মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

গল্প

অপেক্ষার স্টেশন

অপেক্ষার স্টেশন
ছবি : দৈনিক নতুন আলো

কবিরপুর স্টেশনটা যেন সময়ের বাইরে পড়ে থাকা একটি জায়গা। ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম, মরিচা ধরা রেললাইন, বাতাসে দুলতে থাকা সাদা কাশফুল, আর বিকেলের শেষ আলো—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা ছিল। মনে হতো, এই নীরবতারও একটা শব্দ আছে, শুধু সবাই শুনতে পায় না।

এই স্টেশনে কোনো যাত্রীবাহী ট্রেন থামত না। দূর থেকে হুইসেল বাজত, ট্রেন আসত, কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশ কেঁপে উঠত, তারপর আবার সব আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যেত।

তবু প্রতিদিন বিকেলে অর্ণব সেখানে যেত।

কেউ জানত না কেন। কেউ ভাবত, ছেলেটা নিশ্চয়ই ট্রেন দেখতে ভালোবাসে। কিন্তু সত্যিটা অন্য ছিল।

এক বিকেলে সে প্রথম দেখেছিল মেয়েটিকে।

মেয়েটি প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা সালোয়ারে হালকা নীল ওড়না। বাতাসে ওড়নাটা উড়ছিল, আর সে দূরের রেললাইনের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন কেউ একজন আসবে। অর্ণব তাকে বিরক্ত করেনি। শুধু দূর থেকে দেখেছিল।

পরদিনও মেয়েটি এল।

তারও পরদিন।

এরপর একদিন মেয়েটি নিজেই হেসে বলল,

— আপনি কি প্রতিদিনই এখানে আসেন?

অর্ণব একটু হেসে বলল,

— হ্যাঁ। তবে ট্রেন দেখার জন্য না।

— তাহলে?

— মনে হয়, এখানে এসে অপেক্ষা করলে মনটা শান্ত হয়।

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— আমিও তাই।

সেদিনের পর থেকে বিকেলগুলো আর একা কাটত না।

তাদের খুব বেশি কথা হতো না। কখনো আকাশের রঙ নিয়ে, কখনো বৃষ্টির গন্ধ নিয়ে, কখনো আবার কোনো কথাই না। তারা পাশাপাশি বসে থাকত, আর দ্রুতগামী ট্রেনগুলো তাদের সামনে দিয়ে চলে যেত।

অর্ণব একদিন বলেছিল,

— দেখেছো? ট্রেনগুলো কখনো এখানে থামে না।

মেয়েটি মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিল,

— সব ট্রেনেরই তো থামার জায়গা থাকে। হয়তো এই স্টেশনের সময় এখনো আসেনি।

কথাটা অর্ণবের খুব মনে লেগেছিল।

দিন কেটে যেতে লাগল। ঋতু বদলালো। স্টেশনের পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছে আবার ফুল ফুটল, আবার ঝরে গেল। কিন্তু তাদের বিকেলগুলো বদলাল না।

একদিন হঠাৎ মেয়েটি আর এল না।

একদিন, দুদিন, এক সপ্তাহ...

অর্ণব প্রতিদিনই স্টেশনে এসেছে। প্রতিদিনই দূরের রেললাইনের দিকে তাকিয়েছে। মনে হয়েছে, কোনো একটা বিকেল ভুল করে হারিয়ে গেছে।

ঠিক তখনই খবর এলো—আগামী মাস থেকে কবিরপুর স্টেশনে যাত্রীবাহী ট্রেন থামবে।

খবরটা শুনে পুরো গ্রাম যেন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। স্টেশনে রং করা হলো। পুরোনো বেঞ্চগুলো পরিষ্কার করা হলো। মানুষের চোখে অনেক দিনের অপেক্ষার আলো জ্বলে উঠল।

প্রথম ট্রেন থামার দিন অর্ণব খুব ভোরেই স্টেশনে এসে দাঁড়াল।

ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

ধীরে ধীরে ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

দরজা খুলল।

মানুষ নেমে আসতে লাগল।

হঠাৎ ভিড়ের মাঝখানে সেই পরিচিত নীল ওড়নাটা চোখে পড়ল।

মেয়েটি নেমে দাঁড়াল। দুজনেই কিছুক্ষণ শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এতদিনের সব কথা চোখের ভেতর জমে ছিল।

মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

— জানো, আমি বলেছিলাম না? সব ট্রেনেরই একদিন থামার সময় আসে।

অর্ণব হেসে ফেলল।

— হ্যাঁ। তবে আজ বুঝলাম, শুধু ট্রেন নয়... কিছু মানুষও ঠিক সময়েই ফিরে আসে।

মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। শুধু আলতো করে অর্ণবের হাতটা ধরল।

স্টেশনের ওপর তখন সকালের রোদ নেমেছে। দূরে ট্রেনটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মনে হলো, সেদিন কবিরপুর স্টেশনে শুধু একটি ট্রেনই থামেনি।

থেমেছিল দুটি মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা।

বিষয় : ছোট গল্প

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


অপেক্ষার স্টেশন

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

কবিরপুর স্টেশনটা যেন সময়ের বাইরে পড়ে থাকা একটি জায়গা। ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম, মরিচা ধরা রেললাইন, বাতাসে দুলতে থাকা সাদা কাশফুল, আর বিকেলের শেষ আলো—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা ছিল। মনে হতো, এই নীরবতারও একটা শব্দ আছে, শুধু সবাই শুনতে পায় না।

এই স্টেশনে কোনো যাত্রীবাহী ট্রেন থামত না। দূর থেকে হুইসেল বাজত, ট্রেন আসত, কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশ কেঁপে উঠত, তারপর আবার সব আগের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যেত।

তবু প্রতিদিন বিকেলে অর্ণব সেখানে যেত।

কেউ জানত না কেন। কেউ ভাবত, ছেলেটা নিশ্চয়ই ট্রেন দেখতে ভালোবাসে। কিন্তু সত্যিটা অন্য ছিল।

এক বিকেলে সে প্রথম দেখেছিল মেয়েটিকে।

মেয়েটি প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদা সালোয়ারে হালকা নীল ওড়না। বাতাসে ওড়নাটা উড়ছিল, আর সে দূরের রেললাইনের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন কেউ একজন আসবে। অর্ণব তাকে বিরক্ত করেনি। শুধু দূর থেকে দেখেছিল।

পরদিনও মেয়েটি এল।

তারও পরদিন।

এরপর একদিন মেয়েটি নিজেই হেসে বলল,

— আপনি কি প্রতিদিনই এখানে আসেন?

অর্ণব একটু হেসে বলল,

— হ্যাঁ। তবে ট্রেন দেখার জন্য না।

— তাহলে?

— মনে হয়, এখানে এসে অপেক্ষা করলে মনটা শান্ত হয়।

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— আমিও তাই।

সেদিনের পর থেকে বিকেলগুলো আর একা কাটত না।

তাদের খুব বেশি কথা হতো না। কখনো আকাশের রঙ নিয়ে, কখনো বৃষ্টির গন্ধ নিয়ে, কখনো আবার কোনো কথাই না। তারা পাশাপাশি বসে থাকত, আর দ্রুতগামী ট্রেনগুলো তাদের সামনে দিয়ে চলে যেত।

অর্ণব একদিন বলেছিল,

— দেখেছো? ট্রেনগুলো কখনো এখানে থামে না।

মেয়েটি মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিল,

— সব ট্রেনেরই তো থামার জায়গা থাকে। হয়তো এই স্টেশনের সময় এখনো আসেনি।

কথাটা অর্ণবের খুব মনে লেগেছিল।

দিন কেটে যেতে লাগল। ঋতু বদলালো। স্টেশনের পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছে আবার ফুল ফুটল, আবার ঝরে গেল। কিন্তু তাদের বিকেলগুলো বদলাল না।

একদিন হঠাৎ মেয়েটি আর এল না।

একদিন, দুদিন, এক সপ্তাহ...

অর্ণব প্রতিদিনই স্টেশনে এসেছে। প্রতিদিনই দূরের রেললাইনের দিকে তাকিয়েছে। মনে হয়েছে, কোনো একটা বিকেল ভুল করে হারিয়ে গেছে।

ঠিক তখনই খবর এলো—আগামী মাস থেকে কবিরপুর স্টেশনে যাত্রীবাহী ট্রেন থামবে।

খবরটা শুনে পুরো গ্রাম যেন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। স্টেশনে রং করা হলো। পুরোনো বেঞ্চগুলো পরিষ্কার করা হলো। মানুষের চোখে অনেক দিনের অপেক্ষার আলো জ্বলে উঠল।

প্রথম ট্রেন থামার দিন অর্ণব খুব ভোরেই স্টেশনে এসে দাঁড়াল।

ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

ধীরে ধীরে ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

দরজা খুলল।

মানুষ নেমে আসতে লাগল।

হঠাৎ ভিড়ের মাঝখানে সেই পরিচিত নীল ওড়নাটা চোখে পড়ল।

মেয়েটি নেমে দাঁড়াল। দুজনেই কিছুক্ষণ শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এতদিনের সব কথা চোখের ভেতর জমে ছিল।

মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

— জানো, আমি বলেছিলাম না? সব ট্রেনেরই একদিন থামার সময় আসে।

অর্ণব হেসে ফেলল।

— হ্যাঁ। তবে আজ বুঝলাম, শুধু ট্রেন নয়... কিছু মানুষও ঠিক সময়েই ফিরে আসে।

মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। শুধু আলতো করে অর্ণবের হাতটা ধরল।

স্টেশনের ওপর তখন সকালের রোদ নেমেছে। দূরে ট্রেনটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মনে হলো, সেদিন কবিরপুর স্টেশনে শুধু একটি ট্রেনই থামেনি।

থেমেছিল দুটি মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো