মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো
আপডেট : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

জ্বালানি নিরাপত্তা ও মজুত সক্ষমতা: আমাদের উদাসীনতা আর কতদিন?

৫৫ বছরেও বাড়েনি জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা: ঝুঁকিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা।

৫৫ বছরেও বাড়েনি জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা: ঝুঁকিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা।
ছবি : সংগৃহীত

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা আমাদের অর্থনীতিকে আমদানিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মুখে অরক্ষিত করে তুলছে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং প্রতিটি দেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের আকস্মিক ওঠানামা মোকাবিলায় বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতও তাদের কয়েক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো বিশাল কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (SPR) গড়ে তুলেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো যায়নি।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা মাত্র সোয়া ১১ লাখ টন। যেখানে উন্নত দেশগুলো ৯০ দিন থেকে ছয় মাসের মজুত নিশ্চিত করছে, সেখানে আমাদের এই সীমিত মজুত অত্যন্ত নগণ্য। কোনো কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে বা তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক চাপের মুখে পড়তে হয়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।


জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের বড় দুটি সম্ভাবনা ছিল— এসপিএম (Single Point Mooring) প্রকল্প এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-টু (ERL Unit-2)। মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সোয়া দুই লাখ টন তেল সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অপারেটর নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতায় গত দুই বছর ধরে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটটি ১৬ বছর ধরে সিদ্ধান্তহীনতা ও বাস্তবায়ন জটিলতায় আটকে আছে। এটি চালু হলে আমাদের তেল পরিশোধন ও মজুত সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতকে কেবল মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিক খাত হিসেবে দেখলে রাষ্ট্রের কৌশলগত মজুত গড়ার উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অথচ বছরের পর বছর ধরে প্রকল্পগুলোর স্থবিরতা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নীরবতা এই খাতের প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে।

আমরা মনে করি, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং সময়ের দাবি। এসপিএম প্রকল্প দ্রুত কার্যকর করা এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের জটিলতা নিরসন করে সরকারকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নতুবা আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য অস্থিরতাও আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে বারবার সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।

বিষয় : জ্বালানি তেল সবার আগে, সঠিক সংবাদ — দৈনিক নতুন আলো সম্পাদকীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বিপিসি

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


৫৫ বছরেও বাড়েনি জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা: ঝুঁকিতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা।

প্রকাশের তারিখ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা আমাদের অর্থনীতিকে আমদানিনির্ভর ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মুখে অরক্ষিত করে তুলছে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং প্রতিটি দেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের আকস্মিক ওঠানামা মোকাবিলায় বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতও তাদের কয়েক মাসের চাহিদা মেটানোর মতো বিশাল কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (SPR) গড়ে তুলেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো যায়নি।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা মাত্র সোয়া ১১ লাখ টন। যেখানে উন্নত দেশগুলো ৯০ দিন থেকে ছয় মাসের মজুত নিশ্চিত করছে, সেখানে আমাদের এই সীমিত মজুত অত্যন্ত নগণ্য। কোনো কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে বা তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক চাপের মুখে পড়তে হয়, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা, কৃষি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে।


জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের বড় দুটি সম্ভাবনা ছিল— এসপিএম (Single Point Mooring) প্রকল্প এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-টু (ERL Unit-2)। মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সোয়া দুই লাখ টন তেল সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়া যেত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অপারেটর নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতায় গত দুই বছর ধরে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটটি ১৬ বছর ধরে সিদ্ধান্তহীনতা ও বাস্তবায়ন জটিলতায় আটকে আছে। এটি চালু হলে আমাদের তেল পরিশোধন ও মজুত সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি খাতকে কেবল মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিক খাত হিসেবে দেখলে রাষ্ট্রের কৌশলগত মজুত গড়ার উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অথচ বছরের পর বছর ধরে প্রকল্পগুলোর স্থবিরতা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নীরবতা এই খাতের প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তুলছে।


আমরা মনে করি, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং সময়ের দাবি। এসপিএম প্রকল্প দ্রুত কার্যকর করা এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের জটিলতা নিরসন করে সরকারকে এখনই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নতুবা আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য অস্থিরতাও আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে বারবার সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো