ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ আন্তঃনগর ট্রেনটা ধীরে ধীরে রাতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে চট্টগ্রামের দিকে। জানালার ওপারে শহরের ঝলমলে আলো মিলিয়ে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে দৃশ্য—কংক্রিটের দেয়ালের জায়গায় সবুজ মাঠ, নদী আর কুয়াশার রেখা।
সেই কামরাতেই প্রথম দেখা হয়েছিল অর্ণব আর অনিন্দিতার।
অর্ণবের মুখে ছিল এক ধরনের নীরবতা, যা খুব কম মানুষই বুঝতে পারে। কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে তার চোখ দুটি যেন সবসময় কিছু খুঁজে বেড়ায়। সে যাচ্ছিল সাজেক ভ্যালিতে বেড়াতে নয়। বহু বছর আগে তার দাদার গড়ে তোলা একটি পুরোনো পাহাড়ি ইকো-রিসোর্ট বহুদিন অবহেলায় পড়ে ছিল। সেটিকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়েই সে পাহাড়ের পথে রওনা হয়েছে। শহরের সফল চাকরি ছেড়ে সে বিশ্বাস করতে শিখেছে—কিছু স্বপ্ন কেবল মুনাফার জন্য নয়, নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার জন্যও বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
আর ঠিক তার বিপরীত ছিল অনিন্দিতা।
এলোমেলো চুলে পাহাড়ি বাতাসের গন্ধ মিশে ছিল যেন আগেই। গায়ে হালকা সরিষা-রঙা শাল, কাঁধে ক্যামেরা, ঠোঁটে অবিরাম হাসি। তার কাছে পৃথিবী মানেই নতুন পথ, নতুন মানুষ আর নতুন গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে সাজেকের মেঘ ছুঁয়ে দেখার আনন্দে সে যেন ছোট্ট এক উৎসব হয়ে উঠেছিল।
রাত বাড়তে থাকল। ট্রেনের কাগজের কাপে ধোঁয়া ওঠা চা, মাঝেমধ্যে জানালায় ভেসে ওঠা নদীর কালো জল, আর একসময় ভোরের নরম আলো—সব মিলিয়ে অচেনা দু'জনের মাঝখানে জমে উঠল এক অদ্ভুত স্বস্তি।
প্রথমে কথা হয়েছিল চা নিয়ে।
—চিনি ছাড়া চা কেউ খায়? বিস্মিত চোখে জিজ্ঞেস করেছিল অনিন্দিতা।
অর্ণব হেসে বলেছিল, জীবন যখন যথেষ্ট মিষ্টি দেয় না, তখন চায়ে আর আলাদা করে চিনি দিই না।
অনিন্দিতা হেসে উঠেছিল। সেই হাসি ট্রেনের শব্দকেও কিছুক্ষণের জন্য হার মানিয়েছিল।
তারপর গল্প এগোতে লাগল। প্রিয় বই, অপছন্দের শহর, বৃষ্টির গন্ধ, হারিয়ে যাওয়া বিকেল—সবকিছু নিয়েই কথা হলো। অথচ দু'জনের কেউই বুঝতে পারেনি, এই কয়েক ঘণ্টার পরিচয় তাদের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ গল্পের প্রথম অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ট্রেন তখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। জানালার বাইরে মেঘ নেমে এসেছে সবুজ পাহাড়ের বুকে। অর্ণব একবার তাকাল অনিন্দিতার দিকে। সে তখন ক্যামেরা তুলে প্রথম সূর্যের আলো বন্দি করার চেষ্টা করছে।
অর্ণবের মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।
কিছু মানুষকে হয়তো খুব বেশি সময় লাগে না আপন মনে হতে।
কিছু যাত্রা গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য শুরু হয় না—
কারও সঙ্গে দেখা হওয়ার জন্যই শুরু হয়।
ভোরের নরম আলো ফুটতেই ট্রেনটা ধীরে ধীরে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে এসে থামল। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি থাকলেও দু'জনের চোখে ছিল নতুন পথের উচ্ছ্বাস।
স্টেশন থেকে বের হতেই পাহাড়ি বাতাসের আলাদা একটা গন্ধ যেন শহরের ব্যস্ততাকে মুহূর্তেই মুছে দিল। আগে থেকেই বুক করা চাঁদের গাড়িটা অপেক্ষা করছিল। ব্যাগপত্র গুছিয়ে অর্ণব আর অনিন্দিতা একই গাড়িতে উঠে বসল।
চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে গাড়ি যখন খাগড়াছড়ির আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়কে উঠতে শুরু করল, তখন চারপাশের দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। সবুজ পাহাড়, গভীর খাদ, বাঁশঝাড় আর মেঘের ছায়া মিলেমিশে যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি করেছে।
প্রতিটি বাঁকে মনে হচ্ছিল, পাহাড় তাদের একটু একটু করে নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে।
জানালার বাইরে মুখ বাড়িয়ে অনিন্দিতা মুগ্ধ হয়ে বলল,
— এত সুন্দর রাস্তা আমি কোনোদিন দেখিনি!
অর্ণব মৃদু হেসে তার দিকে তাকাল।
— কিছু পথ শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো তৈরি করার জন্যও হয়।
চাঁদের গাড়িটা ধীরে ধীরে মেঘ ছুঁয়ে সাজেকের দিকে এগিয়ে চলল। পাহাড়ি বাতাসে উড়ে যাওয়া অনিন্দিতার চুল আর অর্ণবের নীরব হাসির মাঝেই যেন অজান্তে শুরু হয়ে গেল তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
ফেরার দিনটা খুব দ্রুত চলে এলো।
সকালের নরম রোদে সাজেকের পাহাড়গুলো যেন আরও বেশি নীরব লাগছিল। চাঁদের গাড়িটা নিচে নামার জন্য প্রস্তুত। অনিন্দিতা আর তার বন্ধুরা ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
অর্ণব গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
অনিন্দিতা মৃদু হেসে বলল,
— তুমি ফিরবে না?
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— না। এই পাহাড়েই আমার নতুন জীবন শুরু হবে। অনেক কাজ বাকি।
কিছুক্ষণ দু'জনেই চুপ করে রইল।
বিদায়ের মুহূর্তে অনিন্দিতা ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটি বুকমার্ক বের করে অর্ণবের হাতে দিল।
বুকমার্কে লেখা ছিল—
যে মানুষ স্বপ্নের জন্য পাহাড়ে থেকে যেতে পারে, তার জন্য অপেক্ষা করাও সুন্দর।
গাড়িটা ধীরে ধীরে পাহাড়ি রাস্তা ধরে নিচে নেমে যেতে লাগল।
অনিন্দিতা জানালার কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে শেষবারের মতো তাকিয়ে রইল।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ণবকে মেঘ ধীরে ধীরে আড়াল করে দিল।
এরপর শুরু হলো দূরত্বের ভালোবাসা।
অর্ণব দিনরাত ব্যস্ত হয়ে পড়ল তার দাদার রেখে যাওয়া পুরোনো কটেজটিকে নতুন করে গড়ে তুলতে। পাহাড়ি মানুষদের নিয়ে তৈরি করতে লাগল একটি ছোট্ট ইকো-রিসোর্ট।
অন্যদিকে ঢাকায় ফিরে নিজের ব্যস্ত জীবনে ডুবে গেলেও, প্রতিদিন রাতে অনিন্দিতার ফোনে একটি ছবি এসে পৌঁছাত।
কখনও ভোরের মেঘ।
কখনও পাহাড়ের সূর্যাস্ত।
কখনও নতুন লাগানো ফুলের গাছ।
আর প্রতিটি ছবির নিচে মাত্র একটি লাইন—
আজও তোমার জন্য একটা বিকেল রেখে দিলাম।
অনিন্দিতাও উত্তর দিত।
আমি একদিন সেই বিকেলটা নিতে আসব।
এক বছর কেটে গেল।
রিসোর্টের উদ্বোধনের দিন।
সব অতিথির ভিড়ের মাঝেও অর্ণবের চোখ বারবার পাহাড়ি রাস্তার দিকে চলে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই একটি চাঁদের গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এল হালকা নীল শাল জড়ানো অনিন্দিতা।
মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
সে ধীরে ধীরে অর্ণবের সামনে এসে বলল,
— শুনেছি, এখানে একজন মানুষ তার স্বপ্নের বাড়ি বানিয়েছে। ভাবলাম, স্বপ্নটা একবার দেখে যাই।
অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
— হঠাৎ?
অনিন্দিতা মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— তুমি বলেছিলে, এখানে আমার জন্য একটা বিকেল রেখে দিয়েছ।
একটু থেমে আবার বলল,
— আমি সেই বিকেলটা নিতে এসেছি। তবে... যদি অনুমতি দাও, শুধু একটা বিকেল নয়—জীবনের বাকি সময়টাও এখানেই রেখে যেতে চাই।
অর্ণব কিছু বলল না।
শুধু নিঃশব্দে তার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।
অর্ণব
পাহাড়ের বুক বেয়ে তখন মেঘ নেমে আসছে।
দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
আর সাজেকের সেই নীরব বিকেল সাক্ষী হয়ে রইল দুই মানুষের ভালোবাসার—
যার শুরু হয়েছিল একটি ট্রেনের কামরায়,
আর যার ঠিকানা হয়ে গেল পাহাড়ের বুকে, মেঘের খুব কাছে।
বিষয় : ছোট গল্প

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬
ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ আন্তঃনগর ট্রেনটা ধীরে ধীরে রাতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে চট্টগ্রামের দিকে। জানালার ওপারে শহরের ঝলমলে আলো মিলিয়ে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে দৃশ্য—কংক্রিটের দেয়ালের জায়গায় সবুজ মাঠ, নদী আর কুয়াশার রেখা।
সেই কামরাতেই প্রথম দেখা হয়েছিল অর্ণব আর অনিন্দিতার।
অর্ণবের মুখে ছিল এক ধরনের নীরবতা, যা খুব কম মানুষই বুঝতে পারে। কালো ফ্রেমের চশমার আড়ালে তার চোখ দুটি যেন সবসময় কিছু খুঁজে বেড়ায়। সে যাচ্ছিল সাজেক ভ্যালিতে বেড়াতে নয়। বহু বছর আগে তার দাদার গড়ে তোলা একটি পুরোনো পাহাড়ি ইকো-রিসোর্ট বহুদিন অবহেলায় পড়ে ছিল। সেটিকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়েই সে পাহাড়ের পথে রওনা হয়েছে। শহরের সফল চাকরি ছেড়ে সে বিশ্বাস করতে শিখেছে—কিছু স্বপ্ন কেবল মুনাফার জন্য নয়, নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার জন্যও বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
আর ঠিক তার বিপরীত ছিল অনিন্দিতা।
এলোমেলো চুলে পাহাড়ি বাতাসের গন্ধ মিশে ছিল যেন আগেই। গায়ে হালকা সরিষা-রঙা শাল, কাঁধে ক্যামেরা, ঠোঁটে অবিরাম হাসি। তার কাছে পৃথিবী মানেই নতুন পথ, নতুন মানুষ আর নতুন গল্প। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে সাজেকের মেঘ ছুঁয়ে দেখার আনন্দে সে যেন ছোট্ট এক উৎসব হয়ে উঠেছিল।
রাত বাড়তে থাকল। ট্রেনের কাগজের কাপে ধোঁয়া ওঠা চা, মাঝেমধ্যে জানালায় ভেসে ওঠা নদীর কালো জল, আর একসময় ভোরের নরম আলো—সব মিলিয়ে অচেনা দু'জনের মাঝখানে জমে উঠল এক অদ্ভুত স্বস্তি।
প্রথমে কথা হয়েছিল চা নিয়ে।
—চিনি ছাড়া চা কেউ খায়? বিস্মিত চোখে জিজ্ঞেস করেছিল অনিন্দিতা।
অর্ণব হেসে বলেছিল, জীবন যখন যথেষ্ট মিষ্টি দেয় না, তখন চায়ে আর আলাদা করে চিনি দিই না।
অনিন্দিতা হেসে উঠেছিল। সেই হাসি ট্রেনের শব্দকেও কিছুক্ষণের জন্য হার মানিয়েছিল।
তারপর গল্প এগোতে লাগল। প্রিয় বই, অপছন্দের শহর, বৃষ্টির গন্ধ, হারিয়ে যাওয়া বিকেল—সবকিছু নিয়েই কথা হলো। অথচ দু'জনের কেউই বুঝতে পারেনি, এই কয়েক ঘণ্টার পরিচয় তাদের জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ গল্পের প্রথম অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ট্রেন তখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। জানালার বাইরে মেঘ নেমে এসেছে সবুজ পাহাড়ের বুকে। অর্ণব একবার তাকাল অনিন্দিতার দিকে। সে তখন ক্যামেরা তুলে প্রথম সূর্যের আলো বন্দি করার চেষ্টা করছে।
অর্ণবের মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।
কিছু মানুষকে হয়তো খুব বেশি সময় লাগে না আপন মনে হতে।
কিছু যাত্রা গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য শুরু হয় না—
কারও সঙ্গে দেখা হওয়ার জন্যই শুরু হয়।
ভোরের নরম আলো ফুটতেই ট্রেনটা ধীরে ধীরে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে এসে থামল। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি থাকলেও দু'জনের চোখে ছিল নতুন পথের উচ্ছ্বাস।
স্টেশন থেকে বের হতেই পাহাড়ি বাতাসের আলাদা একটা গন্ধ যেন শহরের ব্যস্ততাকে মুহূর্তেই মুছে দিল। আগে থেকেই বুক করা চাঁদের গাড়িটা অপেক্ষা করছিল। ব্যাগপত্র গুছিয়ে অর্ণব আর অনিন্দিতা একই গাড়িতে উঠে বসল।
চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে গাড়ি যখন খাগড়াছড়ির আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়কে উঠতে শুরু করল, তখন চারপাশের দৃশ্য ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। সবুজ পাহাড়, গভীর খাদ, বাঁশঝাড় আর মেঘের ছায়া মিলেমিশে যেন এক অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি করেছে।
প্রতিটি বাঁকে মনে হচ্ছিল, পাহাড় তাদের একটু একটু করে নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে।
জানালার বাইরে মুখ বাড়িয়ে অনিন্দিতা মুগ্ধ হয়ে বলল,
— এত সুন্দর রাস্তা আমি কোনোদিন দেখিনি!
অর্ণব মৃদু হেসে তার দিকে তাকাল।
— কিছু পথ শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো তৈরি করার জন্যও হয়।
চাঁদের গাড়িটা ধীরে ধীরে মেঘ ছুঁয়ে সাজেকের দিকে এগিয়ে চলল। পাহাড়ি বাতাসে উড়ে যাওয়া অনিন্দিতার চুল আর অর্ণবের নীরব হাসির মাঝেই যেন অজান্তে শুরু হয়ে গেল তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
ফেরার দিনটা খুব দ্রুত চলে এলো।
সকালের নরম রোদে সাজেকের পাহাড়গুলো যেন আরও বেশি নীরব লাগছিল। চাঁদের গাড়িটা নিচে নামার জন্য প্রস্তুত। অনিন্দিতা আর তার বন্ধুরা ব্যাগ গুছিয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
অর্ণব গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
অনিন্দিতা মৃদু হেসে বলল,
— তুমি ফিরবে না?
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— না। এই পাহাড়েই আমার নতুন জীবন শুরু হবে। অনেক কাজ বাকি।
কিছুক্ষণ দু'জনেই চুপ করে রইল।
বিদায়ের মুহূর্তে অনিন্দিতা ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটি বুকমার্ক বের করে অর্ণবের হাতে দিল।
বুকমার্কে লেখা ছিল—
যে মানুষ স্বপ্নের জন্য পাহাড়ে থেকে যেতে পারে, তার জন্য অপেক্ষা করাও সুন্দর।
গাড়িটা ধীরে ধীরে পাহাড়ি রাস্তা ধরে নিচে নেমে যেতে লাগল।
অনিন্দিতা জানালার কাঁচে মুখ ঠেকিয়ে শেষবারের মতো তাকিয়ে রইল।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অর্ণবকে মেঘ ধীরে ধীরে আড়াল করে দিল।
এরপর শুরু হলো দূরত্বের ভালোবাসা।
অর্ণব দিনরাত ব্যস্ত হয়ে পড়ল তার দাদার রেখে যাওয়া পুরোনো কটেজটিকে নতুন করে গড়ে তুলতে। পাহাড়ি মানুষদের নিয়ে তৈরি করতে লাগল একটি ছোট্ট ইকো-রিসোর্ট।
অন্যদিকে ঢাকায় ফিরে নিজের ব্যস্ত জীবনে ডুবে গেলেও, প্রতিদিন রাতে অনিন্দিতার ফোনে একটি ছবি এসে পৌঁছাত।
কখনও ভোরের মেঘ।
কখনও পাহাড়ের সূর্যাস্ত।
কখনও নতুন লাগানো ফুলের গাছ।
আর প্রতিটি ছবির নিচে মাত্র একটি লাইন—
আজও তোমার জন্য একটা বিকেল রেখে দিলাম।
অনিন্দিতাও উত্তর দিত।
আমি একদিন সেই বিকেলটা নিতে আসব।
এক বছর কেটে গেল।
রিসোর্টের উদ্বোধনের দিন।
সব অতিথির ভিড়ের মাঝেও অর্ণবের চোখ বারবার পাহাড়ি রাস্তার দিকে চলে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই একটি চাঁদের গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এল হালকা নীল শাল জড়ানো অনিন্দিতা।
মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
সে ধীরে ধীরে অর্ণবের সামনে এসে বলল,
— শুনেছি, এখানে একজন মানুষ তার স্বপ্নের বাড়ি বানিয়েছে। ভাবলাম, স্বপ্নটা একবার দেখে যাই।
অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
— হঠাৎ?
অনিন্দিতা মুচকি হেসে উত্তর দিল,
— তুমি বলেছিলে, এখানে আমার জন্য একটা বিকেল রেখে দিয়েছ।
একটু থেমে আবার বলল,
— আমি সেই বিকেলটা নিতে এসেছি। তবে... যদি অনুমতি দাও, শুধু একটা বিকেল নয়—জীবনের বাকি সময়টাও এখানেই রেখে যেতে চাই।
অর্ণব কিছু বলল না।
শুধু নিঃশব্দে তার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।
অর্ণব
পাহাড়ের বুক বেয়ে তখন মেঘ নেমে আসছে।
দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে।
আর সাজেকের সেই নীরব বিকেল সাক্ষী হয়ে রইল দুই মানুষের ভালোবাসার—
যার শুরু হয়েছিল একটি ট্রেনের কামরায়,
আর যার ঠিকানা হয়ে গেল পাহাড়ের বুকে, মেঘের খুব কাছে।

আপনার মতামত লিখুন