চরিত্র পরিচিতি:
অর্ণব : একজন টেলিকম কোম্পানির কর্মী, বাস্তববাদী, কিন্তু হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে জানে। একরাশ অভিজ্ঞতা নিয়ে চলাফেরা করে, কিন্তু অনুভবের জায়গাটা এখনও নরম।
অহনা বিনতে প্রেমা : এক সময়ের পরীক্ষার্থী, বর্তমানে একজন শিক্ষিকা। অর্ণবের জীবনে একদিনের দেখা হলেও, কিছু সম্পর্ক এমনই হয়— অল্প সময়ের, কিন্তু গভীর ছায়ার মতো থেকে যায়।
শিমু : অর্ণবের স্ত্রী, আত্মসম্মানী, যুক্তিবাদী এবং মনের গভীরে তীব্র ভালোবাসা লুকিয়ে রাখে। সে নিজের জায়গা জানে, কিন্তু হৃদয়ের প্রশ্নগুলো সবসময় শব্দ হয়ে ওঠে না।
অধ্যায় ১: একদিন বৃষ্টির দিন
ঢাকার সকালগুলো সাধারণত খুব ব্যস্ত হয়।
মানুষের ভিড়, গাড়ির শব্দ, অফিসগামী ক্লান্ত মুখ— সব মিলিয়ে শহরটা যেন প্রতিদিন নতুন এক যুদ্ধে নামে।
কিন্তু সেদিন সকালটা আলাদা ছিল।
আকাশ কালো মেঘে ঢাকা।
হঠাৎ নেমে আসা প্রবল বৃষ্টিতে পুরো শহর থমকে গেছে। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে নীয়ন আলো কাঁপছে।
অর্ণব তখন অফিসে যাবার তাড়ায় ভিজতে ভিজতেই একটা দোকানের ছাউনির নিচে এসে দাঁড়ায়।
টেলিকম কোম্পানির চাকরি— সময়ের হিসাব ছাড়া সেখানে কিছু চলে না।
শার্টের হাতা থেকে পানি ঝরছিল। বিরক্ত মুখে ঘড়ি দেখছিল সে।
ঠিক তখনই পাশে খুব নরম একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— ভাইয়া… একটু হেল্প করবেন?
অর্ণব তাকিয়ে দেখলো, একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা সালোয়ার-কামিজ ভিজে শরীরের সঙ্গে লেগে গেছে হালকা করে। চুলের ডগা থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। কিন্তু সবচেয়ে আলাদা ছিল মেয়েটার চোখ।
অদ্ভুত শান্ত, অথচ ভীষণ অস্থির।
— বলুন।
— আমার পরীক্ষা আছে। ফার্মগেট যেতে হবে… কিন্তু কোনো রিকশা পাচ্ছি না।
অর্ণব কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
এই শহরে মানুষ প্রতিদিন হাজার অনুরোধ শোনে।
কিন্তু সব অনুরোধ হৃদয় ছুঁয়ে যায় না।
সে জানে না কেন, মেয়েটার কথায় না বলতে পারলো না।
বৃষ্টি কমে যাওয়াতে একটা রিকশা পেয়ে দু’জন উঠে বসলো।
বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার পাশের গাছগুলো ভিজে নুয়ে পড়েছে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মেয়েটা বললো—
— আমি অহনা বিনতে প্রেমা।
অর্ণব হালকা হেসে বললো—
— সুন্দর নাম।
প্রেমা একটু হেসে জানালার বাইরে তাকালো। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলো নিজের কথা।
বাবা নেই।
মা অসুস্থ।
ছোট ভাইটা এখনও স্কুলে পড়ে।
অর্ণব শুনছিল।
মনে হচ্ছিল, মেয়েটা শুধু গল্প বলছে না— নিজের জীবনের ভার একটু একটু করে নামিয়ে রাখছে।
ফার্মগেট পৌঁছে রিকশা থামলে প্রেমা ব্যাগটা শক্ত করে ধরে বলেছিল—
— আজকের উপকার আমি ভুলবো না।
অর্ণব তখন হেসে বলেছিল—
— এই শহরে আবার দেখা হয়ে গেলে, তখন শোধ করে দেবেন।
প্রেমাও হেসেছিল।
সেই হাসিটা অর্ণব বহুদিন ভুলতে পারেনি।
কারণ কিছু হাসি থাকে, যা মানুষের ভিতরে খুব নিঃশব্দে জায়গা করে নেয়।
অধ্যায় ২: ছেঁড়া পৃষ্ঠা
দুই বছর কেটে গেছে।
সময় খুব অদ্ভুতভাবে মানুষকে বদলে দেয়।
কেউ আরও বাস্তববাদী হয়ে যায়, কেউ আরও নরম।
অর্ণব এখন বিবাহিত।
শিমু তার স্ত্রী।
শান্ত, আত্মসম্মানী, আর ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ একটা মেয়ে।
তাদের সংসার খারাপ না।
বরং বাইরে থেকে দেখলে অনেকেই বলবে— সুখী।
কিন্তু সব সুখ কি চোখে দেখা যায়?
শিমু মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতো, বৃষ্টি নামলে অর্ণব অকারণে চুপ হয়ে যায়। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ।
একদিন পুরোনো বই গোছাতে গিয়ে একটা ডায়েরি খুঁজে পেল সে।
ডায়েরির ভেতর একটা ছেঁড়া পৃষ্ঠা।
সেখানে লেখা—
সেদিন বৃষ্টির মধ্যে একটা মেয়েকে দেখেছিলাম।
অচেনা ছিল।
তবু কেন জানি মনে হয়েছিল, তাকে অনেক আগে থেকেই চিনি…
শিমুর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন খালি হয়ে গেল।
সে কোনো প্রশ্ন করেনি।
কারণ কিছু প্রশ্ন মানুষ ভয় পায়।
উত্তরের জন্য না—
উত্তর বদলে দিতে পারে সবকিছু বলে।
সেদিন রাতে অর্ণব পাশেই ঘুমাচ্ছিল।
আর শিমু চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
ভাবছিল—
একজন মানুষকে পুরোপুরি পাওয়া কি আদৌ সম্ভব?
অধ্যায় ৩: মুখোমুখি
বিকেলের কফিশপটা খুব ভিড় ছিল না।
বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল।
শিমু বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছিল।
ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে থামলো কোণের টেবিলে বসা এক মেয়ের ওপর।
চেনা লাগলো।
মুহূর্তের মধ্যে নামটা মনে পড়ে গেল—
অহনা বিনতে প্রেমা।
শিমুর বুক ধক করে উঠলো।
সে কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে গিয়ে সামনে বসল।
— আপনি প্রেমা?
মেয়েটা তাকালো।
একটু অবাক হলো।
— জি… আপনি?
— আমি শিমু। অর্ণবের স্ত্রী।
এক মুহূর্তে চারপাশের সব শব্দ যেন থেমে গেল।
প্রেমা খুব আস্তে হাসলো।
একটা শান্ত, ক্লান্ত হাসি।
— ভেবেছিলাম, কোনো একদিন আপনার সঙ্গে দেখা হবে।
শিমু চুপ করে রইল।
প্রেমা কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বললো—
— অর্ণব খুব ভালো মানুষ।
সে আমার জীবনে এসেছিল একটা আশ্রয়ের মতো…
কিন্তু সে কখনো আমার ছিল না।
— তাহলে?
— কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায় না… শুধু সম্মান করা যায়।
শিমুর চোখ ভিজে উঠলো অজান্তেই।
প্রেমা ধীরে বললো—
— আপনি তার ঠিকানা।
আমি শুধু একটা বৃষ্টিভেজা স্মৃতি।
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও বেড়ে গেছে।
আর শিমুর মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটাকে ঘৃণা করা যায় না।
বরং অদ্ভুত এক মায়া জন্মাচ্ছে।
অধ্যায় ৪: ফিরে আসা
রাতে বাসায় ফিরে শিমু দেখলো অর্ণব বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
বৃষ্টি পড়ছে।
সিগারেট ধরায়নি আজ। শুধু চুপচাপ আকাশ দেখছে।
শিমু পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
— আজ প্রেমার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
অর্ণবের চোখ কেঁপে উঠলো সামান্য।
কিন্তু সে চুপ করে রইল।
— সে তোমাকে খুব সম্মান করে।
অর্ণব নিচের ভেজা রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে বললো—
— কিছু সম্পর্ককে নাম দেওয়া যায় না, শিমু।
— কিন্তু ভালোবাসা?
অর্ণব এবার তার দিকে তাকালো।
চোখদুটো ক্লান্ত।
— আমি কখনো তোমাকে কম ভালোবাসিনি।
শিমুর বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানগুলো ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগলো।
সে খুব আস্তে অর্ণবের হাত ধরলো।
— তাহলে আবার নতুন করে শুরু করি?
অর্ণব হেসে ফেললো।
বৃষ্টির ফোঁটা এসে দু’জনের হাত ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
আর শহরটা তখন নীরবে আরেকটা গল্প নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখছিল।
অধ্যায় ৫: প্রেমার চিঠি
এক বছর পর, সিলেট ভ্রমণের সময় হোটেলে অর্ণব এক চিঠি পায়—
প্রেরক: অহনা বিনতে প্রেমা।
চিঠির ভেতরে ছোট্ট কয়েকটা লাইন—
অর্ণব,
মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে শুধু পথ দেখাতে।
আপনি আমার জীবনে তেমনই ছিলেন।
আপনার সঙ্গে আমার গল্পটা অসমাপ্ত থেকে গেলো।
কারণ সব গল্পের শেষ একসাথে হওয়া নয়।
শিমুকে ভালো রাখবেন।
আর বৃষ্টি নামলে মাঝে মাঝে আমাকে মনে করবেন।
— প্রেমা
অর্ণব চিঠি পড়ে হাসে। শিমু পাশে এসে বলে—
–কী লিখেছে?
–একটা বিদায়, খুব শান্ত বিদায়।
শেষ অধ্যায়: একদিন আবার বৃষ্টি হবে
বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। জানালায় দাঁড়িয়ে শিমু আর অর্ণব একসাথে তাকিয়ে থাকে। হাত ধরা, চুপচাপ।
তারা জানে—
জীবনে কেউ কেউ আসে রঙধনু হয়ে, কেউ হয় মেঘ।
কিন্তু রোদ আর বৃষ্টির এই খেলায়, ভালোবাসাই সবশেষে রয়ে যায় পাশে।
✍️ নাহিদ হোসেন
বিষয় : গল্প একদিন বৃষ্টির দিন

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
চরিত্র পরিচিতি:
অর্ণব : একজন টেলিকম কোম্পানির কর্মী, বাস্তববাদী, কিন্তু হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে জানে। একরাশ অভিজ্ঞতা নিয়ে চলাফেরা করে, কিন্তু অনুভবের জায়গাটা এখনও নরম।
অহনা বিনতে প্রেমা : এক সময়ের পরীক্ষার্থী, বর্তমানে একজন শিক্ষিকা। অর্ণবের জীবনে একদিনের দেখা হলেও, কিছু সম্পর্ক এমনই হয়— অল্প সময়ের, কিন্তু গভীর ছায়ার মতো থেকে যায়।
শিমু : অর্ণবের স্ত্রী, আত্মসম্মানী, যুক্তিবাদী এবং মনের গভীরে তীব্র ভালোবাসা লুকিয়ে রাখে। সে নিজের জায়গা জানে, কিন্তু হৃদয়ের প্রশ্নগুলো সবসময় শব্দ হয়ে ওঠে না।
অধ্যায় ১: একদিন বৃষ্টির দিন
ঢাকার সকালগুলো সাধারণত খুব ব্যস্ত হয়।
মানুষের ভিড়, গাড়ির শব্দ, অফিসগামী ক্লান্ত মুখ— সব মিলিয়ে শহরটা যেন প্রতিদিন নতুন এক যুদ্ধে নামে।
কিন্তু সেদিন সকালটা আলাদা ছিল।
আকাশ কালো মেঘে ঢাকা।
হঠাৎ নেমে আসা প্রবল বৃষ্টিতে পুরো শহর থমকে গেছে। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে নীয়ন আলো কাঁপছে।
অর্ণব তখন অফিসে যাবার তাড়ায় ভিজতে ভিজতেই একটা দোকানের ছাউনির নিচে এসে দাঁড়ায়।
টেলিকম কোম্পানির চাকরি— সময়ের হিসাব ছাড়া সেখানে কিছু চলে না।
শার্টের হাতা থেকে পানি ঝরছিল। বিরক্ত মুখে ঘড়ি দেখছিল সে।
ঠিক তখনই পাশে খুব নরম একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
— ভাইয়া… একটু হেল্প করবেন?
অর্ণব তাকিয়ে দেখলো, একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা সালোয়ার-কামিজ ভিজে শরীরের সঙ্গে লেগে গেছে হালকা করে। চুলের ডগা থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে। কিন্তু সবচেয়ে আলাদা ছিল মেয়েটার চোখ।
অদ্ভুত শান্ত, অথচ ভীষণ অস্থির।
— বলুন।
— আমার পরীক্ষা আছে। ফার্মগেট যেতে হবে… কিন্তু কোনো রিকশা পাচ্ছি না।
অর্ণব কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
এই শহরে মানুষ প্রতিদিন হাজার অনুরোধ শোনে।
কিন্তু সব অনুরোধ হৃদয় ছুঁয়ে যায় না।
সে জানে না কেন, মেয়েটার কথায় না বলতে পারলো না।
বৃষ্টি কমে যাওয়াতে একটা রিকশা পেয়ে দু’জন উঠে বসলো।
বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার পাশের গাছগুলো ভিজে নুয়ে পড়েছে।
কিছুক্ষণ নীরবতার পর মেয়েটা বললো—
— আমি অহনা বিনতে প্রেমা।
অর্ণব হালকা হেসে বললো—
— সুন্দর নাম।
প্রেমা একটু হেসে জানালার বাইরে তাকালো। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলো নিজের কথা।
বাবা নেই।
মা অসুস্থ।
ছোট ভাইটা এখনও স্কুলে পড়ে।
অর্ণব শুনছিল।
মনে হচ্ছিল, মেয়েটা শুধু গল্প বলছে না— নিজের জীবনের ভার একটু একটু করে নামিয়ে রাখছে।
ফার্মগেট পৌঁছে রিকশা থামলে প্রেমা ব্যাগটা শক্ত করে ধরে বলেছিল—
— আজকের উপকার আমি ভুলবো না।
অর্ণব তখন হেসে বলেছিল—
— এই শহরে আবার দেখা হয়ে গেলে, তখন শোধ করে দেবেন।
প্রেমাও হেসেছিল।
সেই হাসিটা অর্ণব বহুদিন ভুলতে পারেনি।
কারণ কিছু হাসি থাকে, যা মানুষের ভিতরে খুব নিঃশব্দে জায়গা করে নেয়।
অধ্যায় ২: ছেঁড়া পৃষ্ঠা
দুই বছর কেটে গেছে।
সময় খুব অদ্ভুতভাবে মানুষকে বদলে দেয়।
কেউ আরও বাস্তববাদী হয়ে যায়, কেউ আরও নরম।
অর্ণব এখন বিবাহিত।
শিমু তার স্ত্রী।
শান্ত, আত্মসম্মানী, আর ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ একটা মেয়ে।
তাদের সংসার খারাপ না।
বরং বাইরে থেকে দেখলে অনেকেই বলবে— সুখী।
কিন্তু সব সুখ কি চোখে দেখা যায়?
শিমু মাঝে মাঝে লক্ষ্য করতো, বৃষ্টি নামলে অর্ণব অকারণে চুপ হয়ে যায়। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে অনেকক্ষণ।
একদিন পুরোনো বই গোছাতে গিয়ে একটা ডায়েরি খুঁজে পেল সে।
ডায়েরির ভেতর একটা ছেঁড়া পৃষ্ঠা।
সেখানে লেখা—
সেদিন বৃষ্টির মধ্যে একটা মেয়েকে দেখেছিলাম।
অচেনা ছিল।
তবু কেন জানি মনে হয়েছিল, তাকে অনেক আগে থেকেই চিনি…
শিমুর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন খালি হয়ে গেল।
সে কোনো প্রশ্ন করেনি।
কারণ কিছু প্রশ্ন মানুষ ভয় পায়।
উত্তরের জন্য না—
উত্তর বদলে দিতে পারে সবকিছু বলে।
সেদিন রাতে অর্ণব পাশেই ঘুমাচ্ছিল।
আর শিমু চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
ভাবছিল—
একজন মানুষকে পুরোপুরি পাওয়া কি আদৌ সম্ভব?
অধ্যায় ৩: মুখোমুখি
বিকেলের কফিশপটা খুব ভিড় ছিল না।
বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল।
শিমু বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছিল।
ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে থামলো কোণের টেবিলে বসা এক মেয়ের ওপর।
চেনা লাগলো।
মুহূর্তের মধ্যে নামটা মনে পড়ে গেল—
অহনা বিনতে প্রেমা।
শিমুর বুক ধক করে উঠলো।
সে কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে গিয়ে সামনে বসল।
— আপনি প্রেমা?
মেয়েটা তাকালো।
একটু অবাক হলো।
— জি… আপনি?
— আমি শিমু। অর্ণবের স্ত্রী।
এক মুহূর্তে চারপাশের সব শব্দ যেন থেমে গেল।
প্রেমা খুব আস্তে হাসলো।
একটা শান্ত, ক্লান্ত হাসি।
— ভেবেছিলাম, কোনো একদিন আপনার সঙ্গে দেখা হবে।
শিমু চুপ করে রইল।
প্রেমা কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বললো—
— অর্ণব খুব ভালো মানুষ।
সে আমার জীবনে এসেছিল একটা আশ্রয়ের মতো…
কিন্তু সে কখনো আমার ছিল না।
— তাহলে?
— কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায় না… শুধু সম্মান করা যায়।
শিমুর চোখ ভিজে উঠলো অজান্তেই।
প্রেমা ধীরে বললো—
— আপনি তার ঠিকানা।
আমি শুধু একটা বৃষ্টিভেজা স্মৃতি।
বাইরে তখন বৃষ্টি আরও বেড়ে গেছে।
আর শিমুর মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটাকে ঘৃণা করা যায় না।
বরং অদ্ভুত এক মায়া জন্মাচ্ছে।
অধ্যায় ৪: ফিরে আসা
রাতে বাসায় ফিরে শিমু দেখলো অর্ণব বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
বৃষ্টি পড়ছে।
সিগারেট ধরায়নি আজ। শুধু চুপচাপ আকাশ দেখছে।
শিমু পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
— আজ প্রেমার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
অর্ণবের চোখ কেঁপে উঠলো সামান্য।
কিন্তু সে চুপ করে রইল।
— সে তোমাকে খুব সম্মান করে।
অর্ণব নিচের ভেজা রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে বললো—
— কিছু সম্পর্ককে নাম দেওয়া যায় না, শিমু।
— কিন্তু ভালোবাসা?
অর্ণব এবার তার দিকে তাকালো।
চোখদুটো ক্লান্ত।
— আমি কখনো তোমাকে কম ভালোবাসিনি।
শিমুর বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমানগুলো ধীরে ধীরে গলে যেতে লাগলো।
সে খুব আস্তে অর্ণবের হাত ধরলো।
— তাহলে আবার নতুন করে শুরু করি?
অর্ণব হেসে ফেললো।
বৃষ্টির ফোঁটা এসে দু’জনের হাত ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
আর শহরটা তখন নীরবে আরেকটা গল্প নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখছিল।
অধ্যায় ৫: প্রেমার চিঠি
এক বছর পর, সিলেট ভ্রমণের সময় হোটেলে অর্ণব এক চিঠি পায়—
প্রেরক: অহনা বিনতে প্রেমা।
চিঠির ভেতরে ছোট্ট কয়েকটা লাইন—
অর্ণব,
মানুষের জীবনে কিছু মানুষ আসে শুধু পথ দেখাতে।
আপনি আমার জীবনে তেমনই ছিলেন।
আপনার সঙ্গে আমার গল্পটা অসমাপ্ত থেকে গেলো।
কারণ সব গল্পের শেষ একসাথে হওয়া নয়।
শিমুকে ভালো রাখবেন।
আর বৃষ্টি নামলে মাঝে মাঝে আমাকে মনে করবেন।
— প্রেমা
অর্ণব চিঠি পড়ে হাসে। শিমু পাশে এসে বলে—
–কী লিখেছে?
–একটা বিদায়, খুব শান্ত বিদায়।
শেষ অধ্যায়: একদিন আবার বৃষ্টি হবে
বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। জানালায় দাঁড়িয়ে শিমু আর অর্ণব একসাথে তাকিয়ে থাকে। হাত ধরা, চুপচাপ।
তারা জানে—
জীবনে কেউ কেউ আসে রঙধনু হয়ে, কেউ হয় মেঘ।
কিন্তু রোদ আর বৃষ্টির এই খেলায়, ভালোবাসাই সবশেষে রয়ে যায় পাশে।
✍️ নাহিদ হোসেন

আপনার মতামত লিখুন