মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

উপন্যাস

নীলার অপেক্ষা।

নীলার অপেক্ষা।
ছবি : দৈনিক নতুন আলো

তৃতীয় পর্ব
—

নীলার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।

সবকিছু যেন খুব দ্রুত ঘটেছিল।

বিদায়ের দিন বিমানবন্দরে অনেক মানুষ ছিল। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত মুখ।

সবাই নীলাকে ঘিরে ছিল।

শুধু রায়হান একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

কেন যেন তার বুকের ভেতরটা ভারী লাগছিল।

যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু সে তখনও বুঝতে পারেনি কী হারাচ্ছে।

বিদায়ের আগে নীলা শেষবারের মতো তার কাছে এসেছিল।

মুখে সেই চেনা হাসি।

কিন্তু চোখ দুটো ভেজা।

— ভালো থাকিস।

— তুইও।

— আমাকে ভুলে যাস না।

রায়হান হেসে বলেছিল,

— পাগলি, বন্ধুদের কেউ ভোলে নাকি?

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে বলেছিল,

— সবাই ভোলে না। কিন্তু সবাই মনে রাখেও না।

রায়হান কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।

সেদিনও না।


নীলা চলে যাওয়ার তিন দিন পর রায়হান তার দেওয়া চিঠিটা খুলল।

ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে ছিল।

সাদা একটা খাম।

খামের ওপরে শুধু লেখা ছিল—

যদি কোনোদিন আমাকে সত্যি সত্যি মনে পড়ে, তখন পড়ো।

রায়হানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলল।

ভেতরে কয়েকটা ভাঁজ করা পৃষ্ঠা।

আর শুরুতেই লেখা—


প্রিয় রায়হান—

যখন তুই এই চিঠিটা পড়বি, তখন আমি অনেক দূরে থাকব।

হয়তো অন্য একটা দেশে।

অন্য একটা জীবনে।

অন্য কারো পরিচয়ে।

আমি জানি, এই চিঠিটা পড়ে তুই অবাক হবি।

হয়তো হাসবিও।

কিন্তু কিছু কথা না বললে আমার জীবনটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তাই আজ বলছি।

আমি তোকে ভালোবাসি।

অনেকদিন ধরে ভালোবাসি।

কতদিন ধরে, সেটা আমারও মনে নেই।

হয়তো প্রথম দিন থেকেই।

যেদিন তুই আমার সাথে প্রথম কথা বলেছিলি।

যেদিন তোর হাসিটা প্রথম দেখেছিলাম।

সেদিন থেকেই।

আমি জানতাম তুই মায়াকে ভালোবাসিস।

তাই কখনো কিছু বলিনি।

কারণ ভালোবাসা যদি কাউকে কষ্ট দেয়, তাহলে সেটা ভালোবাসা না, স্বার্থপরতা।

তাই আমি চুপ করে ছিলাম।

তোকে দূর থেকে ভালোবেসেছি।

তোকে অন্য কাউকে ভালোবাসতে দেখেও ভালোবেসেছি।

তোকে ভেঙে পড়তে দেখেও ভালোবেসেছি।

তোকে হারানোর ভয় নিয়েও ভালোবেসেছি।

জানিস?

অনেক রাত আমি শুধু তোর জন্য কেঁদেছি।

আবার সকালে তোর সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছি।

কারণ তুই যেন কিছু বুঝতে না পারিস।

তোর সুখটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আর সেই কারণেই আজ চলে যাচ্ছি।

তোর কাছ থেকে।

চিরদিনের জন্য।

কারণ তুই কখনো আমার ছিলি না।

আর আমি আর নিজেকে মিথ্যে আশা দিতে চাই না।

তবে একটা কথা সবসময় মনে রাখিস—

পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ ছিল, যে তোকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসত।

ভালো থাকিস।

সবসময়।

— নীলা


চিঠির শেষ লাইন পড়ার পর রায়হান অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে ছিল।

তারপর প্রথমবারের মতো তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

অনেক জল।

অসংখ্য জল।

কারণ জীবনে প্রথমবার সে বুঝতে পারল—

যে মানুষটা সবসময় পাশে ছিল, সে শুধু বন্ধু ছিল না।

সে ছিল তার জীবনের সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।


সেদিন রাতে রায়হান ঘুমাতে পারেনি।

পুরোনো মেসেজগুলো পড়েছে।

পুরোনো ছবিগুলো দেখেছে।

প্রতিটা মুহূর্ত মনে করার চেষ্টা করেছে।

আর যতই মনে করেছে, ততই বুঝেছে—

নীলা তাকে কতটা ভালোবাসত।

আর সে কতটা অন্ধ ছিল।


এরপর শুরু হলো অপরাধবোধ।

ভয়ংকর অপরাধবোধ।

যে মানুষটা তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল, তাকে সে কখনো বুঝতে পারেনি।

কখনো গুরুত্ব দেয়নি।

কখনো জিজ্ঞেসও করেনি—

তুই কেমন আছিস?


দিন যায়।

মাস যায়।

বছর যায়।

রায়হান চাকরি পায়।

জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সবকিছু পায়।

কিন্তু একটা জিনিস আর কোনোদিন পায় না।

শান্তি।

কারণ রাত হলেই নীলার চিঠির লাইনগুলো মনে পড়ে।

পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ ছিল, যে তোকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসত...


এদিকে কানাডায় নীলার জীবনও খুব সুখের ছিল না।

বিয়েটা হয়েছিল পরিবারের চাপে।

ভালোবাসা থেকে নয়।

স্বামী ভালো মানুষ ছিল।

কিন্তু ভালো মানুষ আর প্রিয় মানুষ এক জিনিস নয়।

নীলা সংসার করেছে।

দায়িত্ব পালন করেছে।

হেসেছে।

ছবি তুলেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সুখী হওয়ার অভিনয় করেছে।

কিন্তু গভীর রাতে এখনো মাঝে মাঝে রায়হানের নামটা মনে পড়ত।

আর তখন চুপচাপ কাঁদত।

কারণ কিছু ভালোবাসা ভুলে যাওয়া যায় না।

যত দূরেই যাওয়া হোক।


সাত বছর পরে...

এক বর্ষার রাতে হঠাৎ ফেসবুকে একটা ছবি দেখল রায়হান।

নীলার ছবি।

অনেকদিন পর।

কিন্তু ছবিটা দেখে তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

কারণ ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল—

কিছু বিদায় কখনো জানিয়ে আসে না...

আর কমেন্টে সবাই লিখছে—

Stay strong.

Praying for you.

Allah will help you.

রায়হানের হাত কাঁপতে শুরু করল।

কী হয়েছে নীলার?

কেন সবাই এমন লিখছে?

সে তাড়াতাড়ি নীলার প্রোফাইলে ঢুকল।

আর সেখানে গিয়ে যে খবরটা জানল...

সেটা তার পুরো পৃথিবীটাকে আবারও ভেঙে দিল।

চলবে...

বিষয় : উপন্যাস

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


নীলার অপেক্ষা।

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬

featured Image

তৃতীয় পর্ব—

নীলার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল।

সবকিছু যেন খুব দ্রুত ঘটেছিল।

বিদায়ের দিন বিমানবন্দরে অনেক মানুষ ছিল। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত মুখ।

সবাই নীলাকে ঘিরে ছিল।

শুধু রায়হান একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

কেন যেন তার বুকের ভেতরটা ভারী লাগছিল।

যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু হারিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু সে তখনও বুঝতে পারেনি কী হারাচ্ছে।

বিদায়ের আগে নীলা শেষবারের মতো তার কাছে এসেছিল।

মুখে সেই চেনা হাসি।

কিন্তু চোখ দুটো ভেজা।

— ভালো থাকিস।

— তুইও।

— আমাকে ভুলে যাস না।

রায়হান হেসে বলেছিল,

— পাগলি, বন্ধুদের কেউ ভোলে নাকি?

নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তারপর ধীরে ধীরে বলেছিল,

— সবাই ভোলে না। কিন্তু সবাই মনে রাখেও না।

রায়হান কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।

সেদিনও না।


নীলা চলে যাওয়ার তিন দিন পর রায়হান তার দেওয়া চিঠিটা খুলল।

ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে ছিল।

সাদা একটা খাম।

খামের ওপরে শুধু লেখা ছিল—

যদি কোনোদিন আমাকে সত্যি সত্যি মনে পড়ে, তখন পড়ো।

রায়হানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

ধীরে ধীরে চিঠিটা খুলল।

ভেতরে কয়েকটা ভাঁজ করা পৃষ্ঠা।

আর শুরুতেই লেখা—


প্রিয় রায়হান—

যখন তুই এই চিঠিটা পড়বি, তখন আমি অনেক দূরে থাকব।

হয়তো অন্য একটা দেশে।

অন্য একটা জীবনে।

অন্য কারো পরিচয়ে।

আমি জানি, এই চিঠিটা পড়ে তুই অবাক হবি।

হয়তো হাসবিও।

কিন্তু কিছু কথা না বললে আমার জীবনটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তাই আজ বলছি।

আমি তোকে ভালোবাসি।

অনেকদিন ধরে ভালোবাসি।

কতদিন ধরে, সেটা আমারও মনে নেই।

হয়তো প্রথম দিন থেকেই।

যেদিন তুই আমার সাথে প্রথম কথা বলেছিলি।

যেদিন তোর হাসিটা প্রথম দেখেছিলাম।

সেদিন থেকেই।

আমি জানতাম তুই মায়াকে ভালোবাসিস।

তাই কখনো কিছু বলিনি।

কারণ ভালোবাসা যদি কাউকে কষ্ট দেয়, তাহলে সেটা ভালোবাসা না, স্বার্থপরতা।

তাই আমি চুপ করে ছিলাম।

তোকে দূর থেকে ভালোবেসেছি।

তোকে অন্য কাউকে ভালোবাসতে দেখেও ভালোবেসেছি।

তোকে ভেঙে পড়তে দেখেও ভালোবেসেছি।

তোকে হারানোর ভয় নিয়েও ভালোবেসেছি।

জানিস?

অনেক রাত আমি শুধু তোর জন্য কেঁদেছি।

আবার সকালে তোর সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়েছি।

কারণ তুই যেন কিছু বুঝতে না পারিস।

তোর সুখটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আর সেই কারণেই আজ চলে যাচ্ছি।

তোর কাছ থেকে।

চিরদিনের জন্য।

কারণ তুই কখনো আমার ছিলি না।

আর আমি আর নিজেকে মিথ্যে আশা দিতে চাই না।

তবে একটা কথা সবসময় মনে রাখিস—

পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ ছিল, যে তোকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসত।

ভালো থাকিস।

সবসময়।

— নীলা


চিঠির শেষ লাইন পড়ার পর রায়হান অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে ছিল।

তারপর প্রথমবারের মতো তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

অনেক জল।

অসংখ্য জল।

কারণ জীবনে প্রথমবার সে বুঝতে পারল—

যে মানুষটা সবসময় পাশে ছিল, সে শুধু বন্ধু ছিল না।

সে ছিল তার জীবনের সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।


সেদিন রাতে রায়হান ঘুমাতে পারেনি।

পুরোনো মেসেজগুলো পড়েছে।

পুরোনো ছবিগুলো দেখেছে।

প্রতিটা মুহূর্ত মনে করার চেষ্টা করেছে।

আর যতই মনে করেছে, ততই বুঝেছে—

নীলা তাকে কতটা ভালোবাসত।

আর সে কতটা অন্ধ ছিল।


এরপর শুরু হলো অপরাধবোধ।

ভয়ংকর অপরাধবোধ।

যে মানুষটা তাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছিল, তাকে সে কখনো বুঝতে পারেনি।

কখনো গুরুত্ব দেয়নি।

কখনো জিজ্ঞেসও করেনি—

তুই কেমন আছিস?


দিন যায়।

মাস যায়।

বছর যায়।

রায়হান চাকরি পায়।

জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সবকিছু পায়।

কিন্তু একটা জিনিস আর কোনোদিন পায় না।

শান্তি।

কারণ রাত হলেই নীলার চিঠির লাইনগুলো মনে পড়ে।

পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ ছিল, যে তোকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসত...


এদিকে কানাডায় নীলার জীবনও খুব সুখের ছিল না।

বিয়েটা হয়েছিল পরিবারের চাপে।

ভালোবাসা থেকে নয়।

স্বামী ভালো মানুষ ছিল।

কিন্তু ভালো মানুষ আর প্রিয় মানুষ এক জিনিস নয়।

নীলা সংসার করেছে।

দায়িত্ব পালন করেছে।

হেসেছে।

ছবি তুলেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সুখী হওয়ার অভিনয় করেছে।

কিন্তু গভীর রাতে এখনো মাঝে মাঝে রায়হানের নামটা মনে পড়ত।

আর তখন চুপচাপ কাঁদত।

কারণ কিছু ভালোবাসা ভুলে যাওয়া যায় না।

যত দূরেই যাওয়া হোক।


সাত বছর পরে...

এক বর্ষার রাতে হঠাৎ ফেসবুকে একটা ছবি দেখল রায়হান।

নীলার ছবি।

অনেকদিন পর।

কিন্তু ছবিটা দেখে তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।

কারণ ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল—

কিছু বিদায় কখনো জানিয়ে আসে না...

আর কমেন্টে সবাই লিখছে—

Stay strong.

Praying for you.

Allah will help you.

রায়হানের হাত কাঁপতে শুরু করল।

কী হয়েছে নীলার?

কেন সবাই এমন লিখছে?

সে তাড়াতাড়ি নীলার প্রোফাইলে ঢুকল।

আর সেখানে গিয়ে যে খবরটা জানল...

সেটা তার পুরো পৃথিবীটাকে আবারও ভেঙে দিল।

চলবে...


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো