ২৬৭ বছর আগে এই অর্ধেক পাখি, অর্ধেক পোকা প্রাণীটির রাজকীয় অভিষেক ঘটেছিল ঢাকায়। কালের বিবর্তনে আজ তারা ঢাকার একচ্ছত্র রাজত্বের অধিকারী। তৎকালীন ইংরেজ আমল থেকে শুরু হওয়া সেই মশা মারতে কামান দাগার ঐতিহ্য আজও আমাদের নগরপিতা ও কর্তৃপক্ষ পরম যত্নে ধরে রেখেছেন—মশা মারার জন্য কোটি কোটি টাকার বড় বড় বাজেট আর কামান মার্কা ফগার মেশিনের আওয়াজ তো হয়, কিন্তু চতুর মশাদের কিছুই হয় না!

একসময় লর্ড ক্লাইভকে কামড়ানোর দায়ে যে মশাদের জেলে যেতে হয়েছিল, আজ তারাই গোটা ঢাকাবাসীকে কামড়ে ধরে সোজা হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছে! নিয়তির কী নিষ্ঠুর মধুর প্রতিশোধ, তাই না?

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


মশা মারতে কামান দাগা!

প্রকাশের তারিখ : ১৪ মে ২০২৬

featured Image

১৭৫৭ সাল। পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর ব্রিটিশদের পা তখন আর মাটিতে পড়ছে না। লর্ড ক্লাইভ ভাবলেন, একটু ভারতীয় উপমহাদেশটা ঘুরে আসা যাক। সেই অনুযায়ী তল্পিতল্পা গুটিয়ে সাহেবরা দলবল নিয়ে এলেন কলকাতা পরিদর্শনে। লর্ড ক্লাইভের আগমন বলে কথা! চারিদিকে বিশাল প্যান্ডেল, রাজকীয় সিংহাসন মার্কা চেয়ার—আয়োজনের কোনো কমতি নেই।

লর্ড ক্লাইভ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে কেবলই তাঁর বিজয়ী বক্তৃতা শুরু করেছেন, ঠিক তখনই তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা হলো। তবে কোনো স্বাধীনতাকামী বাঙালি এই হামলা করেনি, করেছে স্বয়ং বাংলার মশার দল! একটি-দুটি নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে হাজার হাজার মশার কামড়ে লর্ড ক্লাইভ স্ক্রিপ্ট ভুলে চিৎকার করে উঠলেন—

আই উইল ডেস্ট্রয় বেঙ্গল, সরি, প্রোটেক্ট বেঙ্গল অ্যাট অ্যানি কস্ট! ফর গডস সেক, সামওয়ান প্লিজ ব্রিং সাম গানস অ্যান্ড শুট দিস মসকিউটোস!


অবস্থা বেগতিক দেখে ইংরেজরা তড়িঘড়ি করে অনুষ্ঠান শেষ করল। তবে সাহেবদের গায়ে হুল ফোটানোর অপরাধে ঘটনাস্থল থেকে তিন-তিনটি মশাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হলো।

মশাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড!

পরদিন ব্রিটিশদের তৈরি বিশেষ আদালতে তোলা হলো আসামিদের। লর্ডকে কামড়ানোর অপরাধে আদালত মশা তিনটির সোজা পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন! রিমান্ডের রুমে বসে ছটফট করতে করতে প্রথম মশা অবাক হয়ে বলল, দোস্ত, আমরা আসলে কাকে কামড়ালাম যে আমাদের এভাবে ধরে নিয়ে এল?

দ্বিতীয় মশা ডানা চুলকাতে চুলকাতে জবাব দিল, গুরুত্বপূর্ণ বন্ধুই হবে রে! দেখিসনি রক্তটা কেমন যেন একটু ভিন্ন স্বাদের ছিল?

তা শুনে তৃতীয় মশা চরম হতাশার গলায় বলল, ধুর শ্লা! ওটা রক্ত ছিল? আমি তো ভাবলাম বাঙ্গির জুস খাচ্ছি। একদমই পানসে!

পরদিন সকালে মস্ত বড় গোঁফওয়ালা এক ইংরেজ জেলার এলেন জিজ্ঞাসাবাদ করতে। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, ইউ টাইনি ব্লাড সাকারস, হাউ ডেয়ার ইউ বাইট আওয়ার লর্ড?

কিন্তু মশার দল তো খাঁটি বাংলা মিডিয়ামের! ইংরেজি না বোঝায় তড়িঘড়ি করে দোভাষী হিসেবে ডেকে আনা হলো ইংরেজদের পরম মিত্র মীর জাফরকে।


মীর জাফরের মাধ্যমে জেলার যখন হুমকি দিলেন যে লর্ডকে কামড়ানোর অপরাধে ওদের ফাঁসি বা যাবজ্জীবন হতে পারে, তখন মশক সমাজ খেপে লাল! তারা যুক্তি দিল, আমরা তো কেবল বেঁচে থাকার জন্য একটু রক্ত চুষি, আপনাদের মতো তো আর যা পাই তা-ই চিবিয়ে গিলি না! আর আপনারা যে কয়েল জ্বালিয়ে, স্প্রে মেরে আমাদের এডিস-অ্যানোফিলিসদের সংসার ধ্বংস করেন, ডানাকাটা পরি বানিয়ে দেন—তার জন্য আমরা কখনো মামলা করেছি? শাস্তি যদি দিতেই হয়, তবে লর্ডকেও বলুন আমাদের কামড় দিতে। হিসাব বরাবর!

এমন সময় স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ সেখানে হাজির হয়ে রেগেমেগে বললেন, এদের আর নাটক না দেখিয়ে এখনই রুলার দিয়ে চটাস করে বাড়ি মেরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করো!

কিন্তু পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চতুর সেনাপতি লর্ডের কানে ফিসফিস করে বললেন, স্যার! এত সহজে বিনে পয়সায় মশা মারলে তো কোনো লাভ নেই। একটা বড়সড় প্রকল্প হাতে নেওয়া দরকার। হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা খরচ হবে, চারদিকে শোরগোল হবে—তবেই না লোকে বুঝবে লর্ড একটা কিছু করছেন!

সেনাপতির মাথায় প্রকল্প আর বাজেট শব্দ দুটো শুনে লর্ড ক্লাইভের বুদ্ধির বাতি জ্বলে উঠল। তিনি তুড়ি মেরে বললেন, আইডিয়া! মশাগুলোর ওপর কামানের গোলা ছুড়লে কেমন হয়? মশা মরবে, আবার আওয়াজও হবে!

পরদিন দেশজুড়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে, রাজকীয় তোপধ্বনির ব্যবস্থা করে কামানের মুখে মশাগুলোকে বেঁধে কয়েক রাউন্ড গোলা ফোটানো হলো। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো—কামানের বিকট শব্দ আর ধোঁয়ায় একটা মশাও মরল না। উল্টো কামানের গোলার পিঠে চড়ে কোনো প্রকার ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই মশার দল উড়ে এসে আছড়ে পড়ল সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকায়!

এভাবেই আজ থেকে ২৬৭ বছর আগে এই অর্ধেক পাখি, অর্ধেক পোকা প্রাণীটির রাজকীয় অভিষেক ঘটেছিল ঢাকায়। কালের বিবর্তনে আজ তারা ঢাকার একচ্ছত্র রাজত্বের অধিকারী। তৎকালীন ইংরেজ আমল থেকে শুরু হওয়া সেই মশা মারতে কামান দাগার ঐতিহ্য আজও আমাদের নগরপিতা ও কর্তৃপক্ষ পরম যত্নে ধরে রেখেছেন—মশা মারার জন্য কোটি কোটি টাকার বড় বড় বাজেট আর কামান মার্কা ফগার মেশিনের আওয়াজ তো হয়, কিন্তু চতুর মশাদের কিছুই হয় না!

একসময় লর্ড ক্লাইভকে কামড়ানোর দায়ে যে মশাদের জেলে যেতে হয়েছিল, আজ তারাই গোটা ঢাকাবাসীকে কামড়ে ধরে সোজা হাসপাতালে পাঠিয়ে দিচ্ছে! নিয়তির কী নিষ্ঠুর মধুর প্রতিশোধ, তাই না?


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো