আমার বন্ধু রতন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে এমন টেনশনে পড়ে, মনে হয় তাকে চাকরি না, জাতিসংঘের শান্তি আলোচনা সভায় পাঠানো হচ্ছে।
ইন্টারভিউয়ের আগের রাতে সে আমাকে ফোন দিলো—
— দোস্ত, আমি তো শেষ!
— কী হইছে?
— যদি জিজ্ঞেস করে নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন, আমি কী বলবো?
আমি বললাম,
— নিজের সম্পর্কে বলবি।
সে আরও ভয় পেয়ে গেল।
— আরে ভাই, এটাই তো সমস্যা! নিজের সম্পর্কে আমি নিজেই তেমন কিছু জানি না!
পরদিন সকালে দেখি সে টাই পরে বসে আছে।
এমনভাবে চুল আঁচড়িয়েছে যেন সরকারি চাকরি না হলে অন্তত শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনে সুযোগ পাবে।
আমি তাকে সাহস দিলাম—
— দেখ, ইন্টারভিউ বোর্ড কোনো কোর্ট না। ওরা তোরে ফাঁসি দিবে না।
রতন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো—
— তুই বুঝবি না। ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢুকলেই আমার মনে হয়, আমি চোর… আর ওনারা সবাই ডিবি পুলিশ।
ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রবেশ
ভেতরে ঢুকেই রতনের অবস্থা খারাপ।
একজন স্যার চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন—
— So, tell us about yourself.
রতন এমন কাঁপতে লাগলো, মনে হচ্ছিল এসি না, ভূমিকম্প চলছে।
সে বললো—
— স্যার… আমি খুব হার্ডওয়ার্কিং… মানে… টিম প্লেয়ার… মানে… চাপের মধ্যে কাজ করতে পারি…
বোর্ডের সবাই এমন মুখ করলো, যেন এই একই ডায়লগ তারা গত জন্ম থেকেও শুনে আসছে।
একজন স্যার হাই চাপতে চাপতে বললেন—
— আচ্ছা, কাজের জায়গায় কোনো কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে সামলেছেন?
রতন এবার পুরো হ্যাং।
তার মাথায় তখন শুধু একটাই চিন্তা—
এখন যদি পৃথিবী ফেটে যেত!
কিন্তু হঠাৎ সে আমার কথা মনে করলো।
আমি আগের রাতে তাকে বলেছিলাম—
ইন্টারভিউতে উত্তর দিবি না… গল্প বলবি!
রতন গলা খাঁকারি দিলো।
— স্যার, একবার আমাদের অফিসের ম্যানেজার হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেন। এদিকে ক্লায়েন্ট রিপোর্ট জমা দেওয়ার শেষ দিন। পুরো টিম তখন এমন অবস্থা, যেন বিয়ের দিন বর পালিয়েছে।
বোর্ডের স্যাররা একটু সোজা হয়ে বসলেন।
রতন চালিয়ে গেল—
— তখন আমি সবাইকে নিয়ে জরুরি মিটিং করি। কাজগুলো ছোট ছোট ভাগ করে দেই। কেউ ডাটা ঠিক করে, কেউ রিপোর্ট বানায়, কেউ ক্লায়েন্ট সামলায়।
একজন স্যার এবার মাথা নেড়ে বললেন—
— তারপর?
রতনের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল।
— তারপর স্যার, আমরা সময়মতো রিপোর্ট জমা দেই। ক্লায়েন্ট এত খুশি হয় যে মেইল করে লিখেছিল— Excellent teamwork.
বোর্ডের একজন স্যার এবার মুচকি হাসলেন।
— Very good. তাহলে এই ঘটনা থেকে কী শিখলেন?
রতন এবার পুরো সিনেমার হিরো।
— শিখেছি স্যার, বিপদের সময় একা হিরো হওয়ার চেষ্টা না করে টিমকে সাথে নিলে কাজ সহজ হয়ে যায়।
ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একজন স্যার চশমা খুলে বললেন—
— Finally, someone who talks like a human being!
ইন্টারভিউ শেষে
বাইরে বের হয়েই রতন হাঁপ ছাড়লো।
— দোস্ত! আমি বেঁচে ফিরছি!
আমি বললাম—
— কী বুঝলি?
রতন সিগারেট ধরানোর ভঙ্গিতে বাতাসে হাত নেড়ে বললো—
— বুঝলাম, ইন্টারভিউতে জ্ঞান কম থাকলেও চলে… কিন্তু গল্প জমজমাট হতে হবে!
আমি বললাম—
— ঠিক। মানুষ তথ্য ভুলে যায়, কিন্তু গল্প ভুলে না।
রতন মাথা নেড়ে বললো—
— আসলেই। আমি যদি শুধু বলতাম চাপ সামলাতে পারি, কেউ মনে রাখতো না। কিন্তু বর পালানো অফিস থিওরি মারার পর সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনলো!
এক সপ্তাহ পর
রতনের চাকরি হয়ে গেল।
এখন সে নতুনদের ইন্টারভিউ টিপস দেয়।
গতকাল দেখি এক ছেলেকে বলছে—
— ভাই, ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে রোবটের মতো কথা বলবেন না। ওনারা মানুষ, নাটক দেখতে পছন্দ করে।
ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো—
— ভাইয়া, তাহলে কি মিথ্যা গল্প বানাবো?
রতন গম্ভীর হয়ে বললো—
— না ভাই, মিথ্যা না।
সত্য ঘটনাটাকেই এমনভাবে বলবেন, যেন শুনে মনে হয় ওয়েব সিরিজ চলছে।
তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে যোগ করলো—
— আর একটা কথা মনে রাখবেন…
ইন্টারভিউ বোর্ডে না স্যার, কোনো প্রশ্ন নেই বলা মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা।
ছেলেটা অবাক হয়ে বললো—
— তাহলে কী বলবো?
রতন গলা ভারী করে বললো—
— বলবেন, স্যার, এখানে শেখার সুযোগ কেমন?
ছেলেটা মুগ্ধ।
আমি পাশে বসে ভাবলাম—
যে ছেলে একসময় নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন শুনে ঘামতো,
সে এখন নিজেই মোটিভেশনাল স্পিকার হয়ে গেছে।
জীবন বড়ই অদ্ভুত জিনিস।
বিষয় : রম্য গল্প

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
আমার বন্ধু রতন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে এমন টেনশনে পড়ে, মনে হয় তাকে চাকরি না, জাতিসংঘের শান্তি আলোচনা সভায় পাঠানো হচ্ছে।
ইন্টারভিউয়ের আগের রাতে সে আমাকে ফোন দিলো—
— দোস্ত, আমি তো শেষ!
— কী হইছে?
— যদি জিজ্ঞেস করে নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন, আমি কী বলবো?
আমি বললাম,
— নিজের সম্পর্কে বলবি।
সে আরও ভয় পেয়ে গেল।
— আরে ভাই, এটাই তো সমস্যা! নিজের সম্পর্কে আমি নিজেই তেমন কিছু জানি না!
পরদিন সকালে দেখি সে টাই পরে বসে আছে।
এমনভাবে চুল আঁচড়িয়েছে যেন সরকারি চাকরি না হলে অন্তত শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনে সুযোগ পাবে।
আমি তাকে সাহস দিলাম—
— দেখ, ইন্টারভিউ বোর্ড কোনো কোর্ট না। ওরা তোরে ফাঁসি দিবে না।
রতন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো—
— তুই বুঝবি না। ইন্টারভিউ বোর্ডে ঢুকলেই আমার মনে হয়, আমি চোর… আর ওনারা সবাই ডিবি পুলিশ।
ইন্টারভিউ বোর্ডে প্রবেশ
ভেতরে ঢুকেই রতনের অবস্থা খারাপ।
একজন স্যার চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন—
— So, tell us about yourself.
রতন এমন কাঁপতে লাগলো, মনে হচ্ছিল এসি না, ভূমিকম্প চলছে।
সে বললো—
— স্যার… আমি খুব হার্ডওয়ার্কিং… মানে… টিম প্লেয়ার… মানে… চাপের মধ্যে কাজ করতে পারি…
বোর্ডের সবাই এমন মুখ করলো, যেন এই একই ডায়লগ তারা গত জন্ম থেকেও শুনে আসছে।
একজন স্যার হাই চাপতে চাপতে বললেন—
— আচ্ছা, কাজের জায়গায় কোনো কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে সামলেছেন?
রতন এবার পুরো হ্যাং।
তার মাথায় তখন শুধু একটাই চিন্তা—
এখন যদি পৃথিবী ফেটে যেত!
কিন্তু হঠাৎ সে আমার কথা মনে করলো।
আমি আগের রাতে তাকে বলেছিলাম—
ইন্টারভিউতে উত্তর দিবি না… গল্প বলবি!
রতন গলা খাঁকারি দিলো।
— স্যার, একবার আমাদের অফিসের ম্যানেজার হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেন। এদিকে ক্লায়েন্ট রিপোর্ট জমা দেওয়ার শেষ দিন। পুরো টিম তখন এমন অবস্থা, যেন বিয়ের দিন বর পালিয়েছে।
বোর্ডের স্যাররা একটু সোজা হয়ে বসলেন।
রতন চালিয়ে গেল—
— তখন আমি সবাইকে নিয়ে জরুরি মিটিং করি। কাজগুলো ছোট ছোট ভাগ করে দেই। কেউ ডাটা ঠিক করে, কেউ রিপোর্ট বানায়, কেউ ক্লায়েন্ট সামলায়।
একজন স্যার এবার মাথা নেড়ে বললেন—
— তারপর?
রতনের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল।
— তারপর স্যার, আমরা সময়মতো রিপোর্ট জমা দেই। ক্লায়েন্ট এত খুশি হয় যে মেইল করে লিখেছিল— Excellent teamwork.
বোর্ডের একজন স্যার এবার মুচকি হাসলেন।
— Very good. তাহলে এই ঘটনা থেকে কী শিখলেন?
রতন এবার পুরো সিনেমার হিরো।
— শিখেছি স্যার, বিপদের সময় একা হিরো হওয়ার চেষ্টা না করে টিমকে সাথে নিলে কাজ সহজ হয়ে যায়।
ঘরে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর একজন স্যার চশমা খুলে বললেন—
— Finally, someone who talks like a human being!
ইন্টারভিউ শেষে
বাইরে বের হয়েই রতন হাঁপ ছাড়লো।
— দোস্ত! আমি বেঁচে ফিরছি!
আমি বললাম—
— কী বুঝলি?
রতন সিগারেট ধরানোর ভঙ্গিতে বাতাসে হাত নেড়ে বললো—
— বুঝলাম, ইন্টারভিউতে জ্ঞান কম থাকলেও চলে… কিন্তু গল্প জমজমাট হতে হবে!
আমি বললাম—
— ঠিক। মানুষ তথ্য ভুলে যায়, কিন্তু গল্প ভুলে না।
রতন মাথা নেড়ে বললো—
— আসলেই। আমি যদি শুধু বলতাম চাপ সামলাতে পারি, কেউ মনে রাখতো না। কিন্তু বর পালানো অফিস থিওরি মারার পর সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনলো!
এক সপ্তাহ পর
রতনের চাকরি হয়ে গেল।
এখন সে নতুনদের ইন্টারভিউ টিপস দেয়।
গতকাল দেখি এক ছেলেকে বলছে—
— ভাই, ইন্টারভিউ বোর্ডে গিয়ে রোবটের মতো কথা বলবেন না। ওনারা মানুষ, নাটক দেখতে পছন্দ করে।
ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো—
— ভাইয়া, তাহলে কি মিথ্যা গল্প বানাবো?
রতন গম্ভীর হয়ে বললো—
— না ভাই, মিথ্যা না।
সত্য ঘটনাটাকেই এমনভাবে বলবেন, যেন শুনে মনে হয় ওয়েব সিরিজ চলছে।
তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে যোগ করলো—
— আর একটা কথা মনে রাখবেন…
ইন্টারভিউ বোর্ডে না স্যার, কোনো প্রশ্ন নেই বলা মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা।
ছেলেটা অবাক হয়ে বললো—
— তাহলে কী বলবো?
রতন গলা ভারী করে বললো—
— বলবেন, স্যার, এখানে শেখার সুযোগ কেমন?
ছেলেটা মুগ্ধ।
আমি পাশে বসে ভাবলাম—
যে ছেলে একসময় নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন শুনে ঘামতো,
সে এখন নিজেই মোটিভেশনাল স্পিকার হয়ে গেছে।
জীবন বড়ই অদ্ভুত জিনিস।

আপনার মতামত লিখুন