মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২৬

বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন এখন তেহরানের কবজায়

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ : দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ : দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ
ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। বিশ্ব বাণিজ্যের এই প্রধান ধমনিটি এখন কার্যত ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলে গেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগামী ১৪ দিন এই জলপথ দিয়ে যেকোনো জাহাজের যাতায়াত কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন তা ইরানি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে সম্পন্ন করা হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক বিশেষ বিবৃতিতে এই নতুন শর্তের কথা তুলে ধরেছেন। তাসনিম নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরাঘচি জানান, নিরাপদ যাতায়াতের স্বার্থে এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে প্রতিটি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজকে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি ও নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সরাসরি প্রতিবাদ আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত এই পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।


কেন হরমুজ প্রণালি এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই প্রণালির প্রভাব অপরিসীম। মূলত তিনটি কারণে এটি বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ :

  • তেল সরবরাহ: বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
  • ভৌগোলিক অবস্থান: পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই প্রণালিটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য একমাত্র সমুদ্রপথ।
  • সামরিক কৌশল: এই জলপথের সরু অংশে ইরান খুব সহজেই আধুনিক মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।


কারিগরি সীমাবদ্ধতা: ইরানের নতুন কৌশল?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আরাঘচির বিবৃতিতে উল্লিখিত কারিগরি সীমাবদ্ধতা শব্দটি অত্যন্ত অর্থবহ। এর মাধ্যমে ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলে জলপথে যে মাইন বা ধ্বংসাবশেষ থাকতে পারে, তা পরিষ্কার করার নামে তারা প্রতিটি জাহাজে তল্লাশি বা কঠোর নজরদারি চালাতে পারে। এতে কার্যত এই অঞ্চলের ওপর ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ আরও পোক্ত হলো।

মার্কিন নৌবাহিনীর অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই শর্তটিকে একটি কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখছেন। দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে মুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এলেও, এখন তাদের নিজেদের শত্রু বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হচ্ছে। পেন্টাগন থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করা হয়নি, তবে হোয়াইট হাউস একে অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছে।

জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা

হরমুজ প্রণালি আংশিক উন্মুক্ত হওয়ার খবরে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা কিছুটা কমলেও পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান কোনো জাহাজকে বাধা দেয় বা সমন্বয়ের নামে হয়রানি করে, তবে তেলের দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আপাতত, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ চলাকালীন হরমুজ প্রণালিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক এলাকা। ইরানি সশস্ত্র বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক নৌযানগুলোর মধ্যে সামান্য ভুল-বোঝাবুঝিও পুনরায় বড় ধরনের সংঘাতের সূচনা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিষয় : হরমুজ প্রণালি ইরান যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত যুদ্ধবিরতি বিশ্ব বাণিজ্য তেল বাজার

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ : দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশের তারিখ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি। বিশ্ব বাণিজ্যের এই প্রধান ধমনিটি এখন কার্যত ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে চলে গেছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগামী ১৪ দিন এই জলপথ দিয়ে যেকোনো জাহাজের যাতায়াত কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন তা ইরানি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে সম্পন্ন করা হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক বিশেষ বিবৃতিতে এই নতুন শর্তের কথা তুলে ধরেছেন। তাসনিম নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরাঘচি জানান, নিরাপদ যাতায়াতের স্বার্থে এবং কারিগরি সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে প্রতিটি বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজকে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর অনুমতি ও নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সরাসরি প্রতিবাদ আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত এই পরিস্থিতি মেনে নিয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।


কেন হরমুজ প্রণালি এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এই প্রণালির প্রভাব অপরিসীম। মূলত তিনটি কারণে এটি বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ :

  • তেল সরবরাহ: বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
  • ভৌগোলিক অবস্থান: পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই প্রণালিটি মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য একমাত্র সমুদ্রপথ।
  • সামরিক কৌশল: এই জলপথের সরু অংশে ইরান খুব সহজেই আধুনিক মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।


কারিগরি সীমাবদ্ধতা: ইরানের নতুন কৌশল?

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আরাঘচির বিবৃতিতে উল্লিখিত কারিগরি সীমাবদ্ধতা শব্দটি অত্যন্ত অর্থবহ। এর মাধ্যমে ইরান ইঙ্গিত দিচ্ছে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলে জলপথে যে মাইন বা ধ্বংসাবশেষ থাকতে পারে, তা পরিষ্কার করার নামে তারা প্রতিটি জাহাজে তল্লাশি বা কঠোর নজরদারি চালাতে পারে। এতে কার্যত এই অঞ্চলের ওপর ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ আরও পোক্ত হলো।

মার্কিন নৌবাহিনীর অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই শর্তটিকে একটি কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখছেন। দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে মুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এলেও, এখন তাদের নিজেদের শত্রু বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হচ্ছে। পেন্টাগন থেকে এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করা হয়নি, তবে হোয়াইট হাউস একে অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেছে।

জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা

হরমুজ প্রণালি আংশিক উন্মুক্ত হওয়ার খবরে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা কিছুটা কমলেও পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান কোনো জাহাজকে বাধা দেয় বা সমন্বয়ের নামে হয়রানি করে, তবে তেলের দাম আবারও ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আপাতত, দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ চলাকালীন হরমুজ প্রণালিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক এলাকা। ইরানি সশস্ত্র বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক নৌযানগুলোর মধ্যে সামান্য ভুল-বোঝাবুঝিও পুনরায় বড় ধরনের সংঘাতের সূচনা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো