মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

গল্প

শেষ বিকেলের বাঁশি

শেষ বিকেলের বাঁশি
ছবি : দৈনিক নতুন আলো

গ্রামের নাম কাশিপুর। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খাল আর কিছু টিনের ঘর।

সেই গ্রামেরই এক ছেলে রশিদ।

রশিদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল তার বাঁশি। কাজের ফাঁকে, অবসরে, এমনকি মন খারাপের সময়ও সে বাঁশি বাজাত। তার স্ত্রী মোমেনা প্রায়ই মজা করে বলত,

— তোমার যদি বাঁশি বিয়া করা যাইত, তাইলে আমারে লাগতো না।

রশিদ হেসে বলত,

— বাঁশি মন ভালো রাখে, আর তুমি জীবন ভালো রাখো।

তাদের সংসার ছোট। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী মোমেনা আর সাত বছরের ছেলে রাকিব।

অভাব ছিল, কিন্তু শান্তি ছিল।

একদিন ভয়ংকর ঝড়ে তাদের ঘরের অর্ধেক উড়ে গেল। টিনের চাল ছিটকে পড়ল পুকুরে। ঝড় থামার পর বৃদ্ধ মা অনেকক্ষণ ভাঙা ঘরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

রশিদ বুঝল, এভাবে আর চলবে না।

সেদিন রাতে মায়ের পাশে বসে বলল,

— মা, শহরে যাই। কিছু টাকা জমাই। একটা পাকা ঘর করমু।

বৃদ্ধ মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— গ্রামের মাটি ছাইড়া কেমনে থাকমু বাজান?

— কিছুদিনের জন্য যামু মা।

অবশেষে সবাই রাজি হলো।

ঢাকা শহর তাদের স্বপ্নের মতো ছিল না।

ছোট্ট একটা বস্তির ঘরে জায়গা হলো।

রশিদ দিনভর রিকশা চালায়। মোমেনা বাসাবাড়িতে কাজ করে। বৃদ্ধ মা রাকিবকে সামলায়।

কষ্ট ছিল, কিন্তু স্বপ্নও ছিল।

রাতে খাওয়ার পর রাকিব বাবার পাশে শুয়ে বলত,

— আব্বা, আমি বড় হইয়া তোমার জন্য বড় ঘর বানামু।

রশিদ ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলত,

— আগে বড় হ।

একদিন শহরে উত্তেজনা শুরু হলো।

মিছিল, স্লোগান, মানুষের দৌড়ঝাঁপ।

বস্তির বাচ্চারাও কৌতূহলী হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াত।

রাকিবও যেত।

সেদিন দুপুরে মোমেনা কাজে গেছে, রশিদ রিকশা নিয়ে বেরিয়েছে।

হঠাৎ বস্তিতে খবর এলো—

একটা শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধ মা দেখলেন, মাটিতে পড়ে আছে তার নাতি।

রাকিব।

চোখ দুটো বন্ধ।

শরীর নিথর।

বৃদ্ধ মা বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলেন।

— ও আল্লাহ, আমার নাতিডারে ফেরত দাও।

সন্ধ্যায় রশিদ ফিরে এসে ছেলের মুখ দেখে বসে পড়ল।

কাঁদতেও পারছিল না।

মনে হচ্ছিল, পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেছে।

মোমেনা ফিরে এসে ছেলের নিথর শরীর জড়িয়ে ধরল।

তার কান্নার শব্দে পুরো বস্তি স্তব্ধ হয়ে গেল।

দুই দিন পর তারা শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে এলো।

স্বপ্নগুলো আর সঙ্গে ফিরল না।

ফিরল শুধু ছোট্ট একটা কবর।

রশিদ আবার খেতে কাজ শুরু করল।

মোমেনা আবার চুলায় ভাত বসাল।

বৃদ্ধ মা বিকেলে উঠানে বসে থাকেন।

মাঝে মাঝে দূরের দিকে তাকিয়ে বলেন,

— রাকিব থাকলে এখন কত বড় হইত।

কেউ উত্তর দেয় না।

শুধু সন্ধ্যার বাতাস বয়ে যায়।


আর অনেক দিন পর, এক নির্জন বিকেলে, রশিদ আবার তার পুরোনো বাঁশিটা হাতে নেয়।

বাঁশিতে সুর ওঠে।

সেই সুরে মিশে থাকে হারিয়ে যাওয়া এক শিশুর হাসি, এক মায়ের কান্না, আর এক বাবার না বলা হাজারো কষ্ট।

গ্রামের আকাশ নিঃশব্দ হয়ে সেই সুর শোনে।

বিষয় : বাঁশি কাশিপুর রশিদ

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


শেষ বিকেলের বাঁশি

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image

গ্রামের নাম কাশিপুর। ছোট্ট একটা গ্রাম। চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু খাল আর কিছু টিনের ঘর।

সেই গ্রামেরই এক ছেলে রশিদ।

রশিদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ছিল তার বাঁশি। কাজের ফাঁকে, অবসরে, এমনকি মন খারাপের সময়ও সে বাঁশি বাজাত। তার স্ত্রী মোমেনা প্রায়ই মজা করে বলত,

— তোমার যদি বাঁশি বিয়া করা যাইত, তাইলে আমারে লাগতো না।

রশিদ হেসে বলত,

— বাঁশি মন ভালো রাখে, আর তুমি জীবন ভালো রাখো।

তাদের সংসার ছোট। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী মোমেনা আর সাত বছরের ছেলে রাকিব।

অভাব ছিল, কিন্তু শান্তি ছিল।

একদিন ভয়ংকর ঝড়ে তাদের ঘরের অর্ধেক উড়ে গেল। টিনের চাল ছিটকে পড়ল পুকুরে। ঝড় থামার পর বৃদ্ধ মা অনেকক্ষণ ভাঙা ঘরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

রশিদ বুঝল, এভাবে আর চলবে না।

সেদিন রাতে মায়ের পাশে বসে বলল,

— মা, শহরে যাই। কিছু টাকা জমাই। একটা পাকা ঘর করমু।

বৃদ্ধ মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— গ্রামের মাটি ছাইড়া কেমনে থাকমু বাজান?

— কিছুদিনের জন্য যামু মা।

অবশেষে সবাই রাজি হলো।

ঢাকা শহর তাদের স্বপ্নের মতো ছিল না।

ছোট্ট একটা বস্তির ঘরে জায়গা হলো।

রশিদ দিনভর রিকশা চালায়। মোমেনা বাসাবাড়িতে কাজ করে। বৃদ্ধ মা রাকিবকে সামলায়।

কষ্ট ছিল, কিন্তু স্বপ্নও ছিল।

রাতে খাওয়ার পর রাকিব বাবার পাশে শুয়ে বলত,

— আব্বা, আমি বড় হইয়া তোমার জন্য বড় ঘর বানামু।

রশিদ ছেলের কপালে চুমু খেয়ে বলত,

— আগে বড় হ।

একদিন শহরে উত্তেজনা শুরু হলো।

মিছিল, স্লোগান, মানুষের দৌড়ঝাঁপ।

বস্তির বাচ্চারাও কৌতূহলী হয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াত।

রাকিবও যেত।

সেদিন দুপুরে মোমেনা কাজে গেছে, রশিদ রিকশা নিয়ে বেরিয়েছে।

হঠাৎ বস্তিতে খবর এলো—

একটা শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

দৌড়ে গিয়ে বৃদ্ধ মা দেখলেন, মাটিতে পড়ে আছে তার নাতি।

রাকিব।

চোখ দুটো বন্ধ।

শরীর নিথর।

বৃদ্ধ মা বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলেন।

— ও আল্লাহ, আমার নাতিডারে ফেরত দাও।

সন্ধ্যায় রশিদ ফিরে এসে ছেলের মুখ দেখে বসে পড়ল।

কাঁদতেও পারছিল না।

মনে হচ্ছিল, পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেছে।

মোমেনা ফিরে এসে ছেলের নিথর শরীর জড়িয়ে ধরল।

তার কান্নার শব্দে পুরো বস্তি স্তব্ধ হয়ে গেল।

দুই দিন পর তারা শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে এলো।

স্বপ্নগুলো আর সঙ্গে ফিরল না।

ফিরল শুধু ছোট্ট একটা কবর।

রশিদ আবার খেতে কাজ শুরু করল।

মোমেনা আবার চুলায় ভাত বসাল।

বৃদ্ধ মা বিকেলে উঠানে বসে থাকেন।

মাঝে মাঝে দূরের দিকে তাকিয়ে বলেন,

— রাকিব থাকলে এখন কত বড় হইত।

কেউ উত্তর দেয় না।

শুধু সন্ধ্যার বাতাস বয়ে যায়।


আর অনেক দিন পর, এক নির্জন বিকেলে, রশিদ আবার তার পুরোনো বাঁশিটা হাতে নেয়।

বাঁশিতে সুর ওঠে।

সেই সুরে মিশে থাকে হারিয়ে যাওয়া এক শিশুর হাসি, এক মায়ের কান্না, আর এক বাবার না বলা হাজারো কষ্ট।

গ্রামের আকাশ নিঃশব্দ হয়ে সেই সুর শোনে।


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো