মুকসুদপুর    বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
দৈনিক নতুন আলো

উপন্যাস

নীল খামের রহস্য

নীল খামের রহস্য
ছবি : দৈনিক নতুন আলো

পর্ব ৫ : অচেনা নামের মানুষ

সারা রাত ঘুম হলো না নীলার।

বাবার চিঠিতে লেখা নামটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

মোতালেব হোসেন

নামের নিচে একটি ঠিকানা।

আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—

এই নামের শেষ অংশ আরিয়ানের পদবির সঙ্গে মিলে যায়।

সকাল হতেই নীলা আরিয়ানকে ফোন করল।

— তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

আরিয়ানের গলায় অস্থিরতা।

— কী হয়েছে?

— বাবার চিঠিতে একটা নাম পেয়েছি।

— কার নাম?

— মোতালেব হোসেন।

ফোনের ওপাশে হঠাৎ নীরবতা।

এমন নীরবতা, যেন কেউ হঠাৎ শ্বাস নিতে ভুলে গেছে।

— তুমি কি নামটা চেনো?

কয়েক সেকেন্ড পর আরিয়ান বলল,

— হ্যাঁ।

— কে উনি?

— আমার বাবা।

নীলার হাত কেঁপে উঠল।


বিকেলে দু'জন দেখা করল নদীর ধারের পুরনো পার্কে।

আরিয়ান আজ খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

চোখের নিচে কালচে দাগ।

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর সে বলল,

— আমার বাবা আর তোমার বাবা বন্ধু ছিলেন।

— শুধু বন্ধু?

— না।

— তাহলে?

— তারা একসঙ্গে ব্যবসা করতেন।

নীলা অবাক।

তার বাবা তো কোনোদিন ব্যবসা করেছেন বলে শোনেনি।

— বাবা কখনো বলেননি।

— কারণ পরে সবকিছু বদলে যায়।

আরিয়ান দূরে নদীর দিকে তাকাল।

— সাত বছর আগে তোমার বাবা হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে আমার বাবাও নিখোঁজ হন।

নীলার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিল।

— কী?

— হ্যাঁ।

— তারপর?

— ছয় মাস পর আমার বাবার লাশ পাওয়া যায়।

নীলা চুপ করে গেল।

হঠাৎ তার মনে হলো, রহস্যটা যতটা ভেবেছিল তার চেয়ে অনেক বড়।


সন্ধ্যার আগে তারা ঠিকানাটা খুঁজতে বের হলো।

শহরের এক পুরনো এলাকায় ছোট্ট একটি বাড়ি।

বাড়িটা প্রায় পরিত্যক্ত।

দরজায় তালা নেই।

ভেতরে ঢুকতেই পুরনো কাঠ আর ধুলোর গন্ধ।

একটি ঘরে কিছু আসবাবপত্র এখনো রয়েছে।

দেয়ালে ঝুলছে পুরনো ছবি।

হঠাৎ নীলার চোখ একটি ছবিতে আটকে গেল।

ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

একজন তার বাবা।

একজন মোতালেব হোসেন।

আর তৃতীয় ব্যক্তি—

করিম চাচা।


— অসম্ভব!

নীলার মুখ থেকে শব্দ বেরিয়ে এল।

— চাচা তো কখনো বলেননি তারা একসঙ্গে কাজ করতেন!

আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল,

— কারণ তিনি চাননি কেউ জানুক।

ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ এলো।

ঠক!

দু'জনই চমকে উঠল।

কেউ একজন সেখানে আছে।


আরিয়ান দ্রুত এগিয়ে গেল।

দরজা খুলতেই দেখা গেল—

একজন বৃদ্ধ মানুষ কোণায় বসে আছেন।

এতটাই দুর্বল যে দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে।

বৃদ্ধ তাদের দেখে ফিসফিস করে বললেন,

— তোমরা অবশেষে এসেছো।

নীলা অবাক হয়ে বলল,

— আপনি কে?

লোকটির চোখে জল চলে এলো।

তিনি কাঁপা গলায় বললেন,

— আমি আবদুল কাদের।

— কাদের চাচা?

— না।

— তাহলে?

— আমি সেই মানুষ, যার নাম তোমাদের পরিবার সাত বছর ধরে মুছে ফেলেছে।

নীলা কিছুই বুঝতে পারছে না।

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি পুরনো চাবি বের করলেন।

— এটা তোমার বাবা আমাকে দিয়েছিলেন।

— কেন?

— তিনি বলেছিলেন, যদি কখনো তার মেয়ে আসে, তাহলে এটা তাকে দিতে।

— এই চাবি কোথায় লাগবে?

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন,

— তোমাদের পুরনো বাড়ির কুয়োর পাশে মাটির নিচে একটা লোহার বাক্স আছে।

নীলার শরীর শীতল হয়ে গেল।

— বাক্সে কী আছে?

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত এক ভয় ফুটে উঠল।

— এমন কিছু, যার জন্য মানুষ খুন হয়েছে।


ঠিক তখনই বাড়ির বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

একটি নয়।

দুটি গাড়ি।

আরিয়ান জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিল।

তার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— সর্বনাশ!

— কী হয়েছে?

— তারা আমাদের খুঁজে পেয়েছে।

— কারা?

আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল—

— করিম চাচা একা নন।

এই খেলায় আরও কেউ আছে।

আর গাড়ি থেকে যে মানুষটি নামলেন, তাকে দেখে নীলার বুক কেঁপে উঠল।

কারণ সেই মানুষটি আর কেউ নন—

তার নিজের মা।


চলবে...

বিষয় : উপন্যাস

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক নতুন আলো

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬


নীল খামের রহস্য

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

পর্ব ৫ : অচেনা নামের মানুষ

সারা রাত ঘুম হলো না নীলার।

বাবার চিঠিতে লেখা নামটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

মোতালেব হোসেন

নামের নিচে একটি ঠিকানা।

আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—

এই নামের শেষ অংশ আরিয়ানের পদবির সঙ্গে মিলে যায়।

সকাল হতেই নীলা আরিয়ানকে ফোন করল।

— তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

আরিয়ানের গলায় অস্থিরতা।

— কী হয়েছে?

— বাবার চিঠিতে একটা নাম পেয়েছি।

— কার নাম?

— মোতালেব হোসেন।

ফোনের ওপাশে হঠাৎ নীরবতা।

এমন নীরবতা, যেন কেউ হঠাৎ শ্বাস নিতে ভুলে গেছে।

— তুমি কি নামটা চেনো?

কয়েক সেকেন্ড পর আরিয়ান বলল,

— হ্যাঁ।

— কে উনি?

— আমার বাবা।

নীলার হাত কেঁপে উঠল।


বিকেলে দু'জন দেখা করল নদীর ধারের পুরনো পার্কে।

আরিয়ান আজ খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।

চোখের নিচে কালচে দাগ।

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর সে বলল,

— আমার বাবা আর তোমার বাবা বন্ধু ছিলেন।

— শুধু বন্ধু?

— না।

— তাহলে?

— তারা একসঙ্গে ব্যবসা করতেন।

নীলা অবাক।

তার বাবা তো কোনোদিন ব্যবসা করেছেন বলে শোনেনি।

— বাবা কখনো বলেননি।

— কারণ পরে সবকিছু বদলে যায়।

আরিয়ান দূরে নদীর দিকে তাকাল।

— সাত বছর আগে তোমার বাবা হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার এক সপ্তাহ আগে আমার বাবাও নিখোঁজ হন।

নীলার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিল।

— কী?

— হ্যাঁ।

— তারপর?

— ছয় মাস পর আমার বাবার লাশ পাওয়া যায়।

নীলা চুপ করে গেল।

হঠাৎ তার মনে হলো, রহস্যটা যতটা ভেবেছিল তার চেয়ে অনেক বড়।


সন্ধ্যার আগে তারা ঠিকানাটা খুঁজতে বের হলো।

শহরের এক পুরনো এলাকায় ছোট্ট একটি বাড়ি।

বাড়িটা প্রায় পরিত্যক্ত।

দরজায় তালা নেই।

ভেতরে ঢুকতেই পুরনো কাঠ আর ধুলোর গন্ধ।

একটি ঘরে কিছু আসবাবপত্র এখনো রয়েছে।

দেয়ালে ঝুলছে পুরনো ছবি।

হঠাৎ নীলার চোখ একটি ছবিতে আটকে গেল।

ছবিতে তিনজন মানুষ দাঁড়িয়ে।

একজন তার বাবা।

একজন মোতালেব হোসেন।

আর তৃতীয় ব্যক্তি—

করিম চাচা।


— অসম্ভব!

নীলার মুখ থেকে শব্দ বেরিয়ে এল।

— চাচা তো কখনো বলেননি তারা একসঙ্গে কাজ করতেন!

আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল,

— কারণ তিনি চাননি কেউ জানুক।

ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে একটা শব্দ এলো।

ঠক!

দু'জনই চমকে উঠল।

কেউ একজন সেখানে আছে।


আরিয়ান দ্রুত এগিয়ে গেল।

দরজা খুলতেই দেখা গেল—

একজন বৃদ্ধ মানুষ কোণায় বসে আছেন।

এতটাই দুর্বল যে দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে।

বৃদ্ধ তাদের দেখে ফিসফিস করে বললেন,

— তোমরা অবশেষে এসেছো।

নীলা অবাক হয়ে বলল,

— আপনি কে?

লোকটির চোখে জল চলে এলো।

তিনি কাঁপা গলায় বললেন,

— আমি আবদুল কাদের।

— কাদের চাচা?

— না।

— তাহলে?

— আমি সেই মানুষ, যার নাম তোমাদের পরিবার সাত বছর ধরে মুছে ফেলেছে।

নীলা কিছুই বুঝতে পারছে না।

বৃদ্ধ পকেট থেকে একটি পুরনো চাবি বের করলেন।

— এটা তোমার বাবা আমাকে দিয়েছিলেন।

— কেন?

— তিনি বলেছিলেন, যদি কখনো তার মেয়ে আসে, তাহলে এটা তাকে দিতে।

— এই চাবি কোথায় লাগবে?

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন,

— তোমাদের পুরনো বাড়ির কুয়োর পাশে মাটির নিচে একটা লোহার বাক্স আছে।

নীলার শরীর শীতল হয়ে গেল।

— বাক্সে কী আছে?

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত এক ভয় ফুটে উঠল।

— এমন কিছু, যার জন্য মানুষ খুন হয়েছে।


ঠিক তখনই বাড়ির বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

একটি নয়।

দুটি গাড়ি।

আরিয়ান জানালার কাছে গিয়ে উঁকি দিল।

তার মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— সর্বনাশ!

— কী হয়েছে?

— তারা আমাদের খুঁজে পেয়েছে।

— কারা?

আরিয়ান ধীরে ধীরে বলল—

— করিম চাচা একা নন।

এই খেলায় আরও কেউ আছে।

আর গাড়ি থেকে যে মানুষটি নামলেন, তাকে দেখে নীলার বুক কেঁপে উঠল।

কারণ সেই মানুষটি আর কেউ নন—

তার নিজের মা।


চলবে...


দৈনিক নতুন আলো

প্রকাশক : সাদিয়া নূর পূর্ণ
সম্পাদক : নাহিদ হোসেন
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ ছিরু মিয়া

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত দৈনিক নতুন আলো