পাহাড়ের সৌন্দর্য একেক ঋতুতে একেক রূপে ধরা দেয়। বর্ষা, শরৎ ও হেমন্তে সবুজ পাহাড়, মেঘের আনাগোনা আর ঝিরি-ছড়ার কলতানে যেন নতুন করে সাজে পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেই অপরূপ সৌন্দর্যের টানে এবার ছয় সদস্যের একটি দলের সাথে আমরা পাড়ি জমিয়েছিলাম রাঙামাটির গহিনে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার রাইক্ষং ঝরনা দেখতে।
দুই দিনের এই অভিযানে ছিল দুর্গম পাহাড়ি পথ, উত্থান-পতনের কঠিন ট্রেকিং, পাহাড়ি ঝিরি, আদিবাসী পল্লির জীবনযাত্রা, জুমের খাবারের স্বাদ আর রাতের নিস্তব্ধতায় জোছনা দেখার অনন্য অভিজ্ঞতা।
দুর্গম পথের শুরু বগা লেক থেকে :
ভোরের আলো ফুটতেই বান্দরবানের বগা লেক থেকে শুরু হয় অভিযাত্রা। হাতে পাহাড়ি পথে চলার উপযোগী বাঁশের লাঠি। সামনে একের পর এক ঢেউখেলানো পাহাড়, মাঝেমধ্যে ঝিরি ও পাহাড়ি ছড়া।
কখনো প্রায় দুই হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে উঠতে হয়েছে, আবার কখনো দেড় হাজার ফুট নিচে নেমে যেতে হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবেই চলতে হয়েছে দুর্গম পাহাড়ি পথে। বিশ্রাম নেওয়ারও খুব একটা সুযোগ ছিল না—পথে ছিল পাহাড়ি জোঁকের উৎপাত।
পাহাড়ি পল্লিতে একটু বিরতি :
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দলটি পৌঁছে নাখজং পাড়ার মুরং জনগোষ্ঠীর বসতিতে। সেখানে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে মুড়ি-চানাচুর মাখা খেয়ে আবার শুরু হয় পথচলা।
গন্তব্য এনোংপাড়া। সেখানে পৌঁছে রুমা খালের স্বচ্ছ ও শীতল পানিতে ক্লান্ত শরীর-মন জুড়িয়ে নেই আমরা। স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তায় পাহাড়ি খাবারের স্বাদও মেলে। বাঁশ কোঁড়লের ভাজি, পাহাড়ি মুরগির ভুনা আর জুমের চালের ভাত—সব মিলিয়ে রাতের খাবার হয়ে ওঠে ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
কোথায় থাকবেন :
রাইক্ষং ঝরনা ভ্রমণে পথে পড়া পাহাড়ি পাড়াগুলোতে স্থানীয়দের বাড়ি বা কটেজে থাকার ব্যবস্থা করা যায়। স্থানীয় গাইডের সহায়তায় আগেই থাকার জায়গা ঠিক করে নেওয়া ভালো।
প্রথম রাতে এনোংপাড়া এলাকায় স্থানীয়দের বাড়িতে থাকার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। সাধারণ পাহাড়ি ঘর কিংবা বাঁশের মাচায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা হতে পারে। পাহাড়ের নির্জন পরিবেশে খোলা জানালা দিয়ে জোছনা দেখা আর পাশে রুমা খালের কলকল শব্দ ভ্রমণকে করে তুলতে পারে আরও স্মরণীয়।
পরদিন ঝরনার পথে সুজন মাস্টারের কটেজে ব্যাগ রেখে রাইক্ষং ঝরনার দিকে যাওয়া যায়। তবে এসব জায়গা সাধারণ পাহাড়ি আবাসন,বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রিক থাকার ব্যবস্থা নয়। তাই যাত্রার আগে স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে থাকার জায়গা ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
ভোরের আলোয় আবার পথচলা :
পরদিন মোরগডাকা ভোরে ঘুম ভেঙে আবার শুরু হয় হাঁটা। সামনে আরও দুর্গম পথ। উঁচু পাহাড়, আকাশছোঁয়া গাছ আর ঘন লতাগুল্মের জঙ্গল পেরিয়ে চলতে থাকে দলটি।
দীর্ঘ ট্রেকিং শেষে পৌঁছানো যায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট টলটলে পানির পুকুরপাড়া প্রাকৃতিক লেকের পাদদেশে। সেখান থেকে সুজন মাস্টারের কটেজে ব্যাগ রেখে আবার শুরু হয় নতুন পথচলা।
পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় এক ঘণ্টা নিচের দিকে নামার পর হঠাৎ কানে আসে কাঙ্ক্ষিত শব্দ—দূর থেকে ভেসে আসা পানির অবিরাম রিমঝিম ধ্বনি।
অবশেষে রাইক্ষং ঝরনা :
দুই দিনের রুদ্ধশ্বাস পথচলার পর অবশেষে চোখের সামনে উন্মোচিত হয় কাঙ্ক্ষিত রাইক্ষং ঝরনা।
বিশাল জলরাশি যেন পাহাড়ের বুক চিরে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে নিচে নেমে আসছে। অবিরাম সেই জলধারা গিয়ে মিশছে রুমা খালে। দুই পাশে সেগুন ও গর্জন গাছের ঘন ছায়া, মাঝখানে পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসা ঝরনার জল—সব মিলিয়ে রাইক্ষংয়ের দৃশ্য যেন কোনো রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা।
দুর্গম পথের ক্লান্তি, জোঁকের ভয়, পাহাড়ে ওঠানামার কষ্ট—সবকিছু মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য। প্রকৃতির এমন রাজকীয় আয়োজন দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।
কীভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়। বান্দরবান থেকে লোকাল বাস অথবা চাঁদের গাড়িতে যেতে হবে রুমা বাজার।
রুমা বাজারের আর্মি ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় এন্ট্রি ও নিবন্ধন সম্পন্ন করে নিবন্ধিত গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। এরপর গাইডের পরামর্শ অনুযায়ী পাহাড়ি গ্রামের থাকার ব্যবস্থা ও খাবারের ব্যবস্থা করা যায়।
দীর্ঘ ও দুর্গম এই অভিযানের জন্য রুমা বাজার থেকেই পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, শুকনো খেজুর ও স্যালাইন সঙ্গে রাখা ভালো। পাশাপাশি পাহাড়ি পথে হাঁটার উপযোগী জুতা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী সঙ্গে রাখা উচিত।
যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন :
রাইক্ষং ঝরনার পথ দুর্গম ও দীর্ঘ। তাই একা না গিয়ে অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত স্থানীয় গাইডের সঙ্গে যাওয়া নিরাপদ। পাহাড়ি পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। যাত্রাপথে কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনা না ফেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখাও ভ্রমণকারীর দায়িত্ব।
রাইক্ষং ঝরনা শুধু একটি ঝরনা নয়—এটি যেন দুর্গম পাহাড়ের বুকের ভেতর প্রকৃতির লুকিয়ে রাখা এক বিস্ময়। সেখানে পৌঁছাতে যেমন প্রয়োজন সাহস ও ধৈর্য, তেমনি প্রতিটি পদক্ষেপে অপেক্ষা করে থাকে নতুন কোনো দৃশ্য, নতুন কোনো গল্প। আর সেই কারণেই রাইক্ষংয়ের পথে যাত্রা হয়ে উঠতে পারে একজন ভ্রমণপিপাসুর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিযান।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬
পাহাড়ের সৌন্দর্য একেক ঋতুতে একেক রূপে ধরা দেয়। বর্ষা, শরৎ ও হেমন্তে সবুজ পাহাড়, মেঘের আনাগোনা আর ঝিরি-ছড়ার কলতানে যেন নতুন করে সাজে পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেই অপরূপ সৌন্দর্যের টানে এবার ছয় সদস্যের একটি দলের সাথে আমরা পাড়ি জমিয়েছিলাম রাঙামাটির গহিনে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার রাইক্ষং ঝরনা দেখতে।
দুই দিনের এই অভিযানে ছিল দুর্গম পাহাড়ি পথ, উত্থান-পতনের কঠিন ট্রেকিং, পাহাড়ি ঝিরি, আদিবাসী পল্লির জীবনযাত্রা, জুমের খাবারের স্বাদ আর রাতের নিস্তব্ধতায় জোছনা দেখার অনন্য অভিজ্ঞতা।
দুর্গম পথের শুরু বগা লেক থেকে :
ভোরের আলো ফুটতেই বান্দরবানের বগা লেক থেকে শুরু হয় অভিযাত্রা। হাতে পাহাড়ি পথে চলার উপযোগী বাঁশের লাঠি। সামনে একের পর এক ঢেউখেলানো পাহাড়, মাঝেমধ্যে ঝিরি ও পাহাড়ি ছড়া।
কখনো প্রায় দুই হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ে উঠতে হয়েছে, আবার কখনো দেড় হাজার ফুট নিচে নেমে যেতে হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবেই চলতে হয়েছে দুর্গম পাহাড়ি পথে। বিশ্রাম নেওয়ারও খুব একটা সুযোগ ছিল না—পথে ছিল পাহাড়ি জোঁকের উৎপাত।
পাহাড়ি পল্লিতে একটু বিরতি :
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দলটি পৌঁছে নাখজং পাড়ার মুরং জনগোষ্ঠীর বসতিতে। সেখানে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে মুড়ি-চানাচুর মাখা খেয়ে আবার শুরু হয় পথচলা।
গন্তব্য এনোংপাড়া। সেখানে পৌঁছে রুমা খালের স্বচ্ছ ও শীতল পানিতে ক্লান্ত শরীর-মন জুড়িয়ে নেই আমরা। স্থানীয় মানুষের আতিথেয়তায় পাহাড়ি খাবারের স্বাদও মেলে। বাঁশ কোঁড়লের ভাজি, পাহাড়ি মুরগির ভুনা আর জুমের চালের ভাত—সব মিলিয়ে রাতের খাবার হয়ে ওঠে ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
কোথায় থাকবেন :
রাইক্ষং ঝরনা ভ্রমণে পথে পড়া পাহাড়ি পাড়াগুলোতে স্থানীয়দের বাড়ি বা কটেজে থাকার ব্যবস্থা করা যায়। স্থানীয় গাইডের সহায়তায় আগেই থাকার জায়গা ঠিক করে নেওয়া ভালো।
প্রথম রাতে এনোংপাড়া এলাকায় স্থানীয়দের বাড়িতে থাকার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। সাধারণ পাহাড়ি ঘর কিংবা বাঁশের মাচায় রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা হতে পারে। পাহাড়ের নির্জন পরিবেশে খোলা জানালা দিয়ে জোছনা দেখা আর পাশে রুমা খালের কলকল শব্দ ভ্রমণকে করে তুলতে পারে আরও স্মরণীয়।
পরদিন ঝরনার পথে সুজন মাস্টারের কটেজে ব্যাগ রেখে রাইক্ষং ঝরনার দিকে যাওয়া যায়। তবে এসব জায়গা সাধারণ পাহাড়ি আবাসন,বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্রিক থাকার ব্যবস্থা নয়। তাই যাত্রার আগে স্থানীয় গাইডের মাধ্যমে থাকার জায়গা ও খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
ভোরের আলোয় আবার পথচলা :
পরদিন মোরগডাকা ভোরে ঘুম ভেঙে আবার শুরু হয় হাঁটা। সামনে আরও দুর্গম পথ। উঁচু পাহাড়, আকাশছোঁয়া গাছ আর ঘন লতাগুল্মের জঙ্গল পেরিয়ে চলতে থাকে দলটি।
দীর্ঘ ট্রেকিং শেষে পৌঁছানো যায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট টলটলে পানির পুকুরপাড়া প্রাকৃতিক লেকের পাদদেশে। সেখান থেকে সুজন মাস্টারের কটেজে ব্যাগ রেখে আবার শুরু হয় নতুন পথচলা।
পাহাড়ি পথ ধরে প্রায় এক ঘণ্টা নিচের দিকে নামার পর হঠাৎ কানে আসে কাঙ্ক্ষিত শব্দ—দূর থেকে ভেসে আসা পানির অবিরাম রিমঝিম ধ্বনি।
অবশেষে রাইক্ষং ঝরনা :
দুই দিনের রুদ্ধশ্বাস পথচলার পর অবশেষে চোখের সামনে উন্মোচিত হয় কাঙ্ক্ষিত রাইক্ষং ঝরনা।
বিশাল জলরাশি যেন পাহাড়ের বুক চিরে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে নিচে নেমে আসছে। অবিরাম সেই জলধারা গিয়ে মিশছে রুমা খালে। দুই পাশে সেগুন ও গর্জন গাছের ঘন ছায়া, মাঝখানে পাহাড়ের বুক বেয়ে নেমে আসা ঝরনার জল—সব মিলিয়ে রাইক্ষংয়ের দৃশ্য যেন কোনো রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা।
দুর্গম পথের ক্লান্তি, জোঁকের ভয়, পাহাড়ে ওঠানামার কষ্ট—সবকিছু মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য। প্রকৃতির এমন রাজকীয় আয়োজন দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।
কীভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়। বান্দরবান থেকে লোকাল বাস অথবা চাঁদের গাড়িতে যেতে হবে রুমা বাজার।
রুমা বাজারের আর্মি ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় এন্ট্রি ও নিবন্ধন সম্পন্ন করে নিবন্ধিত গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। এরপর গাইডের পরামর্শ অনুযায়ী পাহাড়ি গ্রামের থাকার ব্যবস্থা ও খাবারের ব্যবস্থা করা যায়।
দীর্ঘ ও দুর্গম এই অভিযানের জন্য রুমা বাজার থেকেই পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, শুকনো খেজুর ও স্যালাইন সঙ্গে রাখা ভালো। পাশাপাশি পাহাড়ি পথে হাঁটার উপযোগী জুতা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী সঙ্গে রাখা উচিত।
যাওয়ার আগে যা মনে রাখবেন :
রাইক্ষং ঝরনার পথ দুর্গম ও দীর্ঘ। তাই একা না গিয়ে অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত স্থানীয় গাইডের সঙ্গে যাওয়া নিরাপদ। পাহাড়ি পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। যাত্রাপথে কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনা না ফেলে প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখাও ভ্রমণকারীর দায়িত্ব।
রাইক্ষং ঝরনা শুধু একটি ঝরনা নয়—এটি যেন দুর্গম পাহাড়ের বুকের ভেতর প্রকৃতির লুকিয়ে রাখা এক বিস্ময়। সেখানে পৌঁছাতে যেমন প্রয়োজন সাহস ও ধৈর্য, তেমনি প্রতিটি পদক্ষেপে অপেক্ষা করে থাকে নতুন কোনো দৃশ্য, নতুন কোনো গল্প। আর সেই কারণেই রাইক্ষংয়ের পথে যাত্রা হয়ে উঠতে পারে একজন ভ্রমণপিপাসুর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিযান।

আপনার মতামত লিখুন