মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

উপন্যাস

নীলার অপেক্ষা।

নীলার অপেক্ষা।
ছবি : দৈনিক নতুন আলো

প্রথম পর্ব—

বৃষ্টির রাতগুলো সবসময়ই রায়হানের কাছে ভয়ংকর ছিল।

কারণ বৃষ্টি হলেই তার মনে পড়ে যেত সেই মেয়েটার কথা, যে একসময় তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল।

আজও বৃষ্টি হচ্ছে।

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।

ঢাকার ব্যস্ত শহর অনেকটাই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

রায়হান বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

তার বয়স এখন বত্রিশ।

ভালো চাকরি।

নিজের ফ্ল্যাট।

নিজের গাড়ি।

সমাজের চোখে সফল একজন মানুষ।

তবুও আজও মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে যায়।

কারণ জীবনে কিছু শূন্যতা আছে, যেগুলো কোনো অর্জন দিয়ে পূরণ করা যায় না।

হঠাৎ ফোনে একটি নোটিফিকেশন এলো।

ফেসবুক মেমোরি।

সাত বছর আগের একটি ছবি।

ছবিটাতে তিনজন মানুষ।

সে।

মায়া।

আর নীলা।

ছবিটা দেখেই বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠল।

কারণ এই ছবির মানুষগুলো আজ আর একসাথে নেই।

আর তাদের ভেঙে যাওয়ার গল্পটা কোনো সাধারণ গল্প নয়।

এটা এমন একটা গল্প, যেখানে একজন ভালোবেসেও পায়নি।

আরেকজন পেয়েও ধরে রাখতে পারেনি।

আর একজন শেষ পর্যন্ত বুঝতেই পারেনি, আসল ভালোবাসা ঠিক কোথায় ছিল।


সাত বছর আগে...

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন।

নতুন ক্যাম্পাস।

নতুন মানুষ।

নতুন জীবন।

রায়হান তখন প্রথম বর্ষের ছাত্র।

মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে।

চেহারায় কোনো নায়কের ছাপ ছিল না।

কিন্তু তার একটা অদ্ভুত গুণ ছিল।

সে খুব সহজে মানুষের মন জয় করতে পারত।

সেদিন ক্যাম্পাসে ঢুকেই তার দেখা হয়েছিল দুই মেয়ের সঙ্গে।

প্রথমজন মায়া।

সাদা সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়েটা দূর থেকে দেখতে শান্ত নদীর মতো লাগছিল।

তার চোখে এমন এক ধরনের বিষণ্ণতা ছিল, যা মানুষকে কাছে টেনে নেয়।

আর দ্বিতীয়জন নীলা।

নীলার মধ্যে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক পৃথিবী।

সে কথা বলত।

হাসত।

মজা করত।

এক মুহূর্তও চুপ থাকতে পারত না।

প্রথম দিনেই নীলা বলেছিল,

— এই যে নতুন ভাইয়া, এত চুপচাপ কেন?

রায়হান হেসে বলেছিল,

— আমি মানুষ দেখি।

নীলা হেসে উঠেছিল।

— ওহ, মানুষ দেখেন? তাহলে সাবধান। আমাকে বেশি দেখলে প্রেমে পড়ে যাবেন।

সেদিন সবাই হেসেছিল।

কেউ জানত না, একদিন এই কথাটাই সত্যি হবে।

তবে উল্টোভাবে।


দিন গড়াতে লাগল।

বন্ধুত্ব গভীর হতে লাগল।

তিনজন প্রায় সবসময় একসাথে থাকত।

ক্লাস।

লাইব্রেরি।

ক্যাফেটেরিয়া।

বইমেলা।

বৃষ্টির দিন।

শীতের বিকেল।

সব জায়গায়।

তাদের বন্ধুত্ব দেখে অনেকেই হিংসা করত।

কিন্তু রায়হানের ভেতরে তখন অন্য কিছু জন্ম নিচ্ছিল।

সে ধীরে ধীরে মায়ার প্রেমে পড়ে যাচ্ছিল।

মায়ার চুপচাপ স্বভাব।

কথা বলার ভঙ্গি।

চোখ নামিয়ে হাসা।

সবকিছু তাকে পাগলের মতো টানত।

সে বুঝতে পারল, বন্ধুত্বের সীমা সে অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে নীলা?

নীলাও তখন প্রেমে পড়ছে।

কিন্তু তার ভালোবাসার মানুষটা ছিল রায়হান।

সে কখনো মুখে বলেনি।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—

রায়হানের হৃদয়ে তার জন্য কোনো জায়গা নেই।

সেখানে শুধু মায়া।


একদিন বিকেলে ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়ে বসে ছিল তারা।

হঠাৎ নীলা জিজ্ঞেস করল,

— রায়হান, তুই কাউকে ভালোবাসিস?

রায়হান মুচকি হেসে মায়ার দিকে তাকাল।

মায়া তখন দূরে তাকিয়ে ছিল।

কিছুই বুঝতে পারেনি।

কিন্তু নীলা বুঝে ফেলেছিল।

সেদিন প্রথমবার তার বুকটা কেঁপে উঠেছিল।

প্রথমবার মনে হয়েছিল—

কিছু কিছু যুদ্ধে নামার আগেই মানুষ হেরে যায়।


সেই রাতে নীলা ডায়েরিতে লিখেছিল—

আমি জানি, তুমি কোনোদিন আমার হবে না। তবুও কেন জানি তোমাকেই ভালোবাসি।

তারপর থেকে সে প্রতিদিন অভিনয় করেছে।

বন্ধুর অভিনয়।

হাসির অভিনয়।

ভালো থাকার অভিনয়।

আর প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে গেছে।


অন্যদিকে রায়হান তখন স্বপ্ন দেখছে।

মায়াকে নিয়ে।

একসাথে পথ চলার।

একসাথে ভবিষ্যৎ গড়ার।

একসাথে বৃদ্ধ হওয়ার।

সে জানত না, জীবন তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছে।

আর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা সে পাবে সেই মানুষটার কাছ থেকে, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল।

চলবে...


আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


নীলার অপেক্ষা।

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

প্রথম পর্ব—

বৃষ্টির রাতগুলো সবসময়ই রায়হানের কাছে ভয়ংকর ছিল।

কারণ বৃষ্টি হলেই তার মনে পড়ে যেত সেই মেয়েটার কথা, যে একসময় তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল।

আজও বৃষ্টি হচ্ছে।

রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা।

ঢাকার ব্যস্ত শহর অনেকটাই নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

রায়হান বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট হাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

তার বয়স এখন বত্রিশ।

ভালো চাকরি।

নিজের ফ্ল্যাট।

নিজের গাড়ি।

সমাজের চোখে সফল একজন মানুষ।

তবুও আজও মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে যায়।

কারণ জীবনে কিছু শূন্যতা আছে, যেগুলো কোনো অর্জন দিয়ে পূরণ করা যায় না।

হঠাৎ ফোনে একটি নোটিফিকেশন এলো।

ফেসবুক মেমোরি।

সাত বছর আগের একটি ছবি।

ছবিটাতে তিনজন মানুষ।

সে।

মায়া।

আর নীলা।

ছবিটা দেখেই বুকের ভেতর কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠল।

কারণ এই ছবির মানুষগুলো আজ আর একসাথে নেই।

আর তাদের ভেঙে যাওয়ার গল্পটা কোনো সাধারণ গল্প নয়।

এটা এমন একটা গল্প, যেখানে একজন ভালোবেসেও পায়নি।

আরেকজন পেয়েও ধরে রাখতে পারেনি।

আর একজন শেষ পর্যন্ত বুঝতেই পারেনি, আসল ভালোবাসা ঠিক কোথায় ছিল।


সাত বছর আগে...

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন।

নতুন ক্যাম্পাস।

নতুন মানুষ।

নতুন জীবন।

রায়হান তখন প্রথম বর্ষের ছাত্র।

মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে।

চেহারায় কোনো নায়কের ছাপ ছিল না।

কিন্তু তার একটা অদ্ভুত গুণ ছিল।

সে খুব সহজে মানুষের মন জয় করতে পারত।

সেদিন ক্যাম্পাসে ঢুকেই তার দেখা হয়েছিল দুই মেয়ের সঙ্গে।

প্রথমজন মায়া।

সাদা সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়েটা দূর থেকে দেখতে শান্ত নদীর মতো লাগছিল।

তার চোখে এমন এক ধরনের বিষণ্ণতা ছিল, যা মানুষকে কাছে টেনে নেয়।

আর দ্বিতীয়জন নীলা।

নীলার মধ্যে ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক পৃথিবী।

সে কথা বলত।

হাসত।

মজা করত।

এক মুহূর্তও চুপ থাকতে পারত না।

প্রথম দিনেই নীলা বলেছিল,

— এই যে নতুন ভাইয়া, এত চুপচাপ কেন?

রায়হান হেসে বলেছিল,

— আমি মানুষ দেখি।

নীলা হেসে উঠেছিল।

— ওহ, মানুষ দেখেন? তাহলে সাবধান। আমাকে বেশি দেখলে প্রেমে পড়ে যাবেন।

সেদিন সবাই হেসেছিল।

কেউ জানত না, একদিন এই কথাটাই সত্যি হবে।

তবে উল্টোভাবে।


দিন গড়াতে লাগল।

বন্ধুত্ব গভীর হতে লাগল।

তিনজন প্রায় সবসময় একসাথে থাকত।

ক্লাস।

লাইব্রেরি।

ক্যাফেটেরিয়া।

বইমেলা।

বৃষ্টির দিন।

শীতের বিকেল।

সব জায়গায়।

তাদের বন্ধুত্ব দেখে অনেকেই হিংসা করত।

কিন্তু রায়হানের ভেতরে তখন অন্য কিছু জন্ম নিচ্ছিল।

সে ধীরে ধীরে মায়ার প্রেমে পড়ে যাচ্ছিল।

মায়ার চুপচাপ স্বভাব।

কথা বলার ভঙ্গি।

চোখ নামিয়ে হাসা।

সবকিছু তাকে পাগলের মতো টানত।

সে বুঝতে পারল, বন্ধুত্বের সীমা সে অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছে।

অন্যদিকে নীলা?

নীলাও তখন প্রেমে পড়ছে।

কিন্তু তার ভালোবাসার মানুষটা ছিল রায়হান।

সে কখনো মুখে বলেনি।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—

রায়হানের হৃদয়ে তার জন্য কোনো জায়গা নেই।

সেখানে শুধু মায়া।


একদিন বিকেলে ক্যাম্পাসের পুকুরপাড়ে বসে ছিল তারা।

হঠাৎ নীলা জিজ্ঞেস করল,

— রায়হান, তুই কাউকে ভালোবাসিস?

রায়হান মুচকি হেসে মায়ার দিকে তাকাল।

মায়া তখন দূরে তাকিয়ে ছিল।

কিছুই বুঝতে পারেনি।

কিন্তু নীলা বুঝে ফেলেছিল।

সেদিন প্রথমবার তার বুকটা কেঁপে উঠেছিল।

প্রথমবার মনে হয়েছিল—

কিছু কিছু যুদ্ধে নামার আগেই মানুষ হেরে যায়।


সেই রাতে নীলা ডায়েরিতে লিখেছিল—

আমি জানি, তুমি কোনোদিন আমার হবে না। তবুও কেন জানি তোমাকেই ভালোবাসি।

তারপর থেকে সে প্রতিদিন অভিনয় করেছে।

বন্ধুর অভিনয়।

হাসির অভিনয়।

ভালো থাকার অভিনয়।

আর প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে গেছে।


অন্যদিকে রায়হান তখন স্বপ্ন দেখছে।

মায়াকে নিয়ে।

একসাথে পথ চলার।

একসাথে ভবিষ্যৎ গড়ার।

একসাথে বৃদ্ধ হওয়ার।

সে জানত না, জীবন তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছে।

আর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা সে পাবে সেই মানুষটার কাছ থেকে, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল।

চলবে...



দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো