মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
প্রকাশ : রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

থানচির নতুন পর্যটন গন্তব্য বংড

সাঙ্গু নদীর বুকে পাথরের রাজ্য: থানচির রহস্যময় রাজা পাথর ও কুমারী ঝরনা

সাঙ্গু নদীর বুকে পাথরের রাজ্য: থানচির রহস্যময় রাজা পাথর ও কুমারী ঝরনা
ছবি : সংগৃহীত

পাহাড়, নদী আর পাথরের এক অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এক অপার সৌন্দর্যভূমি বান্দরবানের থানচি। দুই পাহাড়ের বুক চিরে আপন গতিতে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। আর সেই রুপালি নদীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের দেশের এক মুকুটধারী রাজা। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘বংডহ’ বা ‘রাজা পাথর’ নামে। নীল পানি, চিরসবুজ পাহাড় আর ছোট-বড় অসংখ্য পাথরের এই অনন্য সাম্রাজ্য এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ও প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠেছে এক আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য।

স্থানীয় মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খুমী ও খিয়াং সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই পাথর অত্যন্ত পবিত্র। এই পাথরকে ঘিরে প্রচলিত আছে এক প্রাচীন লোকগাথা। বলা হয়ে থাকে, বহু বছর আগে এক সাধক দিব্যজ্ঞান লাভ করে জানতে পারেন, সাঙ্গু নদীতে গুপ্তধনের অস্তিত্ব রয়েছে। সেই গুপ্তধনের সন্ধানে তিনি আরাকান থেকে কালাডাইন নদ পাড়ি দিয়ে থানচির এই অঞ্চলে আসেন এবং এক বিশাল পাথরের ওপর ধ্যানমগ্ন হন। পরে তিনি ফিরে যাওয়ার সময় ভুলবশত তাঁর মাথার পাগড়ি বা মুকুটটি ওই পাথরের ওপর রেখেই চলে যান।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই মুকুট আজও পাথরের চূড়ায় দৃশ্যমান। মারমা ভাষায় ‘বং’ মানে পাগড়ি বা মুকুট এবং ‘ডহ’ মানে বড় বা রাজা; সেই থেকে এর নাম হয়েছে ‘বংডহ’ বা রাজা পাথর। এই বংডহ এবং এর কাছাকাছি থাকা ‘ক্যহপাজ্জা’ (দেবতার পাথর) ঘিরে পুরো অঞ্চলে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় ও পবিত্র আবহ।

রাজা পাথরের এই পাথুরে সাম্রাজ্য দেখা শেষ করে পর্যটকেরা ঢুঁ মারতে পারেন ঠিক পাশেই থাকা ‘কুমারী ঝরনা’য়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই ঝরনায় পানির প্রবাহ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা এর সৌন্দর্যকে অনন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। তবে পাহাড়ি পথ বর্ষায় বেশ পিচ্ছিল থাকে বলে কুমারী ঝরনা দেখতে যাওয়ার সময় পর্যটকদের বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় গাইডরা।

পর্যটকদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সনাতন পবিত্রতা রক্ষা নিয়ে চিন্তিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বংডহ পাথরকে স্থানীয়রা দেবতা কিংবা পবিত্র স্থান জ্ঞান করায় পর্যটকদের আচরণে যেন তার অবমাননা না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।

তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মংপ্রুঅং মারমা বলেন, বংডহ আমাদের সংস্কৃতির এবং প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। বহু বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই পাথরকে শ্রদ্ধা করে আসছেন। এখন এখানে অনেক পর্যটক আসেন, যা আমাদের স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ভালো। তবে পর্যটকদের কাছে অনুরোধ, আপনারা প্রকৃতির ক্ষতি করবেন না। প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলে নদীর পানি ও পরিবেশ দূষিত করবেন না।

তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা পর্যটকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, থানচির বংডহ পাথর ও ক্যহপাজ্জা অঞ্চল এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের নতুন ঠিকানা। পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার জন্য আমরা স্থানীয় প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছি। তবে পর্যটকদেরও মনে রাখতে হবে, এটি একটি পবিত্র পাথর এবং সংবেদনশীল পরিবেশগত এলাকা। পাথর এবং প্রকৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে তবেই এই সৌন্দর্যের আনন্দ সবার নেওয়া উচিত।


যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে, পাহাড়ের কোলে সাঙ্গু নদীর বুকে শুয়ে থাকা এই পাথরের রাজ্য যেন এক টুকরো স্বর্গ। সরকারি ও বেসরকারি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং পর্যটকদের পরিবেশগত সচেতনতা বজায় থাকলে থানচির এই বংডহ পাথর ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


সাঙ্গু নদীর বুকে পাথরের রাজ্য: থানচির রহস্যময় রাজা পাথর ও কুমারী ঝরনা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

পাহাড়, নদী আর পাথরের এক অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এক অপার সৌন্দর্যভূমি বান্দরবানের থানচি। দুই পাহাড়ের বুক চিরে আপন গতিতে বয়ে চলা সাঙ্গু নদী যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। আর সেই রুপালি নদীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের দেশের এক মুকুটধারী রাজা। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘বংডহ’ বা ‘রাজা পাথর’ নামে। নীল পানি, চিরসবুজ পাহাড় আর ছোট-বড় অসংখ্য পাথরের এই অনন্য সাম্রাজ্য এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ও প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠেছে এক আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য।

স্থানীয় মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খুমী ও খিয়াং সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই পাথর অত্যন্ত পবিত্র। এই পাথরকে ঘিরে প্রচলিত আছে এক প্রাচীন লোকগাথা। বলা হয়ে থাকে, বহু বছর আগে এক সাধক দিব্যজ্ঞান লাভ করে জানতে পারেন, সাঙ্গু নদীতে গুপ্তধনের অস্তিত্ব রয়েছে। সেই গুপ্তধনের সন্ধানে তিনি আরাকান থেকে কালাডাইন নদ পাড়ি দিয়ে থানচির এই অঞ্চলে আসেন এবং এক বিশাল পাথরের ওপর ধ্যানমগ্ন হন। পরে তিনি ফিরে যাওয়ার সময় ভুলবশত তাঁর মাথার পাগড়ি বা মুকুটটি ওই পাথরের ওপর রেখেই চলে যান।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই মুকুট আজও পাথরের চূড়ায় দৃশ্যমান। মারমা ভাষায় ‘বং’ মানে পাগড়ি বা মুকুট এবং ‘ডহ’ মানে বড় বা রাজা; সেই থেকে এর নাম হয়েছে ‘বংডহ’ বা রাজা পাথর। এই বংডহ এবং এর কাছাকাছি থাকা ‘ক্যহপাজ্জা’ (দেবতার পাথর) ঘিরে পুরো অঞ্চলে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় ও পবিত্র আবহ।

রাজা পাথরের এই পাথুরে সাম্রাজ্য দেখা শেষ করে পর্যটকেরা ঢুঁ মারতে পারেন ঠিক পাশেই থাকা ‘কুমারী ঝরনা’য়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই ঝরনায় পানির প্রবাহ বহুগুণ বেড়ে যায়, যা এর সৌন্দর্যকে অনন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। তবে পাহাড়ি পথ বর্ষায় বেশ পিচ্ছিল থাকে বলে কুমারী ঝরনা দেখতে যাওয়ার সময় পর্যটকদের বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয় গাইডরা।

পর্যটকদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সনাতন পবিত্রতা রক্ষা নিয়ে চিন্তিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বংডহ পাথরকে স্থানীয়রা দেবতা কিংবা পবিত্র স্থান জ্ঞান করায় পর্যটকদের আচরণে যেন তার অবমাননা না হয়, সেদিকে নজর দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তাঁরা।

তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মংপ্রুঅং মারমা বলেন, বংডহ আমাদের সংস্কৃতির এবং প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। বহু বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই পাথরকে শ্রদ্ধা করে আসছেন। এখন এখানে অনেক পর্যটক আসেন, যা আমাদের স্থানীয় অর্থনীতির জন্য ভালো। তবে পর্যটকদের কাছে অনুরোধ, আপনারা প্রকৃতির ক্ষতি করবেন না। প্লাস্টিক বা বর্জ্য ফেলে নদীর পানি ও পরিবেশ দূষিত করবেন না।

তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা পর্যটকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, থানচির বংডহ পাথর ও ক্যহপাজ্জা অঞ্চল এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের নতুন ঠিকানা। পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং যাতায়াত নির্বিঘ্ন করার জন্য আমরা স্থানীয় প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছি। তবে পর্যটকদেরও মনে রাখতে হবে, এটি একটি পবিত্র পাথর এবং সংবেদনশীল পরিবেশগত এলাকা। পাথর এবং প্রকৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে তবেই এই সৌন্দর্যের আনন্দ সবার নেওয়া উচিত।


যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে, পাহাড়ের কোলে সাঙ্গু নদীর বুকে শুয়ে থাকা এই পাথরের রাজ্য যেন এক টুকরো স্বর্গ। সরকারি ও বেসরকারি সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং পর্যটকদের পরিবেশগত সচেতনতা বজায় থাকলে থানচির এই বংডহ পাথর ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম শীর্ষ পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো