দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে (MoU) স্বাক্ষর করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট পৃথকভাবে স্বাক্ষরের পরপরই এই প্রাথমিক চুক্তিটি কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে খুলে দেওয়া হচ্ছে রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি।
ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে (প্যালেস অব ভার্সাই) জি৭ শীর্ষ সম্মেলন পরবর্তী এক নৈশভোজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিজ দেশে অবস্থান করে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন। মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং নামে পরিচিত এই ১৪ দফার ঐতিহাসিক চুক্তিতে একদিকে যেমন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, অন্যদিকে দেশটির পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিলের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
নিচে এই সমঝোতা বা প্রাথমিক চুক্তির ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ দফা, সেগুলোর অর্থ এবং পারস্পরিক যুক্ততার বিষয়গুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেবে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। এখন থেকে কোনো পক্ষই নতুন সামরিক অভিযান শুরু বা একে অপরকে হুমকি দেবে না। তারা লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। তবে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে তা সমঝোতার লঙ্ঘন হবে বলে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানাবে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না।
উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দুই দেশের নেতা স্বাক্ষর করার পর থেকেই এই ৬০ দিনের গণনা শুরু হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ এবং বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত সব ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে নেবে। এর পাশাপাশি, সংঘাত শুরুর আগের অবস্থানে (২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থানে) মার্কিন সামরিক বহরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান হরমুজ প্রণালির নিরাপদ পথ নিশ্চিত করবে এবং এর জন্য কোনো 'টোল' নেওয়া হবে না। ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ইরান এই প্রণালি পরিচালনার জন্য একটি বৃহত্তর চুক্তি তৈরি করবে।
ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে। তবে এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো অর্থ দিতে বাধ্য নয়, তারা শুধু নিবন্ধন, ছাড়পত্র ও অনুমোদন দেবে। যেমন— তেহরানের আচরণ ইতিবাচক হলে মার্কিন অনুমতি সাপেক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন একতরফা সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে। তবে এটি কখন থেকে কার্যকর হবে তা চূড়ান্ত চুক্তির সময় নির্ধারণ করা হবে।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করার পথ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তেহরানের কাছে বর্তমানে যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত আছে, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে সেটির মাত্রা কমিয়ে আনা হবে।
শর্তযুক্ত কার্যকারিতা: সপ্তম দফায় উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার মূলত এই অষ্টম দফার শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করলেই কেবল আর্থিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার হবে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশই পারমাণবিক কর্মসূচিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না এবং তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেবে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ করা তহবিল পুরোপুরি ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে সম্মত হয়েছে। ইরান যদি ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত চুক্তির শর্ত মেনে চলে, তবে তাদের উৎসাহ দিতে আরও সম্পদ ও তহবিল ছাড় করা হবে।
চুক্তির শেষ কয়েকটি দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতের শর্তাবলি পর্যবেক্ষণ করার জন্য দুই দেশ যৌথভাবে একটি ‘মেকানিজম’ বা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। সবশেষে, চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত ও আইনি স্বীকৃতি পাবে।
বিষয় : যুক্তরাষ্ট্র ইরান সমঝোতা স্মারক

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬
দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে এক ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে (MoU) স্বাক্ষর করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন যে, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট পৃথকভাবে স্বাক্ষরের পরপরই এই প্রাথমিক চুক্তিটি কার্যকর হয়েছে। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে খুলে দেওয়া হচ্ছে রণকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি।
ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে (প্যালেস অব ভার্সাই) জি৭ শীর্ষ সম্মেলন পরবর্তী এক নৈশভোজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিজ দেশে অবস্থান করে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই নথিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন। মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং নামে পরিচিত এই ১৪ দফার ঐতিহাসিক চুক্তিতে একদিকে যেমন ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে, অন্যদিকে দেশটির পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল তহবিলের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
নিচে এই সমঝোতা বা প্রাথমিক চুক্তির ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ দফা, সেগুলোর অর্থ এবং পারস্পরিক যুক্ততার বিষয়গুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও তাদের মিত্ররা তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা দেবে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত। এখন থেকে কোনো পক্ষই নতুন সামরিক অভিযান শুরু বা একে অপরকে হুমকি দেবে না। তারা লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। তবে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে তা সমঝোতার লঙ্ঘন হবে বলে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানাবে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না।
উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দুই দেশের নেতা স্বাক্ষর করার পর থেকেই এই ৬০ দিনের গণনা শুরু হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ এবং বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত সব ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে নেবে। এর পাশাপাশি, সংঘাত শুরুর আগের অবস্থানে (২৮ ফেব্রুয়ারির আগের অবস্থানে) মার্কিন সামরিক বহরকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান হরমুজ প্রণালির নিরাপদ পথ নিশ্চিত করবে এবং এর জন্য কোনো 'টোল' নেওয়া হবে না। ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে মিলে ইরান এই প্রণালি পরিচালনার জন্য একটি বৃহত্তর চুক্তি তৈরি করবে।
ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে। তবে এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কোনো অর্থ দিতে বাধ্য নয়, তারা শুধু নিবন্ধন, ছাড়পত্র ও অনুমোদন দেবে। যেমন— তেহরানের আচরণ ইতিবাচক হলে মার্কিন অনুমতি সাপেক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন একতরফা সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে। তবে এটি কখন থেকে কার্যকর হবে তা চূড়ান্ত চুক্তির সময় নির্ধারণ করা হবে।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করার পথ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তেহরানের কাছে বর্তমানে যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত আছে, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে সেটির মাত্রা কমিয়ে আনা হবে।
শর্তযুক্ত কার্যকারিতা: সপ্তম দফায় উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার মূলত এই অষ্টম দফার শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করলেই কেবল আর্থিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার হবে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টি চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশই পারমাণবিক কর্মসূচিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখবে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবে না এবং তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দেবে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দ করা তহবিল পুরোপুরি ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে সম্মত হয়েছে। ইরান যদি ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত চুক্তির শর্ত মেনে চলে, তবে তাদের উৎসাহ দিতে আরও সম্পদ ও তহবিল ছাড় করা হবে।
চুক্তির শেষ কয়েকটি দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতের শর্তাবলি পর্যবেক্ষণ করার জন্য দুই দেশ যৌথভাবে একটি ‘মেকানিজম’ বা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। সবশেষে, চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত ও আইনি স্বীকৃতি পাবে।

আপনার মতামত লিখুন