ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই একটা বিষয় বেশ চোখে পড়ছে—আমাদের দেশের রাজনীতি বা সমসাময়িক খবরের পাশাপাশি প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি নেট দুনিয়ায় একটি বিশেষ স্মার্টফোনের ছবি ও তথ্য বেশ ভাইরাল হয়েছে, যা নিয়ে বলা হচ্ছে এটি নাকি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যবহৃত নিরাপদ ফোন। একজন সাধারণ নাগরিক এবং প্রযুক্তি সচেতন পাঠক হিসেবে বিষয়টি আমাকে বেশ কৌতূহলী করে তুলেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান বা শীর্ষ নীতি-নির্ধারকেরা আসলে কেমন ফোন ব্যবহার করেন? তাঁদের সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রটোকল বা নিরাপত্তা কতটুকু নিরেট?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন লেখা ও বৈশ্বিক গণমাধ্যম ঘেঁটে যা বুঝলাম, ডিজিটাল যুগে বাস করলেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের স্মার্টফোন আর রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের যোগাযোগের মাধ্যম আকাশ-পাতাল তফাত। রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক প্রধান কিংবা বিলিয়নেয়ার ব্যবসায়ীরা সাধারণ আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড সেটের ওপর ভরসা করে রাষ্ট্রীয় গোপন আলাপ সারেন না। তাঁদের জন্য তৈরি হয় বিশেষভাবে কাস্টমাইজড, মিলিটারি-গ্রেড এনক্রিপ্টেড এবং হ্যাকিং-প্রুফ ডিভাইস।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর যে ফোনটি নিয়ে এত চর্চা হচ্ছে, প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে—আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডে সেটি যথেষ্ট উন্নত হলেও বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শীর্ষ ১০টি ডিভাইসের তালিকায় কিন্তু সেটির নাম নেই। তাহলে বিশ্বের শীর্ষ সিকিউর ফোন কোনগুলো এবং পরাশক্তি দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরাই বা কী ব্যবহার করেন?
তথ্য বলছে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যে আইফোন ব্যবহার করেন, তা সাধারণ অ্যাপল স্টোরের আইফোন নয়। সেটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ)-এর কাস্টম নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে মডিফাইড করা। অন্যদিকে রাশিয়ার ক্রেমলিন বা ভ্লাদিমির পুতিন মোবাইল ফোনের চেয়ে তাদের নিজস্ব কাস্টমাইজড ল্যান্ডলাইন ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর বেশি ভরসা করেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ব্যবহার করেন বিশেষ ডেটা এনক্রিপশন চিপ সম্বলিত BlackBerry Secusmart ফোন। চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো তো তাদের পুরো সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থাই নিজস্ব সাইবার বিশেষজ্ঞদের কঠোর তত্ত্বাবধানে তৈরি করা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের অধীনে পরিচালনা করে।
বিশ্বজুড়ে পিউরিজম লাইব্রেম ৫ (Purism Librem 5), বিট্টিয়াম টাফ মোবাইল, ব্ল্যাকফোন ২ কিংবা সিরিন ল্যাবস সোলারিনের মতো এমন কিছু আল্ট্রা-সিকিউর ফোন রয়েছে, যেগুলোতে সাধারণ হ্যাকার তো দূরের কথা, বড় কোনো সাইবার সংস্থাও সহজে আড়ি পাততে পারে না। কোনো কোনো ফোনে তো হার্ডওয়্যার কিল সুইচ থাকে, যা অন করলেই ফোনের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন চিরতরে অফ হয়ে যায়।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সাইবার নিরাপত্তা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অংশ। সেই প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সাইবার সুরক্ষায় আরও আধুনিক ও নিরেট নিরাপত্তা প্রটোকল থাকা উচিত। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আগামীতে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-নির্ভর সাইবার হামলা কিংবা কোয়ান্টাম হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে, তখন আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র থাকে—একজন সাধারণ সচেতন নাগরিক হিসেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: নাহিদ হোসেন, সিনিয়র সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার ,কুষ্টিয়া।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই একটা বিষয় বেশ চোখে পড়ছে—আমাদের দেশের রাজনীতি বা সমসাময়িক খবরের পাশাপাশি প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি নেট দুনিয়ায় একটি বিশেষ স্মার্টফোনের ছবি ও তথ্য বেশ ভাইরাল হয়েছে, যা নিয়ে বলা হচ্ছে এটি নাকি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যবহৃত নিরাপদ ফোন। একজন সাধারণ নাগরিক এবং প্রযুক্তি সচেতন পাঠক হিসেবে বিষয়টি আমাকে বেশ কৌতূহলী করে তুলেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান বা শীর্ষ নীতি-নির্ধারকেরা আসলে কেমন ফোন ব্যবহার করেন? তাঁদের সাধারণ স্মার্টফোন ব্যবহারের প্রটোকল বা নিরাপত্তা কতটুকু নিরেট?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন লেখা ও বৈশ্বিক গণমাধ্যম ঘেঁটে যা বুঝলাম, ডিজিটাল যুগে বাস করলেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের স্মার্টফোন আর রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের যোগাযোগের মাধ্যম আকাশ-পাতাল তফাত। রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক প্রধান কিংবা বিলিয়নেয়ার ব্যবসায়ীরা সাধারণ আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড সেটের ওপর ভরসা করে রাষ্ট্রীয় গোপন আলাপ সারেন না। তাঁদের জন্য তৈরি হয় বিশেষভাবে কাস্টমাইজড, মিলিটারি-গ্রেড এনক্রিপ্টেড এবং হ্যাকিং-প্রুফ ডিভাইস।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর যে ফোনটি নিয়ে এত চর্চা হচ্ছে, প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে—আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডে সেটি যথেষ্ট উন্নত হলেও বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ শীর্ষ ১০টি ডিভাইসের তালিকায় কিন্তু সেটির নাম নেই। তাহলে বিশ্বের শীর্ষ সিকিউর ফোন কোনগুলো এবং পরাশক্তি দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরাই বা কী ব্যবহার করেন?
তথ্য বলছে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যে আইফোন ব্যবহার করেন, তা সাধারণ অ্যাপল স্টোরের আইফোন নয়। সেটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ)-এর কাস্টম নিরাপত্তা প্রযুক্তিতে মডিফাইড করা। অন্যদিকে রাশিয়ার ক্রেমলিন বা ভ্লাদিমির পুতিন মোবাইল ফোনের চেয়ে তাদের নিজস্ব কাস্টমাইজড ল্যান্ডলাইন ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর বেশি ভরসা করেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ব্যবহার করেন বিশেষ ডেটা এনক্রিপশন চিপ সম্বলিত BlackBerry Secusmart ফোন। চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো তো তাদের পুরো সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থাই নিজস্ব সাইবার বিশেষজ্ঞদের কঠোর তত্ত্বাবধানে তৈরি করা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের অধীনে পরিচালনা করে।
বিশ্বজুড়ে পিউরিজম লাইব্রেম ৫ (Purism Librem 5), বিট্টিয়াম টাফ মোবাইল, ব্ল্যাকফোন ২ কিংবা সিরিন ল্যাবস সোলারিনের মতো এমন কিছু আল্ট্রা-সিকিউর ফোন রয়েছে, যেগুলোতে সাধারণ হ্যাকার তো দূরের কথা, বড় কোনো সাইবার সংস্থাও সহজে আড়ি পাততে পারে না। কোনো কোনো ফোনে তো হার্ডওয়্যার কিল সুইচ থাকে, যা অন করলেই ফোনের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন চিরতরে অফ হয়ে যায়।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সাইবার নিরাপত্তা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের অংশ। সেই প্রেক্ষাপট থেকে বিচার করলে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সাইবার সুরক্ষায় আরও আধুনিক ও নিরেট নিরাপত্তা প্রটোকল থাকা উচিত। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আগামীতে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-নির্ভর সাইবার হামলা কিংবা কোয়ান্টাম হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে, তখন আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানদের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেন পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র থাকে—একজন সাধারণ সচেতন নাগরিক হিসেবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক: নাহিদ হোসেন, সিনিয়র সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার ,কুষ্টিয়া।

আপনার মতামত লিখুন